প্রথম কর্মদিবসে দায়িত্ব নিলেন ২৬৬ জন ডিএজি ও এএজি, জনগণই প্রকৃত ক্লায়েন্ট: অ্যাটর্নি জেনারেল

অ্যাটর্নি জেনারেল

নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপতির দেওয়া নিয়োগের পর প্রথম কর্মদিবসে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন ৮৬ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৭৯ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই ২০২৬) নিয়োগ পাওয়ার পর শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় রোববারই (২ আগস্ট ২০২৬) ছিল তাদের প্রথম কর্মদিবস। সকালে নির্ধারিত সময়ের আগেই তারা অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে উপস্থিত হন এবং পরে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগে দিনের কার্যক্রমে অংশ নেন।

কী ঘটেছে?

গত ৩০ জুলাই ২০২৬-এ রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার, ১৯৭২ (পিও নং ৬ অব ১৯৭২)-এর ৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ৮৬ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৭৯ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া সব ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের নিয়োগ আদেশ বাতিল করা হয়।

১ আগস্ট ২০২৬-এ অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে নবনিযুক্ত সব ডিএজি ও এএজিকে ২ আগস্ট সকাল ৮টার মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেন। তিনি জানান, আদালতের কার্যক্রম প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টায় শুরু হয়। তাই রাষ্ট্রের পক্ষে আদালতে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সবাইকে সকাল ৮টার মধ্যে উপস্থিত হতে হবে।

২ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টায় অফিস কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই অধিকাংশ নবনিযুক্ত আইন কর্মকর্তা কার্যালয়ে উপস্থিত হন। সকালে দোয়ার মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সকাল ৯টায় আপিল বিভাগের কার্যক্রম শুরু হলে তারা নিজ নিজ পেশাগত দায়িত্ব পালনে অংশ নেন। পরে হাইকোর্ট বিভাগের কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতিও নেন।

অ্যাটর্নি জেনারেলের আহ্বান

২ আগস্ট নবনিযুক্ত আইন কর্মকর্তাদের প্রথম কর্মদিবসে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “সবার পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। যে যার বিশেষজ্ঞতার জায়গা থেকে রাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন। আমাদের দেশপ্রেম, সততা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা সেই দায়িত্বই পালন করব।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ চায়, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ভিত্তি হোক সততা, কর্মদক্ষতা, জাতীয়তাবাদী চেতনা ও দেশপ্রেম। আমার বিশ্বাস, সরকার ও রাষ্ট্রপতি এসব বিষয় বিবেচনা করেই নিয়োগ দিয়েছেন।”

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, “অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের দায়িত্ব শুধু সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ দেশের প্রতিটি নাগরিকই এই কার্যালয়ের সেবাগ্রহীতা। সরকারই আমাদের একমাত্র ক্লায়েন্ট নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই আমাদের ক্লায়েন্ট। তাই জনগণের কল্যাণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে চাই।”

আইন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে একাংশের অসন্তোষের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “এত বড় একটি দপ্তরে সবাইকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে মোট ৩৩৭ জন আইন কর্মকর্তা ছিলেন। পরবর্তীকালে সেই সংখ্যা কমেছে। বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন অনুযায়ী যতজন ডিএজি ও এএজি প্রয়োজন মনে করেছেন, ততজনকেই নিয়োগ দিয়েছেন। আমাদের অনেক সহকর্মী হয়তো এবার বিবেচিত হননি। কেন হননি, সেই সিদ্ধান্ত যারা নিয়োগ দিয়েছেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন। আমিও আজ নিয়োগপ্রাপ্তদের একজন মাত্র।”

নিয়োগের আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার, ১৯৭২ (পিও নং ৬ অব ১৯৭২)-এর ৩(১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। ৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে ন্যূনতম পাঁচ বছরের অনুশীলন থাকতে হবে।

সংবিধানের ৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিকে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেন। অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্রপতির নির্দেশ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান।

পদত্যাগের প্রেক্ষাপট

নিয়োগের পরপরই একাধিক আইন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতানা আকতার রুবি ও মামুন চৌধুরী এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রোহানী সিদ্দিকা ও প্রোজ্জ্বল চাকমা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র দেন। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাদিয়া আফরিন শাপলা পদত্যাগ করেন। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ আরও দুই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (মো. বেলায়েত হোসেন এবং কে এম রেজাউল ফিরোজ) পদত্যাগ করেন। মোট আটজন আইন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন।

উল্লেখ্য, ২ আগস্ট ২০২৬-এ নিয়োগ না পাওয়া এবং নিয়োগপ্রত্যাশী বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের একাংশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ব্যানারে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কী? ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হলেন সরকারের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।

সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কী? সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলও সরকারের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনা করেন। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে ন্যূনতম পাঁচ বছরের অনুশীলন থাকতে হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা কী? অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশ সরকারের প্রধান আইনি উপদেষ্টা এবং সুপ্রিম কোর্টে সরকারের পক্ষে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলদের কার্যক্রম সমন্বয় করেন।

পরবর্তী কী হবে? নবনিযুক্ত ডিএজি ও এএজিরা তাদের দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। তারা রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনা করবেন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট আইনি কার্যক্রমে অংশ নেবেন।

সংক্ষেপে

  • ৩০ জুলাই ২০২৬-এ ৮৬ জন ডিএজি এবং ১৭৯ জন এএজি নিয়োগ দেওয়া হয়; মোট ২৬৬ জন।
  • ২ আগস্ট ২০২৬-এ তাদের প্রথম কর্মদিবস; সকাল ৮টার মধ্যে অফিসে রিপোর্ট করার নির্দেশ ছিল।
  • অ্যাটর্নি জেনারেল: ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
  • অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, “জনগণই আমাদের প্রকৃত ক্লায়েন্ট।”
  • আইনি ভিত্তি: বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার, ১৯৭২-এর ৩(১) অনুচ্ছেদ।
  • নিয়োগের পর মোট আটজন আইন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন।
  • ২ আগস্ট ২০২৬-এ নিয়োগবঞ্চিত আইনজীবীদের বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

তথ্যসূত্র

মাধ্যম সূত্র:

  • কালবেলা — ২ আগস্ট ২০২৬
  • বাংলা ট্রিবিউন — ১ আগস্ট ২০২৬
  • দৈনিক ইনকিলাব — ২ আগস্ট ২০২৬
  • সমকাল — ২ আগস্ট ২০২৬
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (বাংলা) — ৩০ জুলাই ২০২৬
  • দ্য ডেইলি স্টার — ৩০ জুলাই ২০২৬
  • প্রথম আলো — ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • টিবিএস নিউজ — ৩০ জুলাই ২০২৬
  • বাসস (BSS) — ২ আগস্ট ২০২৬

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার, ১৯৭২ (পিও নং ৬ অব ১৯৭২) — অনুচ্ছেদ ৩(১), ৩(২), ৩(৩)
  • বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৬৪, ১০৬
  • রাষ্ট্রপতির কার্যালয় — নিয়োগের প্রজ্ঞাপন, ৩০ জুলাই ২০২৬

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.