চেক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির আপিলে ৫০ শতাংশ জমা বাধ্যতামূলক: হাইকোর্ট

চেক

চেক প্রত্যাখ্যানের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তি শুধু আপিল করার ইচ্ছা প্রকাশ করে জামিন পাওয়ার অধিকার দাবি করতে পারেন না। হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট করেছে, হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১-এর ১৩৮ক ধারা অনুযায়ী দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে প্রত্যাখ্যাত চেকের অর্থের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ আদালতে জমা দিতে হবে। এই শর্ত কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা আদালতের ইচ্ছাধীন বিষয় নয়; বরং আপিল করার পূর্বশর্ত (condition precedent)।

আইনি পটভূমি

হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী চেক ডিজঅনারের অপরাধের শাস্তি হলো সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, অথবা চেকের অর্থের সর্বোচ্চ তিন গুণ জরিমানা, অথবা উভয়ই। ২০০৬ সালে আইনটিতে ১৩৮ক ধারা সংযোজন করা হয়, যা আপিলের ক্ষেত্রে একটি বাধ্যতামূলক পূর্বশর্ত আরোপ করে।

১৩৮ক ধারার বিধান

১৩৮ক। আপিলের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা — ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর কোনো বিধান সত্ত্বেও, ১৩৮ ধারার উপ-ধারা (১) এর অধীনে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলবে না, যদি না আপিল দায়েরের পূর্বে দণ্ডাদেশ প্রদানকারী আদালতে প্রত্যাখ্যাত চেকের অর্থের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ জমা দেওয়া হয়।

এই ধারায় “Notwithstanding anything contained in the Code of Criminal Procedure, 1898” — এই non-obstante clause-এর মাধ্যমে ১৩৮ক ধারাকে সাধারণ আইনের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

মামলার ঘটনা

মো. তান্দু মিয়া বনাম রাষ্ট্র ও অন্যজন, ফৌজদারি রিভিশন নং ৬৫৭৯/২০২৪ মামলায় আবেদনকারী ১৩৮ ধারায় দণ্ডিত হন এবং এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এরপর তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬(২এ) ধারা অনুযায়ী জামিনের আবেদন করেন। নিম্ন আদালত ৫০% জমা না দেওয়ায় জামিন আবেদন নাকচ করে। তিনি হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন দায়ের করেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন জামিন লাভ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের সময়সীমা ৬০ দিন কি না — তুলনামূলক মামলায় ৯০ দিনের নির্দেশ দেখা যায়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ইউসুফ আব্দুল্লাহ সুমনের একক বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেন:

১. ১৩৮ক ধারার ৫০% জমা বাধ্যতামূলক। এটি এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের অধিকার প্রয়োগের সুযোগ নেই।

২. সাধারণ জামিনের বিধান প্রয়োগ করা যাবে না। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬(২এ) ধারার সাধারণ জামিনের বিধান প্রয়োগ করেও বিশেষ আইনে নির্ধারিত এই বাধ্যতামূলক শর্ত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

৩. বিশেষ আইন প্রাধান্য পাবে। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন একটি বিশেষ আইন। বিশেষ বিধানের সঙ্গে সাধারণ আইনের বিরোধ দেখা দিলে বিশেষ বিধানই প্রাধান্য পাবে।

৪. শর্ত মওকুফের ক্ষমতা নেই। ৫০% অর্থ জমা দেওয়া এবং আপিলের অধিকার পরস্পর নির্ভরশীল ও অবিচ্ছেদ্য। ফলে এই শর্ত মওকুফ করার ক্ষমতা আদালতের নেই।

আদালত এ ক্ষেত্রে পুবালী ব্যাংক লিমিটেড বনাম চৌধুরী শামীম হামিদ, [২০২৪] ১৭ এলএম (এডি) ১২৪ মামলায় আপিল বিভাগের নির্ধারিত নীতি অনুসরণ করেন।

ফলাফল

চেকের অর্থের ৫০ শতাংশ জমা না দেওয়ায় হাইকোর্ট আবেদনকারীর রিভিশন খারিজ করেন। আগে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রত্যাহার ও বাতিল করে দণ্ডিত ব্যক্তিকে অবিলম্বে ট্রায়াল কোর্টে আত্মসমর্পণ করে অবশিষ্ট সাজা ভোগের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ব্যবহারিক প্রভাব: দণ্ডিত ব্যক্তির করণীয়

  • ১৩৮ ধারায় দণ্ডিত হলে এবং আপিল করতে চাইলে অবশ্যই প্রত্যাখ্যাত চেকের অর্থের কমপক্ষে ৫০% দণ্ডাদেশ প্রদানকারী আদালতে জমা দিতে হবে।
  • ৪২৬(২এ) ধারায় জামিনের আবেদন করলেও ৫০% জমা না দিলে জামিন পাওয়ার কোনো অধিকার নেই।
  • আপিলের আগে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে জমার পরিমাণ ও প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার

হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, চেক ডিজঅনার মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তি আপিল করতে চাইলে ১৩৮ক ধারার ৫০% জমার শর্ত কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না। এই বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণ না করে শুধু আপিল করার ইচ্ছার ভিত্তিতে জামিন পাওয়া যাবে না।


ডিসক্লেইমার: এই লেখাটি সাধারণ আইনগত তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। নির্দিষ্ট কোনো মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, তথ্য ও পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

FAQ

১. চেক ডিজঅনার মামলায় দণ্ডিত হলে কি আপিল করতে ৫০% জমা দিতেই হবে?
হ্যাঁ। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ১৩৮ক ধারা অনুযায়ী আপিলের পূর্বে প্রত্যাখ্যাত চেকের অর্থের কমপক্ষে ৫০% দণ্ডাদেশ প্রদানকারী আদালতে জমা দিতে হবে।

২. ৫০% জমা না দিয়ে ৪২৬(২এ) ধারায় জামিন পাওয়া যাবে কি?
না। ১৩৮ক ধারার non-obstante clause-এর কারণে ৪২৬(২এ) ধারার সাধারণ জামিনের বিধান ১৩৮ ধারার মামলায় প্রযোজ্য হবে না। ৫০% জমা না দিলে জামিন পাওয়া যাবে না।

৩. আদালত কি ৫০% জমার শর্ত মওকুফ করতে পারেন?
না। আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই শর্ত মওকুফ করার কোনো ক্ষমতা আদালতের নেই। এটি আপিলের একটি অবিচ্ছেদ্য পূর্বশর্ত।

৪. ৫০% কীভাবে এবং কোথায় জমা দিতে হবে?
দণ্ডাদেশ প্রদানকারী আদালতে আপিল দায়েরের পূর্বে জমা দিতে হবে। সঠিক প্রক্রিয়ার জন্য অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৫. এই সিদ্ধান্ত কি সব চেক ডিজঅনার মামলায় প্রযোজ্য?
হ্যাঁ। ১৩৮ ধারায় দণ্ডিত হয়ে আপিল করতে চাইলে সব ক্ষেত্রেই ১৩৮ক ধারার ৫০% জমার শর্ত প্রযোজ্য হবে।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.