তল্লাশি ও জব্দের সময় স্থানীয় সাক্ষীর উপস্থিতি কেন জরুরি, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা কী বলে এবং হাইকোর্টের একটি রায়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, জানুন।
পুলিশ বা কোনো তদন্তকারী সংস্থা কারও বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে কিছু জব্দ করলে জব্দতালিকায় সাক্ষীর স্বাক্ষর থাকা খুব সাধারণ ঘটনা। কিন্তু স্বাক্ষর থাকলেই যে প্রক্রিয়াটি আইনসম্মত হয়ে যায়, তা নয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা এই বিষয়ে স্পষ্ট বিধান দেয়, এবং হাইকোর্ট বিভাগের একটি সাম্প্রতিক রায়ে এই বিধানের গুরুত্ব আবার সামনে এসেছে। আদালত বলেছেন, ১০৩ ধারা মেনে তল্লাশি ও জব্দ না হলে সেই প্রক্রিয়ায় পাওয়া প্রমাণ ফৌজদারি বিচারে বিবেচনায় নেওয়া যাবে না।
মামলার পটভূমি
২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানার কাছারিপাড়া গ্রামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল অভিযান চালায়। অভিযোগ অনুযায়ী, রত্না খাতুনের বাড়িতে দলের নেতৃত্ব দেন পরিদর্শক মো. ফারুক সুলতান। অভিযানে তাঁকে আটক করা হয় এবং একজন নারী কনস্টেবলের মাধ্যমে দেহ তল্লাশি করে কাগজে মোড়ানো ২৫টি পুরিয়ায় প্রায় তিন গ্রাম হেরোইন পাওয়ার দাবি করা হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণি ১(ক)-এর অধীনে মামলা হয়।
কুষ্টিয়ার তৃতীয় আদালতের যুগ্ম দায়রা জজ ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি রত্না খাতুনকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫,০০০ টাকা জরিমানা দেন। আপিলে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত আপিল খারিজ করে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর তিনি হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন।
১০৩ ধারা কী বলে
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১০৩ ধারায় তল্লাশি ও জব্দের সময় স্থানীয় সাক্ষীর উপস্থিতির বিধান আছে। ১০৩(১) উপধারা অনুযায়ী, তল্লাশির আগে তল্লাশকারী কর্মকর্তাকে এলাকার অন্তত দুজন সম্মানিত বাসিন্দাকে উপস্থিত থাকার জন্য আহ্বান জানাতে হয়, এবং প্রয়োজনে লিখিত আদেশ দিতে হয়। ১০৩(২) উপধারা অনুযায়ী, তল্লাশিকৃত স্থানের দখলকারী ব্যক্তি বা তাঁর পক্ষের কাউকে তল্লাশির সময় উপস্থিত থাকতে দিতে হয়।
হাইকোর্টে মূল প্রশ্ন
আসামিপক্ষের প্রধান যুক্তি ছিল, মাদক উদ্ধারের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত জব্দতালিকা ও সাক্ষ্য নির্ভরযোগ্য নয়। তাঁদের দাবি, অভিযোগকারী কর্মকর্তাই তদন্তের দায়িত্বও পালন করেছেন, এবং জব্দতালিকার সাক্ষীদের বক্তব্যে মাদক উদ্ধারের ঘটনা সরাসরি সমর্থিত হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ বলে, নিম্ন আদালত সাক্ষ্য মূল্যায়ন করেই দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং আপিল আদালত তা যথাযথভাবে বহাল রেখেছে।
জব্দতালিকার সাক্ষীরা কী বলেন
জব্দতালিকায় দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষর ছিল। তাঁরা স্বাক্ষর করার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু তাঁদের বক্তব্য থেকে প্রমাণ হয় না যে তল্লাশি ও উদ্ধারের সময় তাঁরা ঘটনাস্থলে ছিলেন। একজন জানান, তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বাক্ষর করেছেন এবং উদ্ধারের বিষয়ে সরাসরি কিছু জানেন না। অন্যজনের ভাষ্য, তাঁকে একটি মোটরশ্রমিক অফিসে বসে থাকা অবস্থায় জব্দতালিকায় স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
অর্থাৎ, জব্দতালিকায় নাম থাকলেই তাঁরা তল্লাশির প্রক্রিয়া দেখেছেন, তা ধরে নেওয়া যায় না। মামলায় এই বিষয়টিই মূল হয়ে ওঠে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্টের বক্তব্য ছিল, তল্লাশির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগে তল্লাশি ও জব্দ শেষ হলে, কিংবা তাঁরা চলে যাওয়ার পরে কার্যক্রম চললে, ১০৩ ধারার বিধান পালিত হয় না। আদালতের ভাষায়, ১০৩(১) ও ১০৩(২) ধারার বিধান কঠোরভাবে না মেনে করা তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি বলে গণ্য হবে এবং ফৌজদারি বিচারে তা বিবেচনায় নেওয়া যাবে না।
কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ
জব্দতালিকা ও তল্লাশির প্রমাণ বাদ দিলে আসামির দখল থেকে হেরোইন উদ্ধারের অভিযোগ প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য উপাদান থাকে না, হাইকোর্ট এমনটাই দেখেন। ফলে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি বলে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
আপিল আদালতের দায়িত্ব
হাইকোর্ট তল্লাশির বিষয়ের পাশাপাশি আপিল আদালতের ভূমিকাও উল্লেখ করেন। আদালতের মতে, আপিল আদালতকে বিচারিক আদালতের সাক্ষ্য ও প্রমাণ মূল্যায়ন স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করতে হয়। শুধু নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে আপিল খারিজ করা যথেষ্ট নয়।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট ফৌজদারি রিভিশন মঞ্জুর করেন। এর ফলে আপিল খারিজের ২০১৪ সালের আদেশ এবং বিচারিক আদালতের ২০১১ সালের দণ্ড ও সাজা বাতিল হয়। রত্না খাতুনকে খালাস দেওয়া হয়, তাঁর জামিননামা থেকে অব্যাহতির নির্দেশ দেওয়া হয়, এবং নথি রায়ের অনুলিপিসহ অধস্তন আদালতে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ হয়।
বাস্তবে এর মানে কী
এই রায়ের প্রধান শিক্ষা হলো, তদন্তকারী সংস্থাকে তল্লাশি ও জব্দের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু জব্দতালিকায় স্বাক্ষর নেওয়া যথেষ্ট নয়। সাক্ষী যদি প্রক্রিয়ার সময় উপস্থিত না থাকেন, তবে সংগৃহীত প্রমাণ আদালতে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি এভাবে দেখা যায়। তল্লাশির সময় কোনো বাসিন্দাকে ডাকা হয়েছিল কি না, তিনি কখন এসেছেন, কখন চলে গেছেন এবং জব্দতালিকা কখন ও কোথায় লেখা হয়েছে, এসব বিষয় পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তল্লাশির সময় উপস্থিত থাকা বা জব্দতালিকার কপি চাওয়ার মতো অধিকার সম্পর্কে আইনজীবীর কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।
ব্যতিক্রম ও সীমাবদ্ধতা
এই রায় একটি নির্দিষ্ট মামলার সিদ্ধান্ত। প্রতিটি মামলার তথ্য ও পরিস্থিতি আলাদা, তাই একই ফল সব ক্ষেত্রে হবে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ১০৩ ধারার বিধান মূলত স্থানীয় সাক্ষীর উপস্থিতির বিষয়ে। অন্য কোনো প্রক্রিয়াগত ত্রুটি আলাদাভাবে বিবেচিত হতে পারে। এছাড়া রায়টি ভবিষ্যতের মামলায় প্ররোচনামূলক (persuasive) হিসেবে উদ্ধৃত হতে পারে, তবে তা নির্ভর করবে নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধে আলোচিত আইনি তথ্য ও আদালতের রায় কেবল সাধারণ জ্ঞান ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। এটি কোনো পেশাদার আইনি পরামর্শ নয়।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: তল্লাশিতে স্থানীয় সাক্ষী কতজন লাগে?
উত্তর: ১০৩ ধারা অনুযায়ী অন্তত দুজন সম্মানিত স্থানীয় বাসিন্দাকে তল্লাশিতে উপস্থিত থাকার জন্য আহ্বান জানাতে হয়।
প্রশ্ন: সাক্ষীরা কি পুরো তল্লাশির সময় উপস্থিত থাকতে হবে?
উত্তর: উৎসের রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তল্লাশির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন: ১০৩ ধারা না মানলে কী হয়?
উত্তর: আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এভাবে পরিচালিত তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি বলে গণ্য হবে এবং ফৌজদারি বিচারে তা বিবেচনায় নেওয়া যাবে না।
প্রশ্ন: জব্দতালিকায় স্বাক্ষর থাকলেই কি সাক্ষীর উপস্থিতি প্রমাণিত হয়?
উত্তর: না। এই মামলায় জব্দতালিকার সাক্ষীরা স্বাক্ষর করার কথা বললেও তল্লাশি ও উদ্ধারের সময় উপস্থিত ছিলেন, তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই স্বাক্ষরই যথেষ্ট ধরা হয়নি।
প্রশ্ন: এই রায়ে কি সব মাদক মামলা শেষ হয়ে গেছে?
উত্তর: না। রায়টি একটি নির্দিষ্ট মামলার সিদ্ধান্ত। প্রতিটি মামলার প্রমাণ ও পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচিত হয়।
তথ্যসূত্র
- সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রায়ের অনুলিপি।
- হাইকোর্ট বিভাগ, ক্রিমিনাল রিভিশন নং ২৩০৯/২০১৬, মোছা. রত্না খাতুন বনাম রাষ্ট্র, রায়ের তারিখ ১৭.০৭.২০২৬ (বিচারপতি মো. সেলিম)।
- ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮, ধারা ১০৩(১) ও ১০৩(২)।
- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০, ধারা ১৯(১), সারণি ১(ক)।
- পুলিশ রেগুলেশন, ১৯৪৩, প্রবিধান ২৮০।








