আদালতের শর্ত ও সময়সীমা পালনে ব্যর্থতা: নিলামকৃত সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার আইনি সুযোগ হারালেন ঋণগ্রহীতা।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের এই রায়টি অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১২(৩) এবং ১২(৮) ধারার প্রয়োগ এবং আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের শর্ত পালনের গুরুত্বের ওপর একটি মাইলফলক দলিল।
১. মামলার মৌলিক তথ্য (Case Profile)
মামলা নম্বর: রিট পিটিশন নং ১২৬৭৫/২০২২।
আদালত: বিচারপতি মোঃ মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি রেজাউল করিম-এর সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ।
আবেদনকারী: এ.টি.এম. আশরাফুল ইসলাম হেলাল।
বিবাদী: বাংলাদেশ সরকার এবং অন্যান্য (তন্মধ্যে বিবাদী নং ৫ হলো ঋণদাতা ব্যাংক এবং বিবাদী নং ৬ ও ৭ হলো নিলাম ক্রেতা)।
শুনানির তারিখ: ১৫ এবং ১৬ জুলাই, ২০২৬।
রায়ের তারিখ: ১৬ জুলাই, ২০২৬।
২. ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বিবাদ (Background of the Case):
আবেদনকারী সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে ৩০,০০,০০০ টাকা ঋণ গ্রহণ করেছিলেন, যা কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২,৮০,৭৪৫ টাকা। ব্যাংক উক্ত বকেয়া আদায়ের জন্য অর্থ ঋণ আদালত আইনের ১২(৩) ধারায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি জারি করে এবং ২৭.১২.২০২১ তারিখে সম্পত্তিটি ৭০,০০,০০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার এবং বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার প্রায় ১০ মাস পর আবেদনকারী হাইকোর্টে এই রিট পিটিশন দায়ের করেন।
৩. আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ ও খেলাপি হওয়া:
রিটটি দায়েরের পর আদালত একটি ‘রুল নিশি’ জারি করেন এবং আবেদনকারীকে ৯০ দিনের মধ্যে সমস্ত বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দেন। আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, এই সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে রুলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ (Discharged) হয়ে যাবে। কিন্তু আবেদনকারী নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে অর্থ জমা দিতে ব্যর্থ হন। যদিও তিনি পরে টাকা জমা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন, কিন্তু আদালতের মতে, প্রথম আদেশের শর্ত ভঙ্গ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই রুলের আইনগত কার্যকারিতা শেষ হয়ে গিয়েছিল।
৪. আইনি বিতর্ক ও পর্যবেক্ষণ (Legal Observations):
অকার্যকর রুল: আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, যেহেতু আবেদনকারী ৯০ দিনের ‘ডিফল্ট অর্ডার’ পালন করেননি, তাই পরবর্তীতে সেই রুল বা স্থগিতাদেশ বর্ধিত করার আর কোনো আইনি ভিত্তি থাকে না।
বিকল্প প্রতিকার: আদালত স্পষ্ট করেন যে, নিলাম প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা জালিয়াতি হয়ে থাকলে অর্থ ঋণ আদালত আইনের ১২(৮) ধারা অনুযায়ী আবেদনকারীর জন্য ‘বিকল্প প্রতিকার’ (Alternative Remedy) বিদ্যমান ছিল, যা তিনি গ্রহণ করেননি।
মালিকানা স্বত্ব: নিলামের মাধ্যমে সম্পত্তির দলিল রেজিস্ট্রি এবং নামজারি (Mutation) সম্পন্ন হয়ে যাওয়ায় বিবাদী নং ৬ ও ৭-এর ওপর সম্পত্তির নিরঙ্কুশ ও অলঙ্ঘনীয় মালিকানা স্বত্ব অর্পিত হয়েছে।
৫. আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আদালত আবেদনকারীর রিট পিটিশনটি খারিজ (Discharged) করে দেন। তবে আবেদনকারীর প্রতি ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত ব্যাংককে নির্দেশ দেন যে:
নিলাম থেকে প্রাপ্ত ৭০,০০,০০০ টাকা থেকে ব্যাংকের আসল বকেয়া কেটে রাখার পর অবশিষ্ট টাকা অবিলম্বে আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।
রিভিউ মন্তব্য
এই রায়ের মাধ্যমে এটি আবারও প্রমাণিত হলো যে, আদালতের দেওয়া সময়সীমা এবং শর্ত কঠোরভাবে পালনীয়। বিশেষ করে অর্থ ঋণ সংক্রান্ত মামলায় নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ না করলে পরবর্তী কোনো আইনি যুক্তি সাধারণত গ্রহণযোগ্য হয় না। এছাড়া নিলাম ক্রেতাদের অধিকার রক্ষায় আদালতের অবস্থান এই রায়ে অত্যন্ত স্পষ্ট।
__________
সাদ্দাম হোসাইন আবির
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট