মধ্যস্থতা প্রশিক্ষণ: ৪৫ লাখ মামলার জট কমাতে জাইকা-আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ

আইনমন্ত্রী

দেশের আদালতে বিচারাধীন প্রায় ৪৫ লাখ মামলার জট নিরসনে মধ্যস্থতা (বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, বিরোধ নিষ্পত্তির এই পদ্ধতি বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক ভোগান্তি কমিয়ে দ্রুত, সহজ এবং সাশ্রয়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম।

গত ১ আগস্ট ২০২৬ (শনিবার) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির লক্ষ্যে মধ্যস্থতা এবং দেওয়ানি মামলা পরিচালনা পদ্ধতির উন্নয়ন’ (Development of Mediation and Civil Litigation Practices for Enhancement of Access to Justice Project) প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘আইন পেশাজীবীদের জন্য মৌলিক মধ্যস্থতা প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রশিক্ষণটি ৩১ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়।

কী ঘটেছে?

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো দেশে মধ্যস্থতা ব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করা, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং বিচারপ্রার্থীদের জন্য দ্রুত, সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী ন্যায়বিচারের পথ সুগম করা। প্রকল্পটি ২০২৪ সালের এপ্রিলে শুরু হয়।

দুই দিনের এ প্রশিক্ষণে দেশের বিভিন্ন জেলার জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও জেলা জজ আদালতে কর্মরত আইনজীবীসহ মোট ৪০ জন অংশ নেন। এদের মধ্যে ছিলেন স্পেশাল মিডিয়েটর, লিগ্যাল এইড অফিসার, আইন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অধিদপ্তর (ডিবিএলএ), বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (জাটি) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তারা। প্রশিক্ষণে মধ্যস্থতার মৌলিক ধারণা, কার্যকর যোগাযোগ, সমঝোতা পরিচালনার কৌশল, ব্যবহারিক অনুশীলন এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মূল প্রশিক্ষক ছিলেন জাপানের কেইও ইউনিভার্সিটি ল স্কুলের অধ্যাপক ও আইনজীবী মিস মাসাকো মিয়াতাকে, যিনি জাপানের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা এবং মধ্যস্থতার ব্যবহারিক কৌশল তুলে ধরেন।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য

আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো দরিদ্র, প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে আইনি সহায়তা পেতে পারেন।

তিনি বলেন, একজন মধ্যস্থতাকারীর জন্য কেবল আইনের জ্ঞান যথেষ্ট নয়; মানবিকতা, ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে সমাধান বের করার দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে তিনি অংশগ্রহণকারীদের জাপানের ‘Justice with a Smile’ গ্রন্থটি পড়ার পরামর্শ দেন এবং বলেন, এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, অনেকের ধারণা আইনজীবীরা সমঝোতাভিত্তিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহী নন। কিন্তু বাস্তবে দেশে ও বিদেশে অসংখ্য সফল মধ্যস্থতা ও সালিশে আইনজীবীরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বর্তমান সময়ে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ইতিবাচক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, হত্যা বা অন্যান্য গুরুতর আমলযোগ্য অপরাধ ছাড়া অধিকাংশ বিরোধ মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিক চাপ ও নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

জাপানে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ

প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, প্রকল্পের আওতায় সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রদর্শনকারী একজন নারী ও একজন পুরুষ মধ্যস্থতাকারীকে জাপানে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “একজন নারী ও একজন পুরুষ মধ্যস্থতাকারীকে জাপানে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত করা হবে। আমি বিশ্বাস করি, এই প্রণোদনা মধ্যস্থতাকারীদের সর্বোত্তম পারফরম্যান্সে উৎসাহিত করবে।” এর মাধ্যমে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও পেশাদার মধ্যস্থতাকারী তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এ সময় তিনি জাপান সরকার, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপানের কেইও ইউনিভার্সিটি ল স্কুলের অধ্যাপক ও আইনজীবী মিস মাসাকো মিয়াতাকে এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও জাপানের বিদ্যমান সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি ঢাকা-নারিতা রুটে সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।

পাইলট প্রকল্পের সাফল্য

জাইকার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে নরসিংদী ও কুমিল্লা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে একটি পাইলট কার্যক্রম চালানো হয়। সেখানে ৪২ জন লয়ার-মিডিয়েটরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং তাদের মাধ্যমে ৮৯৮টি মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংশোধিত লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস আইনের মাধ্যমে স্পেশাল মিডিয়েটর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

এছাড়া, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন। প্রি-কেস (মামলাপূর্ব) বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা চালুর পর বিভিন্ন আইনে মামলা দায়েরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পারিবারিক আদালত আইনে মামলা ৩,৫৫৯টি থেকে কমে ১,৭৪৪টিতে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৫১ শতাংশ হ্রাস। সিভিল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টনসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ২,০০১টি থেকে কমে ৬৬১টিতে নেমেছে, যা ৬৬.৯৭ শতাংশ হ্রাস। সব মিলিয়ে গড়ে মামলা দায়ের ৬২.০২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

জাইকা আরও জানায়, ২০২৬ সালের শেষ দিকে ‘অ্যাডভান্সড মিডিয়েশন ট্রেনিং’ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে স্পেশাল মিডিয়েটরদের দক্ষতা আরও বাড়ানো এবং জাপানের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কাজ চলবে।

আইনি প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি ভিত্তি হলো লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস আইন, ২০০০ (সংশোধিত)। এই আইনের অধীনে দেশে ‘স্পেশাল মিডিয়েটর’ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। জাইকার সহায়তায় পরিচালিত পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। জাপানের মধ্যস্থতা ব্যবস্থা অত্যন্ত সফল এবং বাংলাদেশে জাপানি অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই এই প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

মধ্যস্থতা কী? মধ্যস্থতা হলো বিরোধ নিষ্পত্তির একটি পদ্ধতি, যেখানে একজন নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষ (মধ্যস্থতাকারী) বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে সহায়তা করেন। এটি আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি কার্যকর উপায়।

স্পেশাল মিডিয়েটর কী? সংশোধিত লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস আইনের অধীনে ‘স্পেশাল মিডিয়েটর’ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। প্রশিক্ষিত আইনজীবী, অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারকরা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাচ্ছেন।

জাপানে প্রশিক্ষণের সুযোগ কীভাবে পাওয়া যাবে? প্রকল্পের আওতায় সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রদর্শনকারী একজন নারী ও একজন পুরুষ মধ্যস্থতাকারীকে জাপানে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরবর্তী কী হবে? ২০২৬ সালের শেষ দিকে অ্যাডভান্সড মিডিয়েশন ট্রেনিং আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে স্পেশাল মিডিয়েটরদের দক্ষতা আরও বাড়ানো হবে।

সংক্ষেপে

  • ১ আগস্ট ২০২৬-এ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুই দিনব্যাপী মধ্যস্থতা প্রশিক্ষণ শেষ হয়।
  • প্রশিক্ষণে ৪০ জন অংশ নেন; মূল প্রশিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক মাসাকো মিয়াতাকে।
  • প্রকল্প: ‘Development of Mediation and Civil Litigation Practices for Enhancement of Access to Justice Project’ (A2J Project), ২০২৪ সালের এপ্রিলে শুরু।
  • পাইলট প্রকল্পে নরসিংদী ও কুমিল্লায় ৪২ জন লয়ার-মিডিয়েটর প্রশিক্ষিত, ৮৯৮টি মামলা নিষ্পত্তি।
  • প্রি-কেস মেডিয়েশনের ফলে মামলা দায়ের গড়ে ৬২ শতাংশ কমেছে।
  • ২০২৬ সালের শেষ দিকে অ্যাডভান্সড মিডিয়েশন ট্রেনিংয়ের পরিকল্পনা।

তথ্যসূত্র

মাধ্যম সূত্র:

  • কালের কণ্ঠ — ১ আগস্ট ২০২৬
  • বাসস (BSS) — ১ আগস্ট ২০২৬
  • আমার দেশ — ১ আগস্ট ২০২৬
  • দৈনিক ইনকিলাব — ১ আগস্ট ২০২৬
  • বাংলানিউজ২৪ — ১ আগস্ট ২০২৬
  • লইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — ৬ আগস্ট ২০২৫
  • বাসস (BSS) — ২১ জুলাই ২০২৬

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস আইন, ২০০০ (সংশোধিত)
  • জাইকা বাংলাদেশ — A2J Project-এর প্রকল্প নথি
  • বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অধিদপ্তর — স্পেশাল মিডিয়েটর ব্যবস্থার নীতিমালা

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.