সরকারি অফিসে টাকার ঘাটতি থাকলেই ফৌজদারি বিশ্বাসভঙ্গ প্রমাণ হয় না। দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় কী প্রমাণ লাগে, হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে কী বলা হয়েছে, জানুন।
সরকারি অফিসের হিসাবে টাকা না মিললে দায়িত্বে থাকা কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হওয়া খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তবে হাইকোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায় মনে করিয়ে দিয়েছে, হিসাবে ঘাটতি থাকলেই ফৌজদারি বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণ হয়ে যায় না। আদালতের ভাষায়, ঘাটতি একটি সূচক হতে পারে, কিন্তু অপরাধ প্রমাণের জন্য আরও দুটি বিষয় আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
রায়টি এসেছে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরের একটি মামলা থেকে। সেখানে প্রায় ১৩ লাখ টাকার ঘাটতি পাওয়া গিয়েছিল এবং নিম্ন আদালত ডাক বিভাগের এক কর্মচারীকে দণ্ড দিয়েছিল। হাইকোর্ট সেই দণ্ড বাতিল করে তাঁকে খালাস দিয়েছেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরের নিয়মিত পোস্টমাস্টার চিকিৎসার জন্য ছুটিতে ছিলেন। ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত ডাক বিভাগের কর্মচারী মো. ওমর ফারুক ওই পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ১১ জানুয়ারি নিয়মিত পোস্টমাস্টার ফিরে এসে দায়িত্ব বুঝে নিতে চাইলে ওমর ফারুক তৎক্ষণাৎ হস্তান্তর না করে পরে করার কথা বলেন। এরপর দুপুরে খাবারের কথা বলে অফিস থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি।
পরে নগদ অর্থ, ডাকটিকিট ও অন্যান্য সামগ্রীর হিসাব যাচাই করে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতি পাওয়া যায়। এই ঘটনায় ২০১১ সালের ১২ জানুয়ারি আদিতমারী থানায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা হয়।
লালমনিরহাটের বিশেষ জজ আদালত ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর ওমর ফারুককে দোষী সাব্যস্ত করে মোট সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানার আদেশ দেন। তিনি হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল করেন। ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর একক বেঞ্চ ফৌজদারি আপিল নং ৭৭১২/২০১৪ মঞ্জুর করে নিম্ন আদালতের দণ্ড ও সাজা বাতিল করেন।
আইন কী বলছে
ফৌজদারি বিশ্বাসভঙ্গের সংজ্ঞা আছে দণ্ডবিধির ৪০৫ ধারায়। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো সম্পত্তি কোনো ব্যক্তির কাছে ন্যস্ত থাকলে, বা তার ওপর তাঁর অধিকার বা নিয়ন্ত্রণ থাকলে, এবং তিনি তা অসৎভাবে আত্মসাৎ বা নিজের ব্যবহারে রূপান্তর করলে অপরাধ হয়।
দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এই অপরাধের একটি বিশেষ রূপ। এটি প্রযোজ্য হয় সরকারি কর্মচারী, ব্যাংকার, বণিক বা অনুরূপ বিশ্বাসের সম্পর্কে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। এই ধারায় শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দশ বছর কারাদণ্ড, সঙ্গে জরিমানাও হতে পারে।
এই মামলায় দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারাও প্রযোজ্য ছিল। এই ধারা সরকারি কর্মচারীর অপরাধমূলক অসদাচরণের কথা বলে, যার মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও পড়ে। শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড, জরিমানা, অথবা দুটোই।
৪০৯ ধারার দণ্ডের জন্য দুটি উপাদান অপরিহার্য। প্রথমটি হলো ন্যস্তকরণ, অর্থাৎ সম্পত্তিটি অভিযুক্তের কাছে এমনভাবে অর্পিত ছিল যে তার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয়টি হলো অসৎ আত্মসাৎ, অর্থাৎ অভিযুক্ত ওই সম্পত্তি অসৎ উদ্দেশ্যে নিজের কাজে লাগিয়েছেন। শুধু সম্পত্তির অস্তিত্ব ও পরে ঘাটতি দেখা গেলে এই দুটি উপাদান আপনা থেকে প্রমাণ হয় না।
হাইকোর্ট কী দেখেছেন
হাইকোর্ট মামলার ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও নথি পর্যালোচনা করেন। ঘাটতি থাকার বিষয়টি কিছু সাক্ষ্য ও হিসাব যাচাইয়ের নথিতে সমর্থিত ছিল। কিন্তু মূল প্রশ্ন ছিল, ঘাটতির সঙ্গে অভিযুক্তের জিম্মা ও অসৎ আত্মসাতের সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণিত হয়েছে কি না।
এক রাষ্ট্রপক্ষীয় সাক্ষী বলেন, ২০১১ সালের ৯ জানুয়ারি ওমর ফারুক লালমনিরহাট প্রধান ডাকঘর থেকে ৯ লাখ টাকা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে স্বীকার করেন, ওই টাকা আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছানোর কোনো নির্দিষ্ট হিসাব এন্ট্রি নেই। অর্থ পাঠানোর দলিলও পাওয়া যায়নি। এমনকি টাকাটি প্রকৃতপক্ষে পরিশোধ হয়েছিল কি না, তাও তিনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, প্রধান ডাকঘর থেকে অর্থ গ্রহণের বক্তব্য থাকলেও “আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছানো” এবং “সেখান থেকে আত্মসাৎ” এই শৃঙ্খল প্রমাণিত না হলে ৪০৯ ধারার ন্যস্তকরণের উপাদান প্রতিষ্ঠিত হয় না।
একজন গ্রাহকের তিন লাখ টাকার স্থায়ী আমানতের বিষয়ও মামলায় উঠে আসে। তবে সেই সাক্ষ্য থেকে ওমর ফারুক ব্যক্তিগতভাবে টাকাটি গ্রহণ বা আত্মসাৎ করেছেন, এমন প্রমাণ মেলেনি। আদালতের মতে, অর্থের লেনদেন ও পরে হিসাবে ঘাটতির মধ্যে সময়গত মিল থাকলেও নির্দিষ্ট অর্থ অভিযুক্তের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং তিনি তা অসৎভাবে আত্মসাৎ করেছেন, এটি আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হয়।
আদালত আরও দেখেন, অনুমোদিত নগদ স্থিতি, অর্থ পাঠানোর পদ্ধতি, চাহিদাপত্র, অনুমোদন এবং নগদ হেফাজত ও স্থানান্তরের প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি ছিল। ৯ লাখ টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে লিখিত অনুমোদন ছিল না, তদন্তকারী কর্মকর্তা এ কথাও স্বীকার করেন। জব্দতালিকা ও জব্দ করা সামগ্রী সংক্রান্ত সাক্ষ্যেও অসংগতি ছিল।
আদালতের মূল যুক্তি হলো, অভিযুক্তের অনুপস্থিতি, দায়িত্ব হস্তান্তর না করা এবং পরে হিসাবে ঘাটতি, এই তিনটি পরিস্থিতি মিলে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সন্দেহ দিয়ে অপরাধের উপাদান প্রমাণ হয় না। রাষ্ট্রপক্ষ ন্যস্তকরণ ও অসৎ আত্মসাতের মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তাই ৪০৯ ধারা ও ৫(২) ধারার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন।
এই রায়ের বাস্তব অর্থ
ঘাটতি আর ফৌজদারি বিশ্বাসভঙ্গ এক বিষয় নয়। ঘাটতি একটি প্রশাসনিক ও হিসাবরক্ষণের বিষয়। এটি বিভাগীয় তদন্ত, জবাবদিহি বা ক্ষতিপূরণের দাবির ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু ফৌজদারি দণ্ডের জন্য আদালতে অপরাধের প্রতিটি উপাদান আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হয়।
অনেক সময় অফিসের ক্যাশে টাকা কম থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে সরাসরি অর্থ আত্মসাৎকারী ধরে নেওয়া হয়। এই রায় সেই প্রবণতার বিপরীতে একটি সতর্কবার্তা। অর্থটি যদি আইনসম্মতভাবে তাঁর কাছে ন্যস্ত ছিল না বা তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না, তাহলে শুধু ঘাটতির ভিত্তিতে দণ্ড টেকে না।
তদন্তকারী সংস্থার জন্য এর অর্থ হলো, অভিযোগ গঠনের আগে অর্থের প্রবাহ, ন্যস্তকরণের প্রক্রিয়া, অনুমোদন, অর্থ পাঠানোর পদ্ধতি এবং অভিযুক্তের নিয়ন্ত্রণের সীমা নিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।
সাধারণ মানুষ হিসেবে এমন অভিযোগের মুখোমুখি হলে কিছু বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থটি আপনার কাছে কোন দায়িত্বে ন্যস্ত ছিল, তার লিখিত প্রমাণ সংগ্রহ করুন। হস্তান্তর, জমা বা রিমিট্যান্সের প্রতিটি ধাপে নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তার নথি রাখুন। প্রশাসনিক তদন্তে সহযোগিতা করুন এবং আইনজীবীর পরামর্শ নিন। মনে রাখতে হবে, ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ প্রমাণের দায় রাষ্ট্রপক্ষের ওপর থাকে। শুধু ঘাটতির অঙ্ক দিয়ে সেই দায় পূরণ হয় না।
ব্যতিক্রম ও সীমাবদ্ধতা
এই রায়ের মানে এই নয় যে সরকারি অর্থের ঘাটতি গুরুতর নয়, বা কেউ ৪০৯ ধারায় আর কখনো দণ্ড পাবেন না। রাষ্ট্রপক্ষ যদি ন্যস্তকরণ ও অসৎ আত্মসাৎ, দুটোই নির্ভরযোগ্য প্রমাণে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে দণ্ড হতে পারে। রায় শুধু মনে করিয়ে দেয়, প্রমাণের মানদণ্ড পূরণ না হলে দণ্ড দেওয়া যাবে না।
এই মামলায় প্রযোজ্য ছিল দণ্ডবিধি ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন। বর্তমানে দুর্নীতি সংক্রান্ত তদন্ত ও বিচারে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় এগোনোর আগে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধে আলোচিত আইনি তথ্য ও আদালতের রায় কেবল সাধারণ জ্ঞান ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। এটি কোনো পেশাদার আইনি পরামর্শ নয়।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: সরকারি অফিসে টাকার ঘাটতি পাওয়া গেলেই কি ফৌজদারি মামলা হয়?
উত্তর: মামলা হতে পারে, তবে দণ্ডের জন্য শুধু ঘাটতি যথেষ্ট নয়। প্রমাণ করতে হবে যে টাকা অভিযুক্তের কাছে ন্যস্ত ছিল বা তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল, এবং তিনি তা অসৎভাবে আত্মসাৎ করেছেন।
প্রশ্ন: দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় সরকারি কর্মচারীর শাস্তি কী?
উত্তর: উৎস অনুযায়ী, এই ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দশ বছর কারাদণ্ড, সঙ্গে জরিমানা হতে পারে।
প্রশ্ন: এই মামলায় হাইকোর্ট কেন অভিযুক্তকে খালাস দেন?
উত্তর: হাইকোর্টের মতে, ঘাটতি থাকলেও টাকাটি অভিযুক্তের কাছে ন্যস্ত ছিল এবং তিনি তা অসৎভাবে আত্মসাৎ করেছেন, এই দুটি উপাদান রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।
প্রশ্ন: প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও ফৌজদারি মামলা কি একই?
উত্তর: না। প্রশাসনিক তদন্তে ঘাটতির জন্য দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ফৌজদারি দণ্ডের জন্য আদালতে অপরাধের উপাদানগুলো আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হয়।
প্রশ্ন: ৪০৫ ও ৪০৯ ধারার মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: ৪০৫ ধারা ফৌজদারি বিশ্বাসভঙ্গের সাধারণ সংজ্ঞা দেয়। ৪০৯ ধারা সরকারি কর্মচারী, ব্যাংকার বা অনুরূপ বিশ্বাসের সম্পর্কে থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ বিধান, যেখানে শাস্তির মাত্রা বেশি।
- তথ্যসূত্র
- The Bangladesh Today, “সরকারি অফিসে কেবল টাকার ঘাটতি থাকলেই তা অর্থ আত্মসাৎ নয়: হাইকোর্ট”, ১৯ অক্টোবর ২০২৬।
- সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ, ফৌজদারি আপিল নং ৭৭১২/২০১৪, মো. ওমর ফারুক বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য, রায়ের তারিখ ১০.০৯.২০২৬ (বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী)।
- দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Act No. XLV of 1860), ধারা ৪০৫ ও ৪০৯।
- দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ (Prevention of Corruption Act, 1947), ধারা ৫(২)।








