পুরুষ নির্যাতন দমন আইন চেয়ে রিট খারিজ করলেন হাইকোর্ট

হাইকোর্ট

‘পুরুষ নির্যাতন দমন ও প্রতিরোধ আইন’ নামে নতুন একটি আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৬ আগস্ট ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) প্রাথমিক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন。

কে রিট দায়ের করেছিলেন?

বাটারফ্লাই হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী ইলিয়াসুর রহমান এবং সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মো. খলিলুর রহমান গত ১৮ মে ২০২৬-এ জনস্বার্থে এই রিটটি দায়ের করেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী কাজী ইলিয়াসুর রহমান নিজেই।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. জসিদুল ইসলাম জনি। মামলায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব এবং আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছিল।

রিটের দাবি

রিট আবেদনে বলা হয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও যৌতুক আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে পুরুষদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানি থেকে রক্ষা করতে ‘পুরুষ নির্যাতন দমন ও প্রতিরোধ আইন’ নামে একটি নতুন আইন প্রয়োজন। রিটকারীদের দাবি ছিল, সংবিধান পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করে, কিন্তু বিদ্যমান আইনে পুরুষদের জন্য কোনো সুরক্ষা নেই।

রিটে দুটি রুল চাওয়া হয়েছিল — (১) নতুন আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, এবং (২) পুরুষদের হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতে নতুন আইন প্রণয়নের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না। এছাড়া রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনারও আবেদন করা হয়েছিল।

আদালত কেন খারিজ করলেন?

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতকে বলেন, সরকারকে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত। তিনি আদালতকে জানান, আইন প্রণয়নের একমাত্র ক্ষমতা সংসদের রয়েছে।

শুনানি শেষে হাইকোর্ট রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন। মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আদালত কোনো নির্দেশনা দেননি এবং বিদ্যমান আইন সম্পর্কেও কোনো পর্যবেক্ষণ এই আদেশে উল্লেখ করা হয়নি।”

রিটকারী আইনজীবী কাজী ইলিয়াসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “শুনানি শেষে আদালত রিটটি খারিজ করে দিয়েছেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে।”

আইনি প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতা বিভাজন রয়েছে — আইন বিভাগ (সংসদ), নির্বাহী বিভাগ (সরকার) এবং বিচার বিভাগ (আদালত)। সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে। অর্থাৎ, নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের একচেটিয়া অধিকার।

সংবিধানের ১০২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত মামলায় নির্দেশনা দিতে পারেন। তবে ১০২(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট বিভাগের এই ক্ষমতা “আইনগত কর্তৃত্বের বাইরে” থাকা কোনো বিষয়ে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, আদালত সংসদকে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিতে পারেন না, কারণ এটি ক্ষমতা বিভাজনের নীতির পরিপন্থী।

তবে আদালত বিদ্যমান আইনের সাংবিধানিকতা পর্যালোচনা করতে পারেন অথবা আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারেন। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

রিট কী? রিট হলো হাইকোর্ট বিভাগে দায়ের করা একটি আবেদন, যেখানে কোনো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হয়। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে এই ক্ষমতার বিধান রয়েছে।

ক্ষমতা বিভাজন কী? রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়াকে ক্ষমতা বিভাজন বলা হয়। আইন বিভাগ আইন প্রণয়ন করে, নির্বাহী বিভাগ তা বাস্তবায়ন করে এবং বিচার বিভাগ আইন ব্যাখ্যা করে। এই ব্যবস্থায় কোনো অঙ্গ অন্য অঙ্গের ক্ষমতা দখল করতে পারে না।

আদালত কেন আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিতে পারেন না? সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। আদালত সংসদকে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিলে সেটি ক্ষমতা বিভাজনের নীতির লঙ্ঘন হবে।

পরবর্তী কী হবে? রিটকারী আপিল বিভাগে আবেদন করার ঘোষণা দিয়েছেন। আপিল বিভাগ এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।

সংক্ষেপে

  • ৬ আগস্ট ২০২৬-এ হাইকোর্ট রিটটি সরাসরি খারিজ করেন।
  • বেঞ্চ: বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী।
  • রিটকারী: বাটারফ্লাই হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের কাজী ইলিয়াসুর রহমান ও মো. খলিলুর রহমান।
  • রিটের দাবি: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও যৌতুক আইনের অপব্যবহার থেকে পুরুষদের সুরক্ষায় নতুন আইন।
  • অ্যাটর্নি জেনারেলের যুক্তি: আইন প্রণয়ন আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত; ক্ষমতা সংসদের।
  • পরবর্তী পদক্ষেপ: রিটকারী আপিল বিভাগে আবেদন করবেন।

তথ্যসূত্র

মাধ্যম সূত্র:

  • যুগান্তর — ৬ আগস্ট ২০২৬
  • কালবেলা — ৬ আগস্ট ২০২৬
  • প্রথম আলো — ৬ আগস্ট ২০২৬
  • কালের কণ্ঠ — ৬ আগস্ট ২০২৬
  • দ্য ডেইলি স্টার — ৬ আগস্ট ২০২৬
  • ইত্তেফাক — ৬ আগস্ট ২০২৬
  • বাংলা ট্রিবিউন — ৬ আগস্ট ২০২৬
  • লইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — ৬ আগস্ট ২০২৬

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৬৫(১), ১০২(১), ১০২(২)
  • হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — রিট মামলার আদেশ

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.