স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠনে নীতিগত অনুমোদন, নেতৃত্বে অতিরিক্ত আইজিপি

সাইবার পুলিশ ইউনিট

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের জন্য অবশেষে গঠন হতে যাচ্ছে স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’। একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে প্রাথমিকভাবে পুলিশের বর্তমান জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবহার করেই ইউনিটটির কার্যক্রম শুরু হবে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী এর পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে।

সাইবার অপরাধের তদন্ত, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রম বর্তমানে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পৃথকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ইউনিট এবং পুলিশের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট শাখা আলাদাভাবে এসব কাজ করছে। নতুন ইউনিটের মাধ্যমে এসব সক্ষমতাকে একটি স্থায়ী ও সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নীতিগত অনুমোদন

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-৩ শাখা থেকে গত ২১ সেপ্টেম্বর পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তানভীর-আল-নাসীফ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোয় বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, পুলিশের বর্তমান জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে সাইবার পুলিশ ইউনিটের কার্যক্রম শুরুর নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হলো।

তবে ইউনিটটির পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো, নতুন পদের সংখ্যা, যানবাহন ও অন্যান্য লজিস্টিকস এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ জন্য প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি ও যানবাহন টিওঅ্যান্ডইভুক্তকরণসহ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব তিন কার্যদিবসের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের চিঠি অনুযায়ী, গত ১৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ অধিদফতর থেকে পাঠানো প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সিআইডি-ডিএমপির সাইবার সক্ষমতা এক ছাতার নিচে

পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, দেশে সাইবার অপরাধ বাড়ায় অপরাধের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্য প্রয়োজন। এ কারণে বিভিন্ন ইউনিটে থাকা সাইবার বিশেষজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তাদের নতুন সাইবার পুলিশ ইউনিটে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে সিআইডির অধীনে সাইবার পুলিশ সেন্টার ও ফরেনসিক বিভাগ রয়েছে। পুলিশের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের আওতায় ডিজিটাল তদন্ত ও ফরেনসিক-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও রয়েছে। সিআইডির বর্তমান সাংগঠনিক তথ্যেও ডিআইজি (সাইবার পুলিশ সেন্টার) পদ রয়েছে।

এ ছাড়া ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) কাঠামোর মধ্যেও সাইবার অপরাধসংক্রান্ত কর্মকর্তা রয়েছেন। ফলে নতুন ইউনিট গঠনের পর এসব ইউনিটের দায়িত্ব, এখতিয়ার ও জনবলের পুনর্বিন্যাস হতে পারে।

২১ সেপ্টেম্বরের মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা নেই। ফলে নতুন ইউনিট চালু হওয়ার পর সিআইডি, ডিএমপি ও অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী হবে, কোন ধরনের মামলা নতুন ইউনিট তদন্ত করবে এবং কোন পর্যায়ে স্থানীয় থানা বা জেলা পুলিশের ভূমিকা থাকবে—এসব বিষয় পরবর্তী সাংগঠনিক প্রস্তাবে স্পষ্ট হওয়ার কথা রয়েছে বলে মনে করছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

অনলাইন জুয়া থেকে প্রতারণা, বদলেছে অপরাধের ধরন

সাইবার অপরাধের ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, অনলাইন আর্থিক জালিয়াতি, অ্যাকাউন্ট দখল, ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা, অনলাইন জুয়া এবং ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানির মতো অপরাধের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের নতুন নতুন ধরন সামনে আসছে।

২০২৫ সালের সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্সের Section 20 অনুযায়ী অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাইবার পরিসরে নারী ও শিশুর যৌন হয়রানি, নিপীড়নসহ কয়েক ধরনের অপরাধকে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, নতুন সাইবার পুলিশ ইউনিটের কার্যক্রম শুরু হলে এসব অপরাধের তদন্তে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

শুধু তদন্ত নয়, ডিজিটাল ফরেনসিকেও জোর

সরকারের পরিকল্পনা শুধু কেন্দ্রীয় একটি সাইবার তদন্ত ইউনিট গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। আগামী অক্টোবরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হবে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ পরিকল্পনার কথা জানান। বৈঠকে সাইবার অপরাধ দমন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণ বিনিময় নিয়েও আলোচনা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় চীনের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখার জন্য বাংলাদেশ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল চীনে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সিআইডির নেতৃত্বে একজন অতিরিক্ত আইজিপি, একজন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং সাইবার ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিষয়ে দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা থাকবেন।

প্রতিনিধিদলটি চীনের সাইবার ল্যাব ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা পরিদর্শন করে বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় ফরেনসিক ল্যাব ও সরঞ্জাম স্থাপনের বিষয়ে প্রস্তাব দেবে।

তদন্তে সময়সীমাও গুরুত্বপূর্ণ

সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স, ২০২৫-এর Section 32 অনুযায়ী সাইবার অপরাধের তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার বিধান রয়েছে। সাধারণভাবে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অভিযোগের দায়িত্ব পাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার অনুমোদনে আরও ১৫ দিন সময় বাড়ানো যায়। বিশেষ পরিস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের অনুমতিতে আরও ৩০ দিন অতিরিক্ত সময় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মে মাসের পরিকল্পনা থেকে সেপ্টেম্বরের অনুমোদন

সাইবার অপরাধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ভুয়া তথ্যসহ বিভিন্ন ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলায় আলাদা সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনার কথা সরকার চলতি বছরের মে মাসেই জানিয়েছিল।

এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজের পরিচালনা বোর্ডের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পুলিশের প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার সায়েন্সের পটভূমির সদস্যদের কাজে লাগিয়ে একজন অতিরিক্ত আইজিপির নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা চলছে।

তিনি তখন বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর, ডিএমপির সাইবার ইউনিট এবং সিআইডি বর্তমানে বিভিন্ন ডিজিটাল অপরাধের তদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে করছে। এসব কার্যক্রমের জন্য একটি স্থায়ী ও সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন।

নজর থাকবে পূর্ণাঙ্গ কাঠামোয়

স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের নীতিগত অনুমোদন হলেও কতজন কর্মকর্তা থাকবেন, কোন কোন শাখা থাকবে, দেশব্যাপী ইউনিটের বিস্তৃতি কতটা হবে, জেলা ও থানার সঙ্গে সমন্বয় কীভাবে হবে, সাইবার অপরাধের কোন কোন মামলা কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত করা হবে এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার-দক্ষিণ) সৈয়দ হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সাইবার অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। এ কারণে সারাদেশে আলাদা সাইবার ইউনিট গঠনের উদ্যোগ প্রয়োজন বিবেচনা করেই নেওয়া হচ্ছে। নতুন ইউনিট গঠিত হলে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত মামলাগুলো আরও সমন্বিতভাবে পরিচালনা ও তদন্তের সুযোগ তৈরি হবে।’

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাইফুদ্দিন শাহীন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সারাদেশে আলাদা সাইবার ইউনিট গঠনের উদ্যোগটি বর্তমান সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাইবার অপরাধের প্রবণতা বাড়তে থাকায় এমন উদ্যোগ প্রয়োজনীয়।’

তবে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রাথমিকভাবে নতুন ইউনিটটির কার্যক্রম শুরু হবে কি না—এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা তারা পাননি।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তানভীর-আল-নাসীফ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পুলিশের সাইবার ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে চলছে। বর্তমান জনবল ও অবকাঠামোর মধ্যেই প্রাথমিকভাবে ইউনিটটির কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুলিশের প্রস্তাবিত কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে তা দ্রুত মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কাজ চলছে।’

সাইবার অপরাধ দমনে সিআইডি, ডিবি ও পুলিশের বিভিন্ন সাইবার সংশ্লিষ্ট ইউনিটে কাজ করা এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মূল লক্ষ্য হলো সাইবার অপরাধ করে যাতে কেউ পার পেয়ে না যায় তা নিশ্চিত করা।’


সূত্র:

  • Cyber Security Ordinance, 2025 — Sections 20, 32
  • Ministry of Home Affairs, Police-3 Branch — Letter dated 21 September 2026
  • Jugantor, 25 September 2026
  • Bangla Tribune, 22 September 2026

FAQ

১. সাইবার পুলিশ ইউনিট কী?
সাইবার অপরাধের তদন্ত, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোয় গঠিত একটি স্বতন্ত্র ইউনিট।

২. ইউনিটটি কে নেতৃত্ব দেবেন?
একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) ইউনিটটির নেতৃত্ব দেবেন।

৩. সাইবার অপরাধের তদন্তে সময়সীমা কত?
সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স, ২০২৫-এর Section 32 অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। প্রয়োজনে ১৫ দিন এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে আরও ৩০ দিন সময় বাড়ানো যায়।

৪. অনলাইন জুয়া কি নিষিদ্ধ?
হ্যাঁ। সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স, ২০২৫-এর Section 20 অনুযায়ী অনলাইন জুয়া ও জুয়া-সংক্রান্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ।

৫. নতুন ইউনিট চালু হলে সিআইডি ও ডিএমপির সাইবার ইউনিটের কী হবে?
নতুন ইউনিটের সঙ্গে সিআইডি, ডিএমপি ও অন্যান্য ইউনিটের সম্পর্ক, এখতিয়ার ও জনবল পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি পরবর্তী সাংগঠনিক প্রস্তাবে স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.