এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়: প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ধর্ম ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার সাংবিধানিক

এলাহাবাদ হাইকোর্ট

ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন, নিজের পছন্দের ব্যক্তিকে বিয়ে এবং ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করায় বাবার আটকে রাখা দুই প্রাপ্তবয়স্ক বোনকে মুক্ত ঘোষণা করে আদালত বলেছেন, “সংবিধান পিতামাতাকে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ধর্ম, বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ করার কারণে কারারুদ্ধ করার কোনো লাইসেন্স দেয়নি।”

কী ঘটেছে?

দিব্যা ভাটিয়া ওরফে জোয়া দিয়া ভাটিয়া (২০) এবং অংশু ভাটিয়া ওরফে আমিনা অংশু ভাটিয়া (৩৫) হেবিয়াস কর্পাস আবেদন দায়ের করেন। তাদের বাবা অনিল কুমার ভাটিয়া আগ্রার সদর বাজার এলাকার বাসিন্দা। অংশু একজন সাবেক লেকচারার এবং দিব্যা ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। দুই বোন ২০২০ ও ২০২১ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরের পর তাদের বাবা তাদের বাড়িতে বেআইনিভাবে আটকে রাখেন বলে আবেদনে অভিযোগ করা হয়।

আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, বাবা তাদের পাসপোর্ট, শিক্ষা সনদ, পরিচয়পত্র, ব্যাংক পাসবই ও ধর্মান্তর সংক্রান্ত নথিপত্র জব্দ করে রাখেন এবং পুরোনো ধর্মে ফিরে যাওয়ার জন্য শারীরিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করেন। বাবা ২০২৫ সালের মে মাসে আগ্রার সদর বাজার থানায় ধর্মান্তর সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দায়ের করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চ ৩০ জুলাই ২০২৬-এ অন্তর্বর্তী আদেশ দিয়ে দুই বোনকে ৬ আগস্ট আদালতে হাজিরের নির্দেশ দেন। ৬ আগস্ট শুনানি শেষে আদালত ৭০ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত আদেশ দেন।আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, “একবার কোনো ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে, সংবিধান তার বিশ্বাস, আবাস, সংগঠন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতিটি দিক সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বায়ত্তশাসনকে স্বীকৃতি দেয় — কেবল আইন-অনুমোদিত সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে।”

আদালত আরও বলেন, “এই ধরনের পছন্দ ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসন, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার একটি অপরিহার্য দিক, যা সংবিধানের ২১ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) ও ২৫ (ধর্ম ও বিবেকের স্বাধীনতা) অনুচ্ছেদ দ্বারা সুরক্ষিত। রাষ্ট্র বা পরিবার সাধারণত এই ধরনের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নির্দেশ বা হস্তক্ষেপ করতে পারে না — কেবল সাংবিধানিকভাবে অনুমোদিত সীমাবদ্ধতা ও আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত।”

বিচারপতি জৈন বলেন, “প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সাংবিধানিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসনের কাছে পিতামাতার কর্তৃত্ব হার মানতে বাধ্য। সংবিধান পিতামাতাকে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ধর্ম, বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ করার কারণে কারারুদ্ধ করার কোনো লাইসেন্স দেয়নি। সাংবিধানিক অধিকার পিতামাতার কর্তৃত্ব, সামাজিক নৈতিকতা বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোভাব দ্বারা গ্রাস করা যায় না।”

রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ও আদালতের প্রত্যাখ্যান

রাজ্য সরকার হেবিয়াস কর্পাস আবেদনের বিরোধিতা করে দাবি করে, ধর্মান্তরগুলো একটি “বৃহত্তর সংগঠিত ষড়যন্ত্রের” অংশ এবং এর সঙ্গে “দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও ঐক্যের জন্য প্রভাব” রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আরও যুক্তি দেয়, দুই নারীকে মুক্তি দিলে চলমান তদন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আদালত এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট করে বলেন, “ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বেচ্ছায় ধর্ম গ্রহণের অধিকার কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে খর্ব করা যাবে না।” আদালত বলেন, ধর্মান্তরের বৈধতা এবং নারীদের আটকের বৈধতা দুটি পৃথক বিষয়। এমনকি ২০২১ সালের ধর্মান্তরবিরোধী আইন মেনে চলা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, তা নিজে থেকে দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে তাদের বাবার দ্বারা অব্যাহত আটকের অনুমোদন দেয় না।

চূড়ান্ত আদেশ

আদালত দুই বোনকে “নিজেদের পছন্দের যেকোনো স্থানে এবং যেকোনো ব্যক্তির সঙ্গে বসবাস করার স্বাধীন” ঘোষণা করেন। বাবা অনিল কুমার ভাটিয়া ও উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, যার প্রত্যেকে সমান ১২.৫ লাখ টাকা পাবেন। রাষ্ট্রীয় সরকার ক্ষতিপূরণের ৫০% বাবার কাছ থেকে এবং বাকি ৫০% সংশ্লিষ্ট দায়ী সরকারি কর্মচারীর কাছ থেকে আদায় করতে পারবে।

আদালত বাবাকে সাত দিনের মধ্যে দুই বোনের পাসপোর্ট, শিক্ষা সনদ, পরিচয়পত্র, ব্যাংক পাসবই, চেকবুক, ধর্মান্তর সংক্রান্ত নথি ও অন্যান্য মালামাল ফেরত দিতে নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে দুই বোনের শান্তিপূর্ণ জীবন ও স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ না করতে এবং প্রয়োজনে সুরক্ষা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালত রাষ্ট্রীয় যন্ত্রপাতির ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “রাষ্ট্র তাদের মুক্তি নিশ্চিত করার বদলে ফৌজদারি কার্যক্রমের আড়ালে বেআইনি আটক ধরে রেখেছে এবং তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চনার প্রতি নীরব সমর্থন দিয়েছে।”

আইনি প্রেক্ষাপট

ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে এবং ২৫ অনুচ্ছেদ ধর্ম ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এই দুই অনুচ্ছেদের সমন্বয়ে আদালত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ধর্ম ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকারকে সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় এনেছেন।

উত্তরপ্রদেশ ধর্মান্তরবিরোধী আইন, ২০২১ (যা ধর্মান্তরকে বলপ্রয়োগ, প্রতারণা, প্রলোভন বা কূটকৌশলের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করে) এই মামলায় প্রযোজ্য কিনা — সেই প্রশ্নটি আদালত আপাতত খোলা রেখেছেন। আদালত স্পষ্ট করেছেন, ২০২১ সালের আইন মেনে চলার প্রশ্নটি ধর্মান্তরের বৈধতা সম্পর্কিত, যা ফৌজদারি তদন্তে নির্ধারিত হবে; তবে তা দুই নারীর আটককে বৈধতা দেয় না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার, ৪১ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ১০২(২)(খ) অনুচ্ছেদ হেবিয়াস কর্পাসের মাধ্যমে বেআইনি আটক থেকে সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করে। এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই রায় বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গেও তুলনীয়।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

হেবিয়াস কর্পাস কী? হেবিয়াস কর্পাস একটি আইনি প্রক্রিয়া, যা কোনো ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে আটক বা স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগে আদালতের কাছে আবেদন করা হয়। আদালত আটককারীকে আটকৃত ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন এবং আটকের বৈধতা যাচাই করেন।

প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির স্বায়ত্তশাসন কী? প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির স্বায়ত্তশাসন মানে হলো, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী কোনো ব্যক্তির নিজের ধর্ম, বিবাহ, বসবাস ও ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনগত সক্ষমতা রয়েছে। পিতামাতা বা পরিবারের অন্য সদস্যরা এই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।

এই রায়ের সাংবিধানিক তাৎপর্য কী? এই রায় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছে। পিতামাতার কর্তৃত্ব সাংবিধানিক অধিকারের ওপর প্রাধান্য পাবে না — এটি স্পষ্ট করেছে আদালত।

সংক্ষেপে

  • ৩০ জুলাই ২০২৬-এ অন্তর্বর্তী আদেশ; ৬ আগস্ট ২০২৬-এ চূড়ান্ত আদেশ।
  • রিটকারী: দিব্যা ভাটিয়া (২০) ও অংশু ভাটিয়া (৩৫)।
  • দুই বোন ২০২০ ও ২০২১ সালে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন।
  • বাবা অনিল কুমার ভাটিয়া তাদের আটকে রাখেন বলে অভিযোগ।
  • আদালত দুই বোনকে মুক্ত ঘোষণা করেন।
  • বাবা ও উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ।
  • সাত দিনের মধ্যে নথিপত্র ফেরত দেওয়ার নির্দেশ।
  • রাষ্ট্রপক্ষের “বৃহত্তর ষড়যন্ত্র” যুক্তি প্রত্যাখ্যান।

তথ্যসূত্র

মাধ্যম সূত্র:

  • দ্য হিন্দু — ১০ আগস্ট ২০২৬ ও ১ আগস্ট ২০২৬
  • হিন্দুস্তান টাইমস — ১১ আগস্ট ২০২৬ ও ২ আগস্ট ২০২৬
  • দ্য প্রিন্ট — ১১ আগস্ট ২০২৬
  • ইটিভি ভারত — ১১ আগস্ট ২০২৬
  • লাইভ ল’ — ৩১ জুলাই ২০২৬
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ১২ আগস্ট ২০২৬
  • ইউসিএ নিউজ — ১২ আগস্ট ২০২৬
  • আউটলুক ইন্ডিয়া — ১ আগস্ট ২০২৬

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • এলাহাবাদ হাইকোর্ট — হেবিয়াস কর্পাস আবেদন নং (৩০ জুলাই ২০২৬ ও ৬ আগস্ট ২০২৬-এর আদেশ)
  • ভারতের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ২১, ২৫
  • উত্তরপ্রদেশ ধর্মান্তরবিরোধী আইন, ২০২১
  • বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৩২, ৪১, ১০২(২)(খ)

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.