দ্বৈত পেশায় যুক্ত আইনজীবীদের সনদ বাতিল চেয়ে বার কাউন্সিলে আইনি নোটিশ
ব্যবসা-চাকরি ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে জড়িত আইনজীবীদের প্র্যাক্টিসিং লাইসেন্স তথা সনদ বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও আইন মন্ত্রণালয়কে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে গত ১২ আগস্ট ২০২৬ (বুধবার) ডাকযোগে (রেজিস্টার্ড এ/ডি) এই নোটিশ প্রেরণ করেন。
কারা বিবাদী?
নোটিশে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিব, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান, অভিযোগ ও মনিটরিং (ভিজিল্যান্স) কমিটির চেয়ারম্যান এবং রোল ও প্রকাশনা কমিটির চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।
নোটিশে কী বলা হয়েছে?
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ওকালতি একটি মহান, স্বাধীন ও সম্মানজনক পেশা। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বার কাউন্সিল থেকে সনদ গ্রহণের পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি আদালতের পরিবেশে আইনচর্চায় সম্পৃক্ত না থেকে শুধু ‘অ্যাডভোকেট’ পরিচয়টিকে সামাজিক প্রভাব বিস্তার বা ব্যবসায়িক সুবিধার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।
নোটিশদাতার দাবি অনুযায়ী, এসব সনদধারী আইনজীবী বাস্তবে কার শোরুম, ইট-বালি-সিমেন্ট সরবরাহ, ম্যানপাওয়ার বা দালালি ব্যবসা, ঠিকাদারি, পরিবহন ব্যবসাসহ মোবাইল ফ্লেক্সিলোড ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (বিকাশ-নগদ) দোকান পরিচালনায় জড়িত। এছাড়া অনেকে সনদ সমর্পণ না করেই বিদেশে অবস্থান করছেন বা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা ও কর্পোরেট সংস্থায় পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন চাকরি করছেন।
আইনি ভিত্তি
নোটিশে বলা হয়েছে, দ্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২-এর ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন তালিকাভুক্ত আইনজীবী সক্রিয় সনদ রেখে ব্যবসা বা অন্য কোনো লাভজনক কর্মসংস্থানে যুক্ত থাকতে পারেন না। সনদ সক্রিয় রেখে অন্য পেশায় যুক্ত থাকা পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে গণ্য।
একইভাবে, Canons of Professional Conduct and Etiquette, ১৯৬৯-এর অধ্যায়-৪, রুল ৮ অনুযায়ী, “An Advocate should not as a general rule carry on any other profession or business, or be an active partner in or a salaried official or servant in connection with any such profession or business.” অর্থাৎ একজন আইনজীবীর সাধারণ নিয়ম হিসেবে অন্য কোনো পেশা বা ব্যবসা চালানো উচিত নয়।
সংবিধানের ২০(১), ৩১ ও ৪০ অনুচ্ছেদের সঙ্গেও এ ধরনের দ্বৈত পেশা সাংঘর্ষিক বলে নোটিশে দাবি করা হয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ড. হানিরাজ এল. চুলানি বনাম বার কাউন্সিল অব মহারাষ্ট্র অ্যান্ড গোয়া মামলায় (১৯৯৬) এবং যুক্তরাজ্যের বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড ও আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের নীতিমালায় স্পষ্টভাবে ওকালতিকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
নোটিশদাতার তিনটি দাবি
নোটিশদাতা জানান, ২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর এবং ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি বার কাউন্সিলে এ বিষয়ে লিখিত আবেদন করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমানে এ নোটিশের মাধ্যমে তিনি তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছেন:
প্রথমত, সক্রিয় আইনচর্চার পরিবর্তে ব্যবসা বা চাকরিতে নিযুক্ত আইনজীবীদের চিহ্নিত করতে উচ্চস্তরের তদন্ত কমিটি গঠন।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নন-প্র্যাক্টিসিং আইনজীবীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সনদ সমর্পণের নির্দেশ দেওয়া।
তৃতীয়ত, নির্ধারিত সময়ে সনদ সমর্পণ না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রক্রিয়া শুরু করে লাইসেন্স বাতিল করা।
নোটিশে সাফ জানানো হয়, নির্ধারিত ৫ কর্মদিবসের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।
আইনি প্রেক্ষাপট
বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৩২-৩৮ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলা কমিটি পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। কোনো অ্যাডভোকেট পেশাগত অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে প্র্যাকটিস থেকে স্থগিত বা অপসারণ করা যেতে পারে।
১৯৭২ সালের বিধিমালার রুল ৭০ অনুযায়ী, কোনো অ্যাডভোকেট যদি ব্যবসা বা অন্য পেশায় যোগদানের উদ্দেশ্যে প্র্যাকটিস বন্ধ রাখতে চান, তাহলে তাকে সনদ স্থগিত করার আবেদন করতে হবে। কিন্তু অনেক আইনজীবী সনদ সক্রিয় রেখে অন্য পেশায় যুক্ত আছেন, যা পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থী।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের এপ্রিলে বার কাউন্সিল আইনজীবী মাসদার হোসেনের প্র্যাকটিসিং লাইসেন্স স্থগিত করে এবং ১৫ দিনের মধ্যে জবাব দিতে শোকজ নোটিশ জারি করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
আইনি নোটিশ কী? আইনি নোটিশ হলো একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি, যা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে আইনি দাবি উত্থাপন করে। এটি মামলার পূর্ববর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নোটিশে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে আদালতে মামলা করা যায়।
দ্বৈত পেশা মানে কী? একজন আইনজীবী যদি সক্রিয় সনদ রেখে একই সঙ্গে ব্যবসা, চাকরি বা অন্য পেশায় যুক্ত থাকেন, তাহলে তাকে দ্বৈত পেশা বলা হয়। ১৯৭২ সালের বিধিমালা ও ১৯৬৯ সালের আচরণবিধি অনুযায়ী, সক্রিয় আইনজীবীর জন্য এটি নিষিদ্ধ।
বার কাউন্সিল কীভাবে ব্যবস্থা নেবে? বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলা কমিটি অভিযোগ পেলে তদন্ত করে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনজীবীর সনদ স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে। বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অভিযোগ অবহিত করার তারিখ থেকে ৬ মাসের মধ্যে কাউন্সিলকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পরবর্তী কী হবে? নোটিশে ৫ কর্মদিবসের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বার কাউন্সিল ব্যবস্থা না নিলে নোটিশদাতা হাইকোর্টে রিট দায়ের করবেন।
সংক্ষেপে
- ১২ আগস্ট ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া আইনি নোটিশ প্রেরণ করেন।
- দাবি: দ্বৈত পেশায় যুক্ত আইনজীবীদের চিহ্নিত করে সনদ বাতিল।
- আইনি ভিত্তি: বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২-এর ৭০ অনুচ্ছেদ; Canons of Professional Conduct, ১৯৬৯-এর অধ্যায় ৪, রুল ৮।
- ৫ কর্মদিবসের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে হাইকোর্টে রিট দায়েরের ঘোষণা।
- বার কাউন্সিলের শৃঙ্খলা কমিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
তথ্যসূত্র
মাধ্যম সূত্র:
- আইনজীবী ক্লাব বাংলাদেশ — ১২ আগস্ট ২০২৬
- আদালত বার্তা — ১২ আগস্ট ২০২৬
- দেশকাল নিউজ — ১২ আগস্ট ২০২৬
- এনটিভি — ৪ মে ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- দ্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল রুলস, ১৯৭২ — ৭০ অনুচ্ছেদ
- Canons of Professional Conduct and Etiquette, ১৯৬৯ — অধ্যায় ৪, রুল ৮
- বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ — অনুচ্ছেদ ৩২-৩৮
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ২০(১), ৩১, ৪০, ১০২
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
