চূড়ান্ত সাজার পর দি নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ধারা ১৪৭ (ভারত)-এর কার্যকারিতা ও পার্শার্বনাথ ওয়েল্ড ওয়্যারস মামলার বিশ্লেষণ
১. ভূমিকা:
ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো, কোনো আদালত একবার চূড়ান্ত রায় বা সাজা ঘোষণা করলে, সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যত্যয় ছাড়া সেই রায় পুনর্বিবেচনা বা রিভিউ করতে পারেন না। ভারতের ফৌজদারি কার্যবিধি কোডের (CrPC) ধারা ৩৬২ স্পষ্টভাবে বলে যে, কোনো ফৌজদারি আদালত তার চূড়ান্ত রায়ে স্বাক্ষর করার পর কেরানিগত বা গাণিতিক ভুল সংশোধন ছাড়া মূল রায় পরিবর্তন করতে পারে না। অন্যদিকে, ভারতের ১৮৮১ সালের নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের (N.I. Act) ধারা ১৪৭ ঘোষণা করে যে, এই আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য প্রতিটি অপরাধ আপোসযোগ্য বা মওকুফযোগ্য।
এই দুই বিধানের মধ্যে আপাত দ্বন্দ্বই চেক ডিসঅনার (ধারা ১৩৮) মামলায় চূড়ান্ত সাজার পর একটি জটিল আইনি প্রশ্ন তৈরি করে: সাজা হয়ে যাওয়ার পরও কি আসামি অভিযোগকারীর সাথে আপস করে অপরাধ মওকুফের আবেদন করতে পারেন? সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পার্শার্বনাথ ওয়েল্ড ওয়্যারস প্রাইভেট লিমিটেড ও অপর বনাম ছত্তীসগঢ় রাজ্য ও অপর [Criminal Appeal No. 2904/2026] মামলায় এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করে একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। আদালত স্পষ্ট করেছেন যে, ধারা ১৪৭-এর আওতায় অপরাধ মওকুফের আবেদন কোনো রিভিউ পিটিশন নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র সংবিধিবদ্ধ প্রতিকার, যা চূড়ান্ত সাজার পরও গ্রহণযোগ্য।
২. আইনি সংকট: ফৌজদারি আদালতে রিভিউ-এর নিষেধাজ্ঞা
ফৌজদারি কার্যবিধি কোডের ধারা ৩৬২ (ভারত) ফৌজদারি আদালতকে তাদের নিজস্ব রায় রিভিউ করার ক্ষমতা দেয় না। এই বিধানটি বিচারিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ততা নিশ্চিত করে। যুক্তিটি হলো, একবার একটি মামলা আইনি প্রক্রিয়ার সব পর্যায় অতিক্রম করে চূড়ান্ত সাজায় পৌঁছালে, সেই সাজা আর বদলানো উচিত নয়।
এই মামলায় ছত্তীসগঢ়ের নিম্ন আদালত (JMFC) এবং পরবর্তীতে ছত্তীসগঢ় হাইকোর্ট এই নীতির ওপরই নির্ভর করে আসামিদের আপোসের আবেদন খারিজ করে দেয়। তাদের পর্যবেক্ষণ ছিল, চূড়ান্ত সাজা হয়ে যাওয়ার পর তারা আর সেই রায় পুনর্বিবেচনা করতে পারেন না। কিন্তু তারা যে বিষয়টি উপেক্ষা করে, তা হলো আসামিরা কোনো রিভিউ পিটিশন দাখিল করেনি; বরং তারা ভারতের নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ধারা ১৪৭-এর অধীনে অপরাধ মওকুফের আবেদন করেছিল।
সুপ্রিম কোর্ট তাঁর রায়ের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে এই জটিলতাটি হুবহু তুলে ধরেছেন:
“In the light of the said settlement arrived at between the parties for compounding the offence as provided under Section 147 of the NI Act, an application was filed before the JMFC, which came to be rejected and affirmed by the High Court on the ground that judgment cannot be reviewed. Hence, the present appeal.”
৩. ধারা ১৪৭: ‘নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ’-এর আইনি শ্রেষ্ঠত্ব
ভারতের নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ধারা ১৪৭-এর পূর্ণ ধারাটি বিবেচনা করলে এর শক্তি স্পষ্ট হয়:
“১৪৭. অপরাধসমূহ আপোসযোগ্য হবে। ১৯৭৩ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি কোডে যাই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য প্রতিটি অপরাধ আপোসযোগ্য হবে।”
এই ধারার শুরুতে ‘Notwithstanding anything contained in the Code of Criminal Procedure, 1973’ এই ‘নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ’ ফৌজদারি কার্যবিধি কোডের সকল বিধানকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা রাখে। এর অর্থ হলো, CrPC-এর ধারা ৩৬২ যাই বলুক না কেন, এনআই অ্যাক্টের অধীনে অপরাধসমূহ মওকুফ যোগ্য।
সুপ্রিম কোর্ট এই ধারাটির যথার্থ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, ধারা ১৪৭-এর আওতায় অপরাধ মওকুফের আবেদন গ্রহণ করার অর্থ হলো অপরাধটিকে মার্জনা করা, যার ফলে মূল সাজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটি কোনো রিভিউ নয়, বরং একটি স্বাধীন আইনি প্রক্রিয়া।
৪. রিভিউ ও কম্পাউন্ডিং-এর মধ্যে পার্থক্য
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বক্তব্য হলো রিভিউ ও কম্পাউন্ডিংয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য। নিচে একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
বৈশিষ্ট্য: রিভিউ (Review)
আইনি ভিত্তি: CrPC-এর ধারা ৩৬২ (ভারত)
উদ্দেশ্য: রায়ের ত্রুটি সংশোধন করা
কার্যকারিতা: রায় পুনর্বিবেচনা করে পরিবর্তন করা
কর্তৃপক্ষ: একই আদালত (যে রায় দিয়েছে)
সময়সীমা: সীমিত সময়ের মধ্যে
বৈশিষ্ট্য: কম্পাউন্ডিং (Compounding)
আইনি ভিত্তি: ভারতের নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ধারা ১৪৭
উদ্দেশ্য: অপরাধকে মার্জনা করা ও বিরোধের নিষ্পত্তি করা
কার্যকারিতা: অপরাধ মওকুফ করায় সাজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়
কর্তৃপক্ষ: সাজা প্রদানকারী আদালত, আপিল আদালত বা চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারী আদালত
সময়সীমা: যেকোনো পর্যায়ে (চূড়ান্ত সাজার পরও)
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছেন যে, নিম্ন আদালত যখন ধারা ১৪৭-এর আবেদন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তারা আসলে রিভিউ ও কম্পাউন্ডিং-এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হয়।
৫. সমঝোতার শর্ত ও অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি
২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল অভিযোগকারী ও আসামি পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়। শর্ত ছিল: আসামি পক্ষ অভিযোগকারীকে ডিমান্ড ড্রাফটের মাধ্যমে ৩০ লক্ষ রুপি পরিশোধ করবে, যা মূল চেকের পরিমাণের চেয়ে ২ লক্ষ রুপি বেশি। অভিযোগকারী লিখিতভাবে অর্থ গ্রহণ করেন এবং নিশ্চিত করেন যে তার সকল দাবি নিষ্পন্ন হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট তাঁর রায়ের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন:
“However, within two days thereafter, a settlement was entered into between the parties namely the complainant and the accused on 25.04.2026 whereunder the complainant agreed to compound the offence on receipt of full and final payment of Rs.30,00,000/- from the appellant(s) – accused. The said amount was paid by accused through Demand Draft and duly acknowledged by the complainant. Thus, the grievance of the complainant stood complied.”
৬. সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও চূড়ান্ত রায়
বিচারপতি অরবিন্দ কুমার ও বিচারপতি প্রসন্ন বি. বরালে সমন্বয়ে গঠিত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ পূর্ববর্তী নজির জ্ঞান চাঁদ গর্গ বনাম হরপাল সিং (২০২৫ এসসিসি অনলাইন এসসি ২৩১৭) অনুসরণ করে বলেন, এই আইনের অধীনে অপরাধ যেকোনো পর্যায়ে মওকুফ যোগ্য। যেহেতু অভিযোগকারী তার পাওনা টাকা পেয়েছেন এবং সমঝোতায় রাজি হয়েছেন, তাই আসামিকে কারাগারে আটকে রাখার কোনো যুক্তি নেই।
আদালত তাঁর রায়ের ৫ ও ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলেন:
“Having heard the learned Advocates appearing for the parties and in view of the law laid down by this Court in the case of Gian Chand Garg vs. Harpal Singh and Another reported in 2025 SCC OnLine SC 2317, we have no hesitation to accept the compromise entered into and compound the offence, particularly in the light of settlement arrived at between the parties.”
“Hence, the present appeal is allowed. Consequently, the impugned judgment dated 11.05.2026 rendered in CRMP No.1328/2026 by the High Court of Chhattisgarh at Bilaspur is set aside and the order of conviction and sentence imposed on the appellant is quashed.”
ফলে আদালত ছত্তীসগঢ় হাইকোর্টের ১১ মে, ২০২৬-এর আদেশ বাতিল করে এবং আসামির সাজা কোয়াশ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে সেন্ট্রাল জেল, রায়পুরের সুপারিনটেনডেন্টকে আসামি শ্রী হেমন্ত জৈনকে (শ্রী নন্দলাল জৈনের পুত্র) অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
৭. রায়ের তাৎপর্য ও আইনি শিক্ষা
এই রায় আইনি পেশাজীবীদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে:
প্রথমত, ধারা ১৪৭-এর আওতায় অপরাধ মওকুফের আবেদনকে কখনো রিভিউ পিটিশন হিসেবে ভুল করা উচিত নয়। এরা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া।
দ্বিতীয়ত, ‘নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ’ ফৌজদারি কার্যবিধির সাধারণ বিধানকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা রাখে। তাই চূড়ান্ত সাজার পরও এই আবেদন গ্রহণযোগ্য।
তৃতীয়ত, অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি নিয়ে আদালত নমনীয়। সরাসরি অভিযোগকারীকে ডিমান্ড ড্রাফটের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করলেও তা বৈধ, যদি অভিযোগকারী তা লিখিতভাবে স্বীকার করেন।
চতুর্থত, এই রায় প্রমাণ করে যে, এনআই অ্যাক্টের মূল উদ্দেশ্য শাস্তি নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে আর্থিক প্রতিকার দেওয়া। যখন সেই প্রতিকার দেওয়া হয়েছে, তখন সাজা বহাল রাখা বিচারিক দূরদর্শিতার পরিপন্থী।
৮. উপসংহার
পার্শার্বনাথ ওয়েল্ড ওয়্যারস বনাম ছত্তীসগঢ় রাজ্য (২০২৬) মামলাটি ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার যান্ত্রিক প্রয়োগের বিরুদ্ধে একটি বড় দৃষ্টান্ত। এই রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, চেক ডিসঅনার মামলায় “রিভিউ করা যাবে না”—এই যান্ত্রিক অজুহাতে অপরাধ মওকুফের মতো একটি বৈধ সংবিধিবদ্ধ অধিকারকে অস্বীকার করা যাবে না। ধারা ১৪৭-এর ‘নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ’ ফৌজদারি কার্যবিধির রিভিউ সংক্রান্ত সকল বাধাকে অগ্রাহ্য করে এবং যেকোনো পর্যায়ে আপসের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি করে। আইনের মূল লক্ষ্য যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে তার আর্থিক ক্ষতিপূরণ ফিরিয়ে দেওয়া, সেখানে টাকা আদায়ের পর আসামিকে কারাগারে আটকে রাখা বিচারিক দূরদর্শিতার পরিপন্থী। এই আধুনিক বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি বাণিজ্যিক বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করবে এবং আদালতের অমূল্য সময় সাশ্রয় করবে।
লেখক: মোঃ করমুল্লাহ্,
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং চট্টগ্রাম জজ কোর্ট
আর্টিকেল পাঠানোর জন্য যোগাযোগ: info.advlegaladvise@gmail.com