গো-রক্ষকদের সাজা দেওয়ায় মুসলিম বিচারক তাবাসসুম খান হুমকির মুখে, হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ
ভারতের মধ্যপ্রদেশে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার দায়ে ১৪ জন কথিত ‘গো-রক্ষককে’ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর মুসলিম নারী বিচারক তাবাসসুম খান তীব্র সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, ঘৃণামূলক প্রচারণা ও হত্যার হুমকির মুখে পড়েছেন। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি আমলে নিয়ে বিচারকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে।
কী ঘটেছে?
মধ্যপ্রদেশের নর্মদাপুরম জেলার সিওনি মালওয়া আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান গত ১২ জুন ২০২৬ রায় দেন। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, দাঙ্গা এবং বেআইনিভাবে মানুষকে আটকে রাখার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩ আগস্ট মহারাষ্ট্রের অমরাবতীর বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী ট্রাকচালক শেখ লালা নাজির আহমেদ রাতে গবাদিপশু বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় মধ্যপ্রদেশের নর্মদাপুরম জেলার বরাখাদ গ্রামের কাছে একদল স্বঘোষিত ‘গো-রক্ষক’ তার পথ আটকায়। অভিযোগ রয়েছে, তারা নাজির ও তার দুই সঙ্গীকে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে লাঠি ও লোহার রড দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে। গুরুতর আহত নাজির পরে মারা যান, তবে তার দুই সঙ্গী শেখ লালা ও সৈয়দ মুশতাক পালিয়ে গিয়ে প্রাণে বাঁচেন এবং আদালতে ঘটনার সাক্ষ্য দেন।
রায়ে বিচারক তাবাসসুম খান সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মেডিকেল রিপোর্টের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডটিকে “চরম বর্বর ও নৃশংস” বলে উল্লেখ করেন।
দণ্ডিতরা হলেন — দীপক, অজয়, প্রকাশ, পবন, অমর, কনহাইয়া, বল্লু, রাজু, আকাশ, গৌরব, আকাশ, চেতন, দেবেন্দ্র ও সন্দীপ。তারা সবাই সিওনি মালওয়ার বাসিন্দা।
বিচারকের বিরুদ্ধে হুমকি
রায় ঘোষণার পরপরই দণ্ডিতদের পরিবারের সদস্যরা আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করেন এবং পুলিশি কনভয়ে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেন। এরপর কট্টরপন্থি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোও বিক্ষোভ শুরু করে। ২২ জুন পাঞ্জাবে গৌ রক্ষা পরিষদ বিচারকের কুশপুত্তলিকা দাহ করে।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারক তাবাসসুম খানকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর মন্তব্য, সাম্প্রদায়িক গালি, হত্যার হুমকি এবং ধর্ষণ ও সহিংসতার উসকানিমূলক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে এক ব্যক্তি হুমকি দিয়ে বলেন, “১০ দিনের মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্তদের মুক্তি না দিলে সারা দেশে ‘রক্তপাত’ হবে।” ভিডিওগুলোতে ইঙ্গিত করা হয়, অভিযুক্তরা হিন্দু হওয়ায় বিচারক তাদের বিরুদ্ধে এই রায় দিয়েছেন।
বিচারকদের রায় নিয়ে সমালোচনা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে তাবাসসুম খানের বিরুদ্ধে সমালোচনার ক্ষেত্রে রায়ের আইনগত যুক্তির চেয়ে তার ধর্মীয় পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ
পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি আমলে নেয়। ১ জুলাই ২০২৬ বিচারপতি বিবেক আগরওয়াল ও বিচারপতি অবনীন্দ্র কুমার সিং-এর ডিভিশন বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
আদালত মন্তব্য করেন, “এ ধরনের হুমকি বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও ভয়হীন কাজকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।” হাইকোর্ট পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি) এবং স্বরাষ্ট্র সচিবকে তিন দিনের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেন এবং বিচারকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন。
নর্মদাপুরম পুলিশ এই ঘটনায় একটি এফআইআর দায়ের করেছে। পুলিশের সাইবার সেল ভিডিও ছড়ানো ব্যক্তিদের শনাক্ত করছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইনজীবী সংগঠনের নিন্দা
বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার এ ধরনের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন (SCBA) এবং সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেটস-অন-রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন (SCAORA)-সহ শীর্ষ আইনজীবী সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং বিচারক তাবাসসুম খানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে。
SCBA এক বিবৃতিতে বলেছে, “দেশজুড়ে বিচারকরা প্রতিদিন হাজারো সংবেদনশীল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার রায় দেন। তারা এই আশ্বাস পাওয়ার যোগ্য যে,当他们 সংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবেন, তখন আইন তাদের রক্ষা করবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ, এবং এটি ক্ষুণ্ন করার যেকোনো প্রচেষ্টা দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।”
আইনি প্রেক্ষাপট
বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা
ভারতের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর একটি অংশ হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। বিচারকদের ওপর হুমকি বা চাপ বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতাকে সরাসরি ক্ষুণ্ন করে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে。
প্রযোজ্য আইন
নর্মদাপুরম পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১৯৬ ধারা (ধর্মীয় শত্রুতা সৃষ্টি) এবং ৩০২ ধারা (শাস্তিমূলক হুমকি) অনুযায়ী মামলা দায়ের করেছে।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও গো-রক্ষক বাহিনী
ভারতে গবাদিপশু পাচারের সন্দেহে মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। এই মামলাটি সেই ধরনের সহিংসতারই একটি উদাহরণ, যেখানে “গো-রক্ষক” পরিচয়ে আত্মপ্রকাশকারীরা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. বিচারক কে? — তাবাসসুম খান, নর্মদাপুরম জেলার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ।
২. কেন সাজা দিয়েছেন? — শেখ লালা নাজির আহমেদ হত্যার দায়ে ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
৩. কী ধরনের হুমকি? — সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যার হুমকি, ধর্ষণের হুমকি ও সাম্প্রদায়িক গালি।
৪. হাইকোর্ট কী করেছে? — ১ জুলাই ২০২৬ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আমলে নিয়ে পুলিশকে নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়েছে。
৫. SCBA কী বলেছে? — হুমকির তীব্র নিন্দা ও বিচারকের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।
সংক্ষেপে
মধ্যপ্রদেশে ১৪ জন কথিত ‘গো-রক্ষককে’ যাবজ্জীবন সাজা দেওয়ায় মুসলিম নারী বিচারক তাবাসসুম খান হত্যার হুমকি ও সাম্প্রদায়িক আক্রমণের মুখে পড়েছেন। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিষয়টি আমলে নিয়ে বিচারকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়েছে। SCBA ও SCAORA হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিচারকের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। মামলাটি বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার ওপর হুমকির একটি গুরুতর উদাহরণ।
তথ্যসূত্র
সংবাদ সূত্র:
- বিবিসি — ১২ জুলাই ২০২৬
- প্রথম আলো — ১২ জুলাই ২০২৬
- দ্য হিন্দু — ৩ জুলাই ২০২৬
- টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া — ৪ জুলাই ২০২৬
- দ্য ওয়্যার — ২ জুলাই ২০২৬
- দ্য নিউজ মিনিট — ৩ জুলাই ২০২৬
- হিন্দুস্তান টাইমস — ১৬ জুলাই ২০২৬
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি ভারতের একটি আইনি বিষয় সম্পর্কিত প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশের আইনি পরামর্শ নয়। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
