শিশুর হেফাজতে পারিবারিক আদালতের ডিক্রি থাকলে সরাসরি হাইকোর্টে রিট নয়
শিশুর হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে সরাসরি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ‘রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এ রায় দেন। রায়ের ২১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি কাজী জিনাত হক।
এই রায়ের মূল তাৎপর্য হলো — পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আইনগত আপিলের সুযোগ থাকলে হাইকোর্টের সংবিধানিক রিট এখতিয়ার ব্যবহার না করে আপিল দায়ের করাই হলো যথাযথ আইনি পথ।
আইনি পটভূমি
বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২(২)(বি)(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অন্যায়ভাবে আটক বা অনুরূপ অবস্থায় থাকলে হাইকোর্ট বিভাগ হেবিয়াস করপাস রিট জারি করতে পারে। অন্যদিকে, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর ১৭ ধারা অনুযায়ী, পারিবারিক আদালতের রায়, ডিক্রি বা আদেশের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিল করা যায়।
এই দুটি বিধানের মধ্যে সম্পর্ক কী — এই প্রশ্নের উত্তরই দিয়েছে ‘রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়।
মামলার পটভূমি
রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুরের একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন ভোলার বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন ও রোজিনা আক্তার দম্পতি। তাদের প্রথম সন্তান জন্মের পরপরই মারা যায়। এরপর ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সাভারের নারী-শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আরেকটি ছেলেসন্তানের (বাসমিন আবরাব) জন্ম হয়। জন্মের দুদিন পর মা ও শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
বাড়ি ফেরার পর অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে ১৭ জুলাই সাভারের সুপার মেডিকেল হাসপাতালের এনআইসিইউতে শিশুটিকে ভর্তি করা হয়। একই দিনে শিশুটির উন্নত চিকিৎসার জন্য মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করা হয়। তবে আর্থিক অনটন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও লকডাউন পরিস্থিতির কারণে জসিম উদ্দিন সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে ওই হাসপাতালে নিতে পারেননি। পরে ১৯ জুলাই তিনি শিশুটিকে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পিতাকে বারবার খোঁজ করেও পাননি। বায়োলজিক্যাল মা-বাবার সন্ধান পেতে ব্যর্থ হয়ে এবং অন্য কোনো বিকল্প না পেয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাজধানীর তেজগাঁও থানায় ২০২৪ সালের ২২ জুলাই জিডি করে। শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসের ডেপুটি কেয়ারটেকারের উদ্দেশে লিখিত চিঠির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শিশুটিকে হস্তান্তর করে।
এরপর ছোটমণি নিবাস থেকে শিশুটিকে পেতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক এক দম্পতি ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ওই দম্পতি একতরফাভাবে শিশুটির অভিভাবকত্ব, জিম্মা এবং পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য ডিক্রি পান।
রিটকারীর দাবি, অভাব-অনটনের মধ্যে হাসপাতাল ফি বাবদ ৩৬ হাজার ১৩৮ টাকা জমা দেওয়ার পর চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভয়াবহ সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার তাগিদে এবং অর্থের সংস্থান করতে পিতা-মাতা সাময়িকভাবে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট হাসপাতালে গেলে কর্তৃপক্ষ আনুমানিক ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার মোটা অঙ্কের বিল দাবি করে। এ কথা জানতে পেরে এই দম্পতি গ্রামে ফিরে গিয়ে পিতা-মাতার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থের সংস্থান করার চেষ্টা চালান।
এরপর ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ভোলা থানা থেকে ফোন করা হলে ১৬ এপ্রিল তারা ভোলা থানায় গিয়ে জানতে পারেন, তাদের শিশু সম্পর্কে ২০২৪ সালের ২২ জুলাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন আজিমপুর ‘ছোটমণি নিবাসে’ হস্তান্তর করা হয়েছে। ওই সময়ে চেষ্টা করেও জসিম-রোজিনা দম্পতি শিশুটির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাননি। এরপর শিশুটিকে দেশের বাইরে, অর্থাৎ বাংলাদেশের আদালতের এখতিয়ারের বাইরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে শিশুটির গর্ভধারিণী মা রোজিনা আক্তার হেবিয়াস করপাস আইনে হাইকোর্টে রিট করেন।
আইনি প্রশ্ন
মূল আইনি প্রশ্ন ছিল — পারিবারিক আদালত শিশুর হেফাজত সম্পর্কে ডিক্রি দেওয়ার পর, সেই ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে, হাইকোর্ট বিভাগের সংবিধানিক রিট এখতিয়ার ব্যবহার করে হেবিয়াস করপাস রিট গ্রহণ করা যায় কি না।
আদালতের সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন — পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে সরাসরি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত পারিবারিক আদালতের ডিক্রি ও আপিল প্রক্রিয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বলেন যে, আইনগত আপিলের বিকল্প থাকলে সংবিধানিক রিট এখতিয়ার ব্যবহার করা উচিত নয়।
এই রায়ের মূল ভিত্তি হলো — সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের রিট এখতিয়ার একটি বিশেষ ও ব্যতিক্রমী এখতিয়ার, যা সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত নিম্ন আদালতের এখতিয়ারকে উপেক্ষা করে ব্যবহার করা উচিত নয়, যখন ওই আইনের অধীনে কার্যকর আপিল remedy উপলব্ধ থাকে।
আইনি বিশ্লেষণ
এই রায়ের গুরুত্বপূর্ণ আইনি তাৎপর্য রয়েছে:
প্রথমত, এটি বিকল্প প্রতিকারের নীতি (exhaustion of alternative remedy)-কে পুনর্ব্যক্ত করে। পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের কার্যকর সুযোগ থাকলে হাইকোর্টের রিট এখতিয়ার ব্যবহার করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, এটি পারিবারিক আদালত ও হাইকোর্টের মধ্যে এখতিয়ারের স্পষ্ট বিভাজন নিশ্চিত করে। পারিবারিক আদালতের ডিক্রিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য আপিলই হলো যথাযথ আইনি পথ, সংবিধানিক রিট নয়।
তৃতীয়ত, এই রায় শিশুর হেফাজত সংক্রান্ত মামলায় আদালতের এখতিয়ার সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর করে এবং আইনি প্রক্রিয়ার সুশৃঙ্খলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ব্যবহারিক দিক
যদি কোনো ব্যক্তি পারিবারিক আদালতের হেফাজত সংক্রান্ত ডিক্রিতে অসন্তুষ্ট হন, তাহলে তার উচিত:
- পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর ১৭ ধারা অনুযায়ী জেলা জজ আদালতে আপিল দায়ের করা।
- আপিলের সময়সীমা হলো ডিক্রি/আদেশ পাসের তারিখ থেকে ৩০ দিন (কপি সংগ্রহের সময় ব্যতীত)।
- আপিলের জন্য প্রয়োজনীয় নথি (ডিক্রির সার্টিফায়েড কপি, আপিলের কারণ, পক্ষগুলোর নাম-ঠিকানা) প্রস্তুত করা।
- যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আপিল দায়ের করা।
সরাসরি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট দায়ের করা হলে, যদি পারিবারিক আদালতের ডিক্রি ইতিমধ্যেই থাকে এবং আপিলের সুযোগ থাকে, তাহলে রিট গ্রহণযোগ্য নয় বলে খারিজ হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা
এই রায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো — এই নীতিটি সেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে পারিবারিক আদালত বৈধভাবে এখতিয়ার প্রয়োগ করে ডিক্রি দিয়েছেন। যদি পারিবারিক আদালতের ডিক্রি না থাকে, অথবা শিশুকে কোনো বৈধ আদালতের আদেশ ছাড়াই আটকে রাখা হয়, তাহলে হেবিয়াস করপাস রিট এখনও কার্যকর হতে পারে। এই রায় শুধুমাত্র সেই পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য যেখানে পারিবারিক আদালতের ডিক্রি বিদ্যমান এবং আপিলের সুযোগ রয়েছে।
উপসংহার
‘রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায় পারিবারিক আইন ও সংবিধানিক রিট এখতিয়ারের মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্ট করেছে। শিশুর হেফাজত সংক্রান্ত পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে সরাসরি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট দায়ের করা গ্রহণযোগ্য নয়। এই রায় আইনি প্রক্রিয়ার সুশৃঙ্খলতা বজায় রাখতে এবং পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারকে সম্মান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তথ্যসূত্র
- রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র (হাইকোর্ট বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট) — রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত।
- পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ — ধারা ৫ ও ১৭।
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ১০২।
ডিসক্লেইমার
এই লেখাটি সাধারণ আইনগত তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। নির্দিষ্ট কোনো মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, তথ্য ও পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
FAQ
১. পারিবারিক আদালতের হেফাজত সংক্রান্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে কোথায় আপিল করা যায়?
পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর ১৭ ধারা অনুযায়ী, পারিবারিক আদালতের রায়, ডিক্রি বা আদেশের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিল করা যায়।
২. আপিলের সময়সীমা কত?
ডিক্রি বা আদেশ পাসের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের করতে হয় (সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের সময় ব্যতীত)। জেলা জজ আদালত পর্যাপ্ত কারণ থাকলে এই সময়সীমা বাড়াতে পারেন।
৩. পারিবারিক আদালতের ডিক্রি থাকলে কি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট দায়ের করা যায়?
না। যদি পারিবারিক আদালতের ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকে, তাহলে সরাসরি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন।
৪. এই রায়ের প্রভাব কী?
এই রায় পারিবারিক আদালতের ডিক্রিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য আপিলকেই একমাত্র যথাযথ আইনি পথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং হাইকোর্টের রিট এখতিয়ারের অপব্যবহার রোধ করে।
৫. যদি পারিবারিক আদালতের ডিক্রি না থাকে তাহলে কী হবে?
পারিবারিক আদালতের বৈধ ডিক্রি না থাকলে এবং শিশুকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হলে হেবিয়াস করপাস রিট এখনও কার্যকর হতে পারে। এই রায় শুধুমাত্র সেই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে পারিবারিক আদালতের ডিক্রি বিদ্যমান এবং আপিলের সুযোগ রয়েছে।
