নিবন্ধিত দলিল কেবল অস্বীকার করলেই বাতিল হয় না: হাইকোর্ট

Author
পেশা: আইন পেশাজীবী
দক্ষতা: বাংলাদেশ আইন ও আইনি গবেষণা

কোনো নিবন্ধিত দলিল নিয়ে আপত্তি তুললে শুধু “আমি এটি করিনি” বলাই যথেষ্ট নয়। দলিলটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পাদন করেননি, অথবা নিবন্ধনে অনিয়ম হয়েছে, এই দাবির পক্ষে আদালতে উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ দিতে হয়। ৮৫ বছর বয়সী এক মায়ের করা জমির দানপত্র বাতিলের মামলায় হাইকোর্ট এই বিষয়টিই সামনে এনেছেন।

মামলার পটভূমি

নওগাঁর মহাদেবপুরের বাসিন্দা মোছা. আয়জান বেওয়া তাঁর ছেলে মো. ফজলুর রহমানের নামে করা একটি দানপত্র বাতিলের দাবিতে ২০১১ সালে মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, অসুস্থ অবস্থায় ছেলে তাঁকে চিকিৎসার নাম করে মহাদেবপুরে নিয়ে যান এবং অজ্ঞাত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশে বিভিন্ন কাগজে তাঁর টিপসই নেওয়া হয়।

ছেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ২৫ জুলাই ৬৮৯৬ নম্বর দলিলে আয়জান বেওয়া ৭৭ শতাংশ জমি দান করেন। আয়জান বেওয়া ২০১১ সালের ১৫ মার্চ জানতে পারেন। ২৩ মার্চ তিনি সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে দলিলটি সম্পর্কে নিশ্চিত হন। এরপর ২০ এপ্রিল মামলাটি দায়ের হয়।

দলিলে আরএস খতিয়ান নং ১৬৮/১-এর ৪৯ নম্বর দাগের ১৬.৫ শতাংশ এবং আরএস খতিয়ান নং ৮২-এর ২১৬, ২১৮, ২৬৫ ও ২১৭ নম্বর দাগের ৬০.৫ শতাংশ জমির উল্লেখ ছিল।

ছেলের বক্তব্য

ফজলুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, জমিগুলো তাঁর মায়ের পৈতৃক সম্পত্তি ছিল, এবং দানপত্রের আগে মা অন্য সন্তান ও ব্যক্তিদের কাছেও জমি হস্তান্তর করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, মা নিজের ইচ্ছায় সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে গিয়ে দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধন করেন এবং পরে জমির দখল তাঁকে দেওয়া হয়। মামলাটি তাঁর ভাইয়ের প্রভাবে করানো হয়েছে, এমনও তিনি দাবি করেন।

দানপত্রের পরের হস্তান্তর

মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, বিতর্কিত দানপত্রের পরেও আয়জান বেওয়া কয়েকটি জমি অন্যদের নামে হস্তান্তর করেছিলেন। ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর ৮০৩৩ ও ৮০৩২ নম্বর দলিলে তিনি যথাক্রমে এ. করিম ও অন্যদের কাছে ৩৩ শতাংশ এবং মেয়ে সুফিয়া বেগমের কাছে ১৮.৫ শতাংশ জমি হস্তান্তর করেন। আদালত লক্ষ করেন, বাদীপক্ষ এই দলিলগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। এটি দানপত্রের সময় তিনি মানসিকভাবে সক্ষম ছিলেন কি না এবং দলিলটি স্বেচ্ছায় করা হয়েছিল কি না, তা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সাক্ষ্যে কী পাওয়া গেল

মামলায় বাদীপক্ষের দুজন ও বিবাদীপক্ষের চারজন সাক্ষ্য দেন। আয়জান বেওয়া প্রথম সাক্ষী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে ইব্রাহিম হোসেন ও সুফিয়া বেগমের সন্তানরা মামলায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন।

আয়জান বেওয়া স্বীকার করেন, তিনি আগে নিবন্ধিত দলিলে মেয়ে সুফিয়াকে এক বিঘা, ছোট মেয়েকে ১০ কাঠা এবং ছেলে ইব্রাহিমকে ১০ কাঠা জমি দিয়েছিলেন। বিতর্কিত দলিল প্রসঙ্গে তাঁর ভাষ্য ছিল, ফজলু তাঁকে দলিল লেখকের কাছে নিয়ে যান, সেখানে তিনি টিপসই দেন, কিন্তু দলিলটি তাঁকে পড়ে শোনানো হয়নি।

বিবাদীপক্ষের দলিল লেখক মো. আজগর আলী মণ্ডল বলেন, তিনি দলিলটি আয়জান বেওয়াকে পড়ে শুনিয়েছিলেন। দলিল শনাক্তকারী মো. দুলাল হাসানও জানান, নিবন্ধনের সময় তিনি আয়জান বেওয়াকে শনাক্ত করেছিলেন। ফজলুর রহমানের মামাতো ভাই আবদুস সালাম সাক্ষ্যে বলেন, আয়জান বেওয়া ছেলেকে এই জমি দান করেছিলেন।

নিবন্ধন আইনের অবস্থান

হাইকোর্ট নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর কয়েকটি ধারা ব্যাখ্যা করেন। আদালতের বক্তব্য অনুযায়ী, ৩৪, ৩৫, ৫৮ ও ৫৯ ধারায় নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল নিবন্ধন করেন এবং ৬০ ধারায় নিবন্ধনের সনদ দেন।

এই সনদের পর সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে দলিলটি আইনানুগভাবে নিবন্ধিত হয়েছে। তবে এই ধারণা অখণ্ডনীয় নয়। কোনো পক্ষ প্রমাণ করতে পারলে যে দলিল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পাদন করেননি, অথবা নিবন্ধনে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া মানা হয়নি, তাহলে এই অনুমান খণ্ডন করা যায়।

কেন মায়ের দাবি টেকেনি

আয়জান বেওয়ার মূল দাবি ছিল, তিনি ওই দানপত্র করেননি। কিন্তু হাইকোর্ট দেখেন, দলিলে থাকা টিপসই এবং সাব-রেজিস্ট্রারের টিপসই রেজিস্টারের টিপসই তাঁর নয়, এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বাদীপক্ষ উপস্থাপন করতে পারেনি।

আদালতের দৃষ্টিতে, কোনো দলিল অস্বীকার করলেই তা অবৈধ হয়ে যায় না। আপত্তির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে। এই মামলায় সেই প্রমাণ না থাকায় আদালত বাদীর দাবি মানেননি।

আগের আদালতের সিদ্ধান্ত

মহাদেবপুরের সহকারী জজ আদালত ৩১ মে ২০২২ তারিখে অন্য শ্রেণির মামলা নং ৯৬/২০১১ খারিজ করেন। এর বিরুদ্ধে আয়জান বেওয়ার উত্তরাধিকারীরা নওগাঁর জেলা জজ আদালতে ২০২২ সালের ১৩১ নম্বর দেওয়ানি আপিল করেন। অতিরিক্ত জেলা জজ, আদালত নং ১, নওগাঁ ১৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।

এরপর দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করা হয়। হাইকোর্ট নথি, সাক্ষ্য ও দুই নিম্ন আদালতের রায় পর্যালোচনা করে দেখেন, আদালতগুলো সাক্ষ্য বিবেচনা করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, বা প্রাসঙ্গিক প্রমাণ উপেক্ষা করা হয়েছে, এমন কোনো কারণ পাওয়া যায়নি।

রায়ের ফল

বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই সিভিল রিভিশন নং ৮৫৪/২০২৪-এর রায় দেন। রুল খারিজ করে নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতের রায় বহাল রাখা হয়। মামলায় কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পরে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।

বাস্তবে এর মানে কী

এই রায় থেকে সাধারণ পাঠকের জন্য কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। নিবন্ধিত দলিল থাকলেই তা চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া যায় না, আবার শুধু অস্বীকার করলেই দলিল বাতিল হয় না। যিনি দলিল বাতিল চান, তাঁকে প্রমাণ করতে হয় যে সম্পাদন বা নিবন্ধনে ত্রুটি ছিল।

এই মামলায় দলিলের টিপসই, সাব-রেজিস্ট্রারের রেজিস্টারের তথ্য, দলিল লেখক ও শনাক্তকারীর সাক্ষ্য এবং দানপত্রের পরের আচরণ, সবই বিবেচনায় এসেছে। ফলে এ ধরনের মামলায় শুধু বক্তব্য নয়, নথি ও সাক্ষ্যের ভিত্তি দরকার।

সাধারণ মানুষের জন্য করণীয়

কোনো দলিল নিয়ে সন্দেহ হলে প্রথমে দলিলের কপি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের কাগজপত্র সংগ্রহ করুন। দলিল সম্পাদনের সময় আপনি কোথায় ছিলেন, কে উপস্থিত ছিলেন এবং দলিল কি পড়ে শোনানো হয়েছিল, এসব বিষয় গুছিয়ে রাখুন। স্বাক্ষর বা টিপসই বিতর্কিত হলে বিশেষজ্ঞের মতামত বা অন্য প্রমাণের কথা আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করুন।

দেরি করলে মামলার সময়সীমা বা প্রমাণ সংগ্রহে সমস্যা হতে পারে, তাই বিষয়টি দ্রুত আইনজীবীর কাছে নিয়ে যাওয়া ভালো।

ব্যতিক্রম ও সীমাবদ্ধতা

এই রায় সব দানপত্রের ক্ষেত্রে একই ফল দেবে, এমন নয়। প্রতিটি মামলার ঘটনা, সাক্ষ্য ও নথি আলাদা। এই মামলায় প্রমাণের অভাব এবং নিম্ন আদালতের সাক্ষ্য মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভিন্ন ঘটনায় দলিলের প্রকৃত সম্পাদন বা নিবন্ধনে ত্রুটি প্রমাণ হলে ফল ভিন্ন হতে পারে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধে আলোচিত আইনি তথ্য ও আদালতের রায় কেবল সাধারণ জ্ঞান ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। এটি কোনো পেশাদার আইনি পরামর্শ নয়।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন: নিবন্ধিত দলিল কি শুধু অস্বীকার করলেই বাতিল হয়?
উত্তর: না। উৎস অনুযায়ী, সম্পাদন বা নিবন্ধনে ত্রুটির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ দিতে হয়।

প্রশ্ন: দলিল বাতিলের মামলা কোন আইনের অধীনে হয়?
উত্তর: উৎসে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৩৯ ধারার উল্লেখ আছে।

প্রশ্ন: নিবন্ধনের সনদ থাকলে কি দলিল চূড়ান্ত বলে ধরা হয়?
উত্তর: সাধারণভাবে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার বৈধতা ধরে নেওয়া হয়, তবে এই অনুমান খণ্ডনযোগ্য। দলিলের মূল সম্পাদন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা প্রমাণ করা যায়।

প্রশ্ন: এই মামলায় হাইকোর্ট কী সিদ্ধান্ত দেন?
উত্তর: হাইকোর্ট রুল খারিজ করে নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতের রায় বহাল রাখেন, কারণ বাদীপক্ষ দলিলের টিপসই ও নিবন্ধনে ত্রুটির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে পারেননি।

তথ্যসূত্র

  • সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ, সিভিল রিভিশন নং ৮৫৪/২০২৪, মোছা. আয়জান বেওয়া বনাম মো. ফজলুর রহমান, রায়ের তারিখ ২৮.০৭.২০২৬ (বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী)।
  • নিবন্ধন আইন, ১৯০৮, ধারা ৩৪, ৩৫, ৫৮, ৫৯, ৬০।
  • সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭, ধারা ৩৯।
  • সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২, ধারা ৬৭, ৬৮, ৭৩।
  • দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮, ধারা ১১৫(১)।

আরো পড়ুন — সর্বশেষ আপডেট