জমিও ছাড়বেন না, শরীকদের সাথে মারামারিও করবেন না!
নিজের বৈধ জমি পাচ্ছেন না? অংশীদার বা সহ-শরীকরা জমি ভাগ করে দিতে রাজি হচ্ছে না?
শরীকরা অহেতুক ঝামেলা বা জোরজুলুম করছে দেখে মাথা গরম হওয়া স্বাভাবিক! কিন্তু আইন নিজের হাতে না তুলে, দেশের প্রচলিত আইন ব্যবহার করেই সঠিক প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
আইনে আপনার জন্য কী চমৎকার আইনি পথ রাখা আছে, জেনে নিন
আইন কী বলে?
যৌথ সম্পত্তিতে আইনত প্রতিটি ইঞ্চিতে আপনার সম-অধিকার আছে। যদি শরীকরা আপনাকে জমি বুঝিয়ে না দেয় বা আপসে বন্টন করতে রাজি না হয়, তবে আপনার মূল আইনি হাতিয়ার হলো “বাটোয়ারা মামলা” (Partition Suit)।
বাটোয়ারা আইন, ১৮৯৩ (The Partition Act, 1893):
এই আইনের ২ ধারা অনুযায়ী, জমিটি যদি এমন হয় যা বাস্তবে ভাগ করলে তার উপযোগিতা নষ্ট হয়ে যাবে, তবে আদালত পুরো সম্পত্তিটি নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা শরীকদের মধ্যে বন্টন করার আদেশ দিতে পারেন! (অর্থাৎ একগুঁয়েমি করলে শরীকরাও জমি ধরে রাখতে পারবে না)।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ (The Transfer of Property Act, 1882):
এই আইনের ৪৪ ধারা অনুযায়ী, যৌথ সম্পত্তির যেকোনো শরীক তার প্রাপ্য অংশ হস্তান্তর বা দাবি করতে পারেন এবং হস্তান্তরিত অংশের সমান অধিকার নতুন গ্রহীতাও ভোগ করবেন।
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (Code of Civil Procedure, 1908):
এই বিধির ২৬ আদেশ, ১৩ ও ১৪ নিয়ম (Order 26, Rule 13 & 14) অনুযায়ী আদালত একজন নিরপেক্ষ ‘অ্যাডভোকেট কমিশনার’ নিয়োগ করবেন, যিনি সরেজমিনে গিয়ে নকশা মেপে জমি বন্টন বা বন্টননামা রিপোর্ট তৈরি করবেন।
মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নজির (Case Laws)
সহ-শরীক হয়ে অপর শরীকের প্রাপ্য হক আটকে রাখা যাবে না—আদালতের রায় কিন্তু খুবই পরিষ্কার:
১. ৬৮ ডিএলআর (এডি) ২০৪ (68 DLR (AD) 204):
আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কোনো শরীক যদি আপসে জমি ভাগ করতে না চায়, তবে আদালত কোনো পক্ষপাত ছাড়াই বিজ্ঞ কমিশনারের মাধ্যমে জমি বন্টন বা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দেবেন।
২. ৫০ ডিএলআর (এইচসিডি) ২১১ (50 DLR (HCD) 211):
সহ-শরীকদের কাছ থেকে নিজের সঠিক অংশ বুঝিয়ে পাওয়ার জন্য ‘বাটোয়ারা মামলা’ই হলো একমাত্র ও সবচেয়ে উপযুক্ত আইনি প্রতিকার। যৌথ সম্পত্তিতে কোনো একক শরীক পুরো জমি জোরপূর্বক দখলে রাখতে পারে না।
আপনার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হবে?
১. দেওয়ানি আদালতে মামলা: সংশ্লিষ্ট এলাকার সহকারী জজ আদালতে একটি বাটোয়ারা মামলা (Partition Suit) দায়ের করুন।
২. অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Injunction): মামলা চলাকালীন শরীকরা যাতে জমি বিক্রি বা কোনো স্থায়ী স্থাপনা তৈরি না করতে পারে, সেজন্য দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ৩৯ আদেশ (Order 39) অনুযায়ী ‘অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার’ আবেদন করুন।
৩. কমিশনার দ্বারা বন্টন: আদালত থেকে নিরপেক্ষ কমিশনার এসে জমি মেপে আপনার অংশ বুঝিয়ে দেবেন এবং আপনার নামে পৃথক খতিয়ান ও নামজারি করার পথ সুগম হবে।
মনে রাখবেন: পেশিশক্তি বা মারামারি কোনো সমাধান নয়। আইনি পথে হাঁটলে আপনার বৈধ অধিকার আদায় হবেই।
লেখক: জাকারিয়া হোসেন, স্পেশাল জজ
জেলা ও দায়রা জজ, ঢাকা