দিল্লিতে এনএসএর ধারা ৩(২): মানবাধিকার ও ন্যায্য বিচার নিয়ে অ্যামনেস্টির উদ্বেগ
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ)-এর ধারা ৩(২) প্রয়োগের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি ২৪ জুলাই ২০২৬ (শুক্রবার) এক বিবৃতিতে জানায়, দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর ১৫ জুলাই এই ধারা কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে পুলিশ প্রশাসনিক আদেশে ব্যক্তিদের আটক রাখার বিস্তৃত ক্ষমতা পায়। অ্যামনেস্টির মতে, এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনএসএর ধারা ৩(২) কী?
এনএসএ-এর ধারা ৩(২) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই জনশৃঙ্খলা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকির সন্দেহে প্রশাসনিকভাবে আটক করা যেতে পারে। এই আটকের মেয়াদ ৩ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত হতে পারে এবং আদালতে হাজির করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আটক হওয়ার পর তার মামলাটি একটি তিন সদস্যের উপদেষ্টা বোর্ড পর্যালোচনা করলেও সেখানে আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থাকে না। বোর্ড কেবল মুক্তি বা আদেশ বহাল রাখার সুপারিশ করতে পারে।
অ্যামনেস্টির উদ্বেগ
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারত শাখার চেয়ারম্যান আকার প্যাটেল বলেন, “এই অত্যন্ত উদ্বেগজনক পদক্ষেপ মানবাধিকারের প্রতি একটি চরম অবমাননা, যা দিল্লির পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। এটি পুলিশকে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী কারণে ১২ মাস পর্যন্ত মানুষকে আটক রাখার বিস্তৃত ক্ষমতা দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে নিশ্চিত ন্যায্য বিচারের অধিকার কার্যত স্থগিত হয়ে যায়, কারণ আটক ব্যক্তিদের আইনি প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং ১৫ দিন পর্যন্ত তাদের আটকের কারণ জানানো হয় না।”
তিনি আরও বলেন, “দিল্লি পুলিশ দাবি করছে এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কিন্তু অতীতে ২০২০ সালের সিএএ-বিরোধী আন্দোলন থেকে ২০২৬ সালের নয়ডার শ্রমিক বিক্ষোভ পর্যন্ত ভারতীয় পুলিশ এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। এই ধরনের ক্ষমতার পুলিশিংয়ে কোনো স্থান নেই — বিক্ষোভের সময় বা অন্য任何 সময়।”
অ্যামনেস্টি জানায়, এনএসএর ধারা ৩(২) প্রয়োগের মেয়াদ ১৮ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে যখন ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে যুবসমাজের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET-UG)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর এ আন্দোলনের সূত্রপাত হয় এবং এতে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য হন।
অ্যামনেস্টির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, এর জেরে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা পরীক্ষা সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি উত্থাপন করেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে সংসদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
দিল্লি পুলিশের অবস্থান
দিল্লি পুলিশ এই সিদ্ধান্তকে একটি নিয়মিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, “এই আদেশটি এনএসএ-এর অধীনে ক্ষমতার একটি নিয়মিত পুনর্নবীকরণ, যা প্রতি তিন মাসে জারি করা হয়। বর্তমান পুনর্নবীকরণ ৭ জুলাই ২০২৬-এ জারি করা হয়, যা ১৯ জুলাই থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এবং সিজেপি বিক্ষোভ শুরুর আগেই জারি করা হয়েছিল। কোনো নির্দিষ্ট অনুরোধের ভিত্তিতে এই পুনর্নবীকরণ করা হয়নি।”
আইনি প্রেক্ষাপট
আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তি (আইসিসিপিআর)-এর অনুচ্ছেদ ৯-এ ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং অনুচ্ছেদ ১৪-এ ন্যায্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি দাবি করেছে, এনএসএ-এর এই বিধান এই দুই অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ গ্রেফতার ও আটক সম্পর্কিত সুরক্ষা এবং ৩৫ অনুচ্ছেদ বিচার ও শাস্তি সম্পর্কিত সুরক্ষা নিশ্চিত করে। প্রশাসনিক আটকের ক্ষেত্রে এই সাংবিধানিক সুরক্ষার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এলাহাবাদ হাইকোর্ট দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর এনএসএ আটক বাতিল করে একে “স্বেচ্ছাচারী” ও “অরওয়েলীয় ডিস্টোপিয়া” বলে অভিহিত করেন। আদালত এই আটককে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের লঙ্ঘন বলে ঘোষণা করেন।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
প্রশাসনিক আটক কী? প্রশাসনিক আটক হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো ব্যক্তিকে অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই নির্বাহী আদেশে আটক রাখা হয়। এটি সাধারণ ফৌজদারি প্রক্রিয়ার বাইরে।
এনএসএ কী? জাতীয় নিরাপত্তা আইন, ১৯৮০ ভারতের একটি আইন, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচিত ব্যক্তিদের প্রতিরোধমূলক আটকের অনুমতি দেয়।
আইসিসিপিআর কী? আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তি (ICCPR) হলো একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে। ভারত এই চুক্তির স্বাক্ষরকারী।
পরবর্তী কী হবে? এনএসএর ধারা ৩(২) প্রয়োগের মেয়াদ ১৮ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এই আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আইনি চ্যালেঞ্জ উঠলে আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন।
সংক্ষেপে
- ১৫ জুলাই ২০২৬-এ দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর এনএসএর ধারা ৩(২) প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
- আদেশটি ১৯ জুলাই থেকে ১৮ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর।
- অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই সিদ্ধান্তকে “মানবাধিকারের প্রতি চরম অবমাননা” বলে অভিহিত করেছে।
- এনএসএর অধীনে অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখা যায়।
- আটক ব্যক্তিরা আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
- দিল্লি পুলিশ দাবি করেছে, এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক পুনর্নবীকরণ।
- আইসিসিপিআরের অনুচ্ছেদ ৯ ও ১৪-এর সঙ্গে এনএসএর বিধান সাংঘর্ষিক বলে অ্যামনেস্টি দাবি করেছে।
তথ্যসূত্র
প্রাথমিক সূত্র:
- অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল — বিবৃতি, ২৪ জুলাই ২০২৬
- দিল্লি সরকারের স্বরাষ্ট্র (পুলিশ-II) বিভাগ — প্রজ্ঞাপন, ১৫ জুলাই ২০২৬
- জাতীয় নিরাপত্তা আইন, ১৯৮০ (ভারত)
- আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তি (আইসিসিপিআর) — অনুচ্ছেদ ৯, ১৪
মাধ্যম সূত্র:
- জুরিস্ট — ২৭ জুলাই ২০২৬
- দ্য হিন্দু — ২৩ জুলাই ২০২৬
- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস — ২৩ জুলাই ২০২৬
- টাইমস অফ ইন্ডিয়া — ২৭ জুলাই ২০২৬
- আল জাজিরা — ২৪ জুলাই ২০২৬
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
