আগের সব নিয়োগ বাতিল করে ৮৬ ডিএজি ও ১৭৯ এএজি নিয়োগ
সরকার পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত সব ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের নিয়োগাদেশ বাতিল করে নতুন করে ৮৬ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৭৯ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দিয়েছে। গত ৩০ জুলাই ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর অনুবিভাগ থেকে এ বিষয়ে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন সলিসিটর সানা মো. মাহরুফ হোসেন।
কী ঘটেছে?
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে সলিসিটর অনুবিভাগের বিভিন্ন তারিখের স্মারকমূলে পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত সকল ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের নিয়োগাদেশ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে Bangladesh Law Officers Order, 1972 (P.O. No. 6 of 1972)-এর ৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নতুন নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। নিয়োগগুলো “পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত” বলবৎ থাকবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
নতুন নিয়োগের পর সুপ্রিম কোর্টে মোট আইন কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬৯ জন — ১ জন অ্যাটর্নি জেনারেল, ৩ জন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ৮৬ জন ডিএজি এবং ১৭৯ জন এএজি। ২০২৬ সালের মার্চে এই সংখ্যা ছিল ৩৩৭ জন। অর্থাৎ নতুন নিয়োগের মাধ্যমে আইন কর্মকর্তার সংখ্যা ৬৮ জন কমেছে।
নিয়োগে বিতর্ক ও বিক্ষোভ
নিয়োগের পরপরই বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের একাংশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ব্যানারে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও যোগ্য আইনজীবীদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যাদের অতীতে আইনজীবীদের সংগঠনের কার্যক্রমে দেখা যায়নি। তারা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
আবেদন না করেই নিয়োগ ও পদত্যাগ
নিয়োগের পরপরই একাধিক আইন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। ৩ আগস্ট ২০২৬-এ সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান আবেদন না করেই নিয়োগ পেয়েছিলেন বলে জানিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল স্বীকার করেছেন, “ভুলক্রমে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।” মাহফুজুর রহমান এএজি পদে যোগদানও করেননি।
এরপর ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতানা আকতার রুবি ও মামুন চৌধুরী এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রোহানী সিদ্দিকা ও প্রোজ্জ্বল চাকমা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। ৯ সেপ্টেম্বর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাদিয়া আফরিন শাপলা পদত্যাগ করেন। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ আরও দুই ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (মো. বেলায়েত হোসেন এবং কে এম রেজাউল ফিরোজ) পদত্যাগ করেন। মোট আটজন আইন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন।
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার, ১৯৭২ (পিও নং ৬ অব ১৯৭২)-এর ৩(১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল (সর্বোচ্চ ৩ জন), ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। ৩(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে ন্যূনতম পাঁচ বছরের অনুশীলন থাকতে হবে।
সংবিধানের ৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিকে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশ সরকারের প্রধান আইনি উপদেষ্টা এবং সুপ্রিম কোর্টে সরকারের পক্ষে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রসঙ্গত, নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ৪ আগস্ট ২০২৬-এ হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। রিটে অভিযোগ করা হয়, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেই প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকলেও নিয়োগ পেয়েছেন। বিষয়টি এখনো বিচারাধীন।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কী? ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হলেন সরকারের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।
সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল কী? সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলও সরকারের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনা করেন। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে ন্যূনতম পাঁচ বছরের অনুশীলন থাকতে হবে।
নিয়োগের সিদ্ধান্ত কার? বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার, ১৯৭২-এর ৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এই নিয়োগ দেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা হলো নিয়োগপ্রাপ্তদের কার্যক্রম সমন্বয় করা।
নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি? অর্থ লেনদেনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। বিষয়টি এখনো বিচারাধীন।
পরবর্তী কী হবে? রিট আবেদনের শুনানি চলছে। আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে নিয়োগগুলো বহাল থাকবে কিনা।
সংক্ষেপে
- ৩০ জুলাই ২০২৬-এ ৮৬ জন ডিএজি ও ১৭৯ জন এএজি নিয়োগ দেওয়া হয়; পূর্বের সব নিয়োগ বাতিল করা হয়।
- আইনি ভিত্তি: বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার, ১৯৭২-এর ৩(১) অনুচ্ছেদ; সংবিধানের ৬৪ অনুচ্ছেদ।
- নিয়োগের পর মোট আইন কর্মকর্তার সংখ্যা ২৬৯ জন; মার্চে ছিল ৩৩৭ জন।
- ২ আগস্ট ২০২৬-এ বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা অর্থ লেনদেনের অভিযোগে বিক্ষোভ করেন।
- মো. মাহফুজুর রহমানসহ মোট আটজন আইন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন।
- নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ৪ আগস্ট ২০২৬-এ হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার, ১৯৭২ (পিও নং ৬ অব ১৯৭২) — অনুচ্ছেদ ৩(১), ৩(২), ৩(৩)
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৬৪
- আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সলিসিটর অনুবিভাগ — প্রজ্ঞাপন, ৩০ জুলাই ২০২৬
মাধ্যম সূত্র:
- বাসস (BSS) — ৩০ জুলাই ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ৩০ জুলাই ২০২৬
- প্রথম আলো — ৩০ জুলাই ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ৩০ জুলাই ২০২৬
- ঢাকা ট্রিবিউন (বাংলা) — ৩০ জুলাই ২০২৬
- নিউ এজ — ৩ আগস্ট ২০২৬, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- সমকাল — ২ আগস্ট ২০২৬
- কালবেলা — ২ আগস্ট ২০২৬
- ঢাকা পোস্ট — ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
সূত্র: আইন মন্ত্রণালয়
