উত্তরাধিকারী জমি বণ্টন না হলে একক মালিকানা দাবি: হাইকোর্ট

Author
পেশা: আইন পেশাজীবী
দক্ষতা: বাংলাদেশ আইন ও আইনি গবেষণা

মূল মালিকের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি বণ্টন না হলে নির্দিষ্ট সীমানার একক স্বত্ব ঘোষণা কেন টেকে না, হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের আলোকে জানুন।

মূল মালিক মারা গেছেন, অথচ তাঁর জমি এখনো উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ হয়নি। এমন অবস্থায় কেউ যদি জমির নির্দিষ্ট সীমানা দেখিয়ে একক মালিকানা দাবি করেন, আদালত সেই দাবি সহজে মানবেন না। হাইকোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়ে এই নীতিই আবার স্পষ্ট হয়েছে। বিষয়টি জমি কেনাবেচা ও উত্তরাধিকার, দুই ক্ষেত্রেই অনেকের জন্য কাজে লাগবে।

রায়ের মূল বক্তব্য হলো, যৌথ বা অবিভক্ত জমিতে নির্দিষ্ট অংশের স্বত্ব চাইলে সংশ্লিষ্ট সহ-শরিকদের পক্ষভুক্ত করে জমি বণ্টনের প্রতিকারও চাইতে হবে। শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা করে নির্দিষ্ট সীমানার একক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আদালত স্পষ্ট করেছেন, এই রায়ে কোনো পক্ষকে পুরো জমির চূড়ান্ত মালিক ঘোষণা করা হয়নি।

মামলার পটভূমি

ময়মনসিংহ সদরের একটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধ থেকে মামলাটির সূত্রপাত। সিএস খতিয়ান নং ৩৬৮-এর আওতায় মোট ৩.৬৮ একর জমির মালিক ছিলেন বাজিত শেখ। সিএস দাগ নং ২৭৩৬-এ ছিল ৭৮ শতাংশ জমি। বাজিত শেখের মৃত্যুর পর চার ছেলে উত্তরাধিকারী হন। এরপর একটি অংশ একাধিক দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর হলে মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

বাদী মতিউর রহমান দাবি করেন, ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ আবদুল গণির কাছ থেকে তিনি ১৫ শতাংশ জমি কেনেন এবং দখল বুঝে নেন। তাঁর নামে খতিয়ানও হয়। ২০০৯ সালের ২৭ এপ্রিল বিবাদী শাহানাজ বেগমের স্বামী কামাল আহমেদ জোর করে জমির দখল নেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। প্রতিকার না পেয়ে তিনি স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল ফেরতের মামলা করেন।

শাহানাজ বেগমের ভাষ্য ভিন্ন। তিনি ১৯৯৭ সালে নিবন্ধিত দলিলে ৫ শতাংশ করে দুই দফায় মোট ১০ শতাংশ জমি কেনেন বলে দাবি করেন। কেনার পর মাটি ভরাট করে বাড়ি তোলেন, ২০০২ সালে বিদ্যুৎ-সংযোগ নেন এবং রাজস্ব পরিশোধ করেন। তাঁর স্বামী ২০০৫ সালে একই দাগে আরও ৯ শতাংশ জমি কেনেন বলে জানানো হয়।

নিম্ন আদালত ২০১৪ সালে বাদীর পক্ষে রায় দেন। ২০২৪ সালে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত আপিল খারিজ করে সেই রায় বহাল রাখেন। এরপর শাহানাজ বেগম হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন আবেদন করেন। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট রায় দেন।

কেন নির্দিষ্ট সীমানার দাবি টেকেনি

আদালতের প্রথম কাজ ছিল দুই পক্ষের দলিল ও মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করা। দেখা যায়, দুই পক্ষের কারও দলিলই পুরোপুরি নিষ্কলুষ নয়।

বাদীর ১৫ শতাংশ জমির আগের মালিকদের অধিকারের ভিত্তি যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি। ১৯৬৭ সালে আলাল উদ্দিন ২০ শতাংশ জমি হস্তান্তর করেন, পরে ১৯৮৬ সালে তা আবদুল গণির কাছে যায়। কিন্তু আলাল উদ্দিন তাঁর পিতা মোহরের কাছ থেকে ওই জমির কতটুকু পেয়েছিলেন, তার পর্যাপ্ত প্রমাণ মেলেনি।

বিবাদীর বিক্রেতাদের অধিকারের ভিত্তিও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ, আলাল উদ্দিন এবং উৎসে উল্লিখিত অন্য শরিকদের নামে সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান প্রস্তুত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মূল জমির উত্তরাধিকার। আদালত দেখেন, বাজিত শেখের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ৭৮ শতাংশ জমি বণ্টন হয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। ফলে ওই জমির কোন নির্দিষ্ট অংশ কার, তা চূড়ান্তভাবে ঠিক করা যায় না। আদালত এই অবস্থানের পক্ষে আপিল বিভাগের দুটি সিদ্ধান্তের নীতি উল্লেখ করেন: Enjaheruddin Mia alias Md. Enjaheruddin Mia বনাম Mohammad Hossain and others (১৮ বিএলডি (এডি) ৭৭) এবং Jahangir Alam (Md) and others বনাম Sabdir Ahmed and others (২২ বিএলসি (এডি) ৭৫)।

আদালত আরও লক্ষ করেন, বাজিত শেখের মেয়ে সুরমান, জারিমন ও করিমনকে বাদ দিয়ে প্রস্তুত করা এসএ খতিয়ান সঠিক ছিল না। ভুল রেকর্ডের কারণে তাঁদের উত্তরাধিকারের অধিকার আপনা থেকে বিলুপ্ত হয় না।

খতিয়ান কি মালিকানার প্রমাণ?

অনেকের ধারণা, খতিয়ানে নাম থাকলেই জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়ে যায়। এই রায় সেই ধারণায় সংশোধনী এনেছে। খতিয়ান মূলত রাজস্ব আদায়ের জন্য তৈরি সরকারি রেকর্ড। এটি মালিকানার একটি প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু একা মালিকানা সৃষ্টি করে না।

এই মামলায় উভয় পক্ষের নামেই খতিয়ান ছিল। তবু আদালত খতিয়ানের বাইরে গিয়ে দলিলের ধারাবাহিকতা, উত্তরাধিকার এবং দখল যাচাই করেছেন। অর্থাৎ শুধু খতিয়ান দেখিয়ে জমির নির্দিষ্ট অংশের দাবি সাধারণত টেকে না।

দখল ও উচ্ছেদের প্রমাণ

মালিকানার পাশাপাশি দখলের প্রশ্নও ছিল। শাহানাজ বেগমের পক্ষে কেনার দলিল, খতিয়ান, ২০০২ সালের বিদ্যুৎ-সংযোগের নথি, নিরাপত্তা জামানতের কাগজ এবং বিদ্যুৎ বিল আদালতে উপস্থাপিত হয়। এসব নথি ও সাক্ষ্য বিবেচনায় আদালত মনে করেন, তিনি কেনা ১০ শতাংশ জমি ভোগদখলে রেখেছিলেন।

অন্যদিকে বাদী ২০০৯ সালের ২৭ এপ্রিল উচ্ছেদ হওয়ার দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ দিতে পারেননি। আদালতের মতে, স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল ফেরতের মামলায় বাদীকে নির্দিষ্ট সীমানার জমিতে নিজের দখল এবং পরে উচ্ছেদের ঘটনা প্রমাণ করতে হয়। এখানে বাদী সেই দায়িত্ব পূরণ করতে পারেননি।

এই রায়ের আইনি অর্থ

প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877) অনুযায়ী স্বত্ব ঘোষণার মামলা সাধারণত ধারা ৪২-এর অধীনে হয়। দখল ফেরতের মামলা ধারা ৮ ও ৯-এর অধীনে আসতে পারে। যৌথ বা উত্তরাধিকারসূত্রের জমি ভাগের প্রশ্নে দেওয়ানি কার্যবিধি ও বণ্টন-সংক্রান্ত আইনের (যেমন দ্য পার্টিশন অ্যাক্ট, ১৮৯৩) প্রয়োগ হয়।

রায়ের মূল নীতি হলো, বণ্টন না হওয়া পর্যন্ত সহ-শরিকের নির্দিষ্ট অংশ চিহ্নিত হয় না। তাই নির্দিষ্ট সীমানার একক মালিকানা চাইলে বণ্টনের প্রতিকারও একসঙ্গে চাইতে হয়। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। এই নীতিটি আদালতের পর্যবেক্ষণ হিসেবে উপস্থাপিত, তাই এটিকে নিজস্ব ব্যাখ্যা হিসেবে না নিয়ে মূল রায়ের ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।

সাধারণ মানুষের জন্য করণীয়

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি নিয়ে বিরোধে জড়ালে প্রথমে দেখুন জমিটি বণ্টন হয়েছে কি না। বণ্টন না হয়ে থাকলে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলায় ভরসা না করে বণ্টনের প্রতিকারও যুক্ত করুন এবং সব সহ-শরিককে পক্ষভুক্ত করুন।

জমি কেনার আগে বিক্রেতার মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করুন। পূর্ববর্তী দলিল, খতিয়ান, উত্তরাধিকার সনদ এবং দখলের প্রমাণ সংগ্রহ করে রাখুন। কেনার পর দখলের নথি, যেমন বিদ্যুৎ বিল, রাজস্ব রসিদ ও অন্য প্রমাণ, সংরক্ষণ করা ভালো। উচ্ছেদের অভিযোগ করলে ঘটনার তারিখ ও প্রমাণ আগে থেকে জোগাড় রাখুন।

ব্যতিক্রম ও সীমাবদ্ধতা

এই রায়ের অর্থ এই নয় যে উত্তরাধিকারসূত্রের প্রতিটি জমির মালিকানা বণ্টন ছাড়া প্রমাণ করা যাবে না। প্রতিটি মামলার ঘটনা, দলিল ও দখলের ইতিহাস আলাদা। রায়টি মূলত দেখিয়েছে, বণ্টন ও মালিকানার ভিত্তি প্রমাণ না হলে একক স্বত্ব দাবি টেকে না। আইনের প্রয়োগও নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর নির্ভর করে, তাই নিজের মামলার বিষয়ে আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করা নিরাপদ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধে আলোচিত আইনি তথ্য ও আদালতের রায় কেবল সাধারণ জ্ঞান ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। এটি কোনো পেশাদার আইনি পরামর্শ নয়।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি বণ্টন না হলে কি কেউ নির্দিষ্ট অংশের মালিকানা দাবি করতে পারেন?
উত্তর: রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বণ্টন না হলে নির্দিষ্ট সীমানার একক মালিকানা দাবি সাধারণত টেকে না। সংশ্লিষ্ট সহ-শরিকদের পক্ষভুক্ত করে বণ্টনের প্রতিকারও চাইতে হয়।

প্রশ্ন: খতিয়ান থাকলেই কি জমির মালিকানা প্রমাণিত হয়?
উত্তর: না। খতিয়ান রাজস্ব রেকর্ড। এটি মালিকানার প্রমাণে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এককভাবে মালিকানা সৃষ্টি করে না। দলিল, উত্তরাধিকার, ধারাবাহিকতা ও দখলও বিবেচনায় আসে।

প্রশ্ন: এই মামলায় হাইকোর্ট কেন নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করেন?
উত্তর: উৎস অনুযায়ী, মূল মালিকের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি বণ্টনের প্রমাণ ছিল না, দুই পক্ষের দলিলেই মালিকানার ধারাবাহিকতায় ঘাটতি ছিল এবং বাদী উচ্ছেদের বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেননি।

প্রশ্ন: এই রায়ে কি কাউকে জমির চূড়ান্ত মালিক ঘোষণা করা হয়েছে?
উত্তর: না। আদালত স্পষ্ট করেছেন, উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের পরই প্রকৃত স্বত্ব নির্ধারণ সম্ভব হবে।

প্রশ্ন: বণ্টন না হলে কে মামলা করতে পারেন?
উত্তর: জমির ক্রেতা বা মূল মালিকের উত্তরাধিকারীরা বণ্টনের মামলা করতে পারেন। নির্দিষ্ট পক্ষ ও প্রতিকার কী হবে, তা মামলার ঘটনার ওপর নির্ভর করে, তাই আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তথ্যসূত্র

  • হাইকোর্ট বিভাগ, সিভিল রিভিশন নং ৫৬১৭/২০২৪, শাহানাজ বেগম বনাম মতিউর রহমানের উত্তরাধিকারীবৃন্দ, রায়ের তারিখ ০৬.০৮.২০২৬ (বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী)।
  • নির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877), ধারা ৪২, ৮ ও ৯।
  • দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ এবং বণ্টন-সংক্রান্ত আইন।
  • Enjaheruddin Mia alias Md. Enjaheruddin Mia বনাম Mohammad Hossain and others, ১৮ বিএলডি (এডি) ৭৭।
  • Jahangir Alam (Md) and others বনাম Sabdir Ahmed and others, ২২ বিএলসি (এডি) ৭৫।

আরো পড়ুন — সর্বশেষ আপডেট