বিচার বিভাগের গুণমানই দেশের প্রধান অর্থনৈতিক সূচক: ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ
সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, একটি দেশের বিচার বিভাগের গুণমানই তার প্রধান অর্থনৈতিক সূচক। “দ্রুত, কার্যকর এবং স্বচ্ছ বিচারব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে আমরা বাণিজ্যিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো নির্মাণ করছি,” বলেন তিনি। গত ১ আগস্ট ২০২৬ (শনিবার) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ক্রিস্টাল বলরুমে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিয়াক) প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রথম বাংলাদেশ এডিআর সামিট অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন。
সামিটটি আয়োজন করে বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিয়াক), যা বাংলাদেশের একমাত্র নিবন্ধিত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রতিষ্ঠান। বিয়াকের ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই সামিটের মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যস্থতা আইন (Mediation Act) প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আরবিট্রেশন অ্যাক্ট, ২০০১-এ প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করা।
সামিটের প্রেক্ষাপট
দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন। সরকারের অঙ্গীকার হলো এডিআর-এর কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে মামলার জট কমানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সরকারের উদ্যোগ ও এডিআর-এর কার্যকর ব্যবহারের ফলে ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে নির্দিষ্ট কিছু আইনে মামলা দায়ের ৬২ শতাংশেরও বেশি কমেছে।
বিয়াক সিনিয়র কাউন্সেল মোহাম্মদ আনিসুল হক ইমরান বলেন, “দেশে এ ধরনের সামিট এই প্রথম। আমরা মধ্যস্থতা আইন প্রণয়ন এবং আরবিট্রেশন অ্যাক্ট, ২০০১-এ প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপনের আশা করছি।” তিনি বলেন, “আমাদের আরবিট্রেশন অ্যাক্ট, ২০০১ রয়েছে, কিন্তু এতে সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। সিঙ্গাপুর কনভেনশন অন মেডিয়েশন বাস্তবায়নের পর বিভিন্ন দেশ মধ্যস্থতা আইন প্রণয়ন করেছে, কিন্তু আমাদের নেই।”
সাবেক প্রধান বিচারপতির বক্তব্য
ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, “একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে, দেশি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীই কোনো দেশকে শুধুমাত্র কর ছাড় বা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করেন না। তাঁরা নিশ্চয়তা খোঁজেন। তাঁরা এই আশ্বাস চান যে চুক্তিগুলো সম্মানিত হবে, অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং বিরোধগুলো কয়েক দশকে নয়, বরং কয়েক মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক দিন ধরে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চুক্তি প্রয়োগ করা বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি বাধা এবং দেশীয় উদ্যোক্তার জন্য একটি ব্রেক হিসেবে কাজ করেছে। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে আমরা যে বিচারিক কাঠামো নির্মাণ করছি তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি জীবনরেখা।”
কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, আইনসভাকে সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন করতে হবে, নির্বাহী বিভাগকে প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে এবং আইনজীবীদের সংগঠন বা বারকে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি উন্নয়ন সহযোগীদের কারিগরি দক্ষতা ও যেখানে সম্ভব আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে বিচারব্যবস্থার সংস্কারে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “ন্যায়বিচার কোনো গন্তব্য নয়; এটি একটি ধারাবাহিক চর্চা ও জীবনবোধ।” তিনি “সময়কে ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান” হিসেবে বিবেচনা করার এবং “পদ্ধতিগত শৃঙ্খলাকে সাংবিধানিক দায়িত্ব” হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান।
সাবেক প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে প্রস্তাবিত কমার্শিয়াল কোর্ট অ্যাক্ট, ২০২৬-এর কথা উল্লেখ করেন, যা বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত, প্রযুক্তিনির্ভর মামলা ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক পদ্ধতি চালুর লক্ষ্যে প্রণীত। এই আইনটি ৯০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ করে এবং সর্বোচ্চ তিনবারের বেশি মুলতবি না করার বিধান রাখে।
মূল প্রবন্ধ ও আলোচনা
সামিটে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার। “Advancing Justice and Business Confidence through ADR” শিরোনামে তার উপস্থাপনায় বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর কাঠামো এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার (এডিআর) গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার বলেন, “প্রশ্নটি এখন আর নেই যে আমরা কিছু তৈরি করেছি কিনা। আমরা তৈরি করেছি। প্রশ্ন হলো, আমরা কি যথেষ্ট করেছি?” তিনি বাণিজ্যিক জীবনে অনিশ্চয়তাকে “একটি অদৃশ্য অর্থনৈতিক বোঝা” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “বাণিজ্যিক জীবনে অনিশ্চয়তা নিজেই একটি কর… যা কোনো অর্থ মন্ত্রণালয় কখনো আদায় করে না, কিন্তু প্রতিটি ব্যবসা চুপচাপ পরিশোধ করে।”
সামিটে “Advancing Justice and Business Confidence through ADR” শিরোনামে একটি প্যানেল আলোচনাও অনুষ্ঠিত হয়। ব্যারিস্টার সামির সাত্তারের সঞ্চালনায় এই আলোচনায় ব্যারিস্টার তানিম হুসেন শাওন, ড. মেলিটা মেহজাবীন, মোহাম্মদ ফররুখ রহমান, মোহাম্মদ মাহমুদুর রশিদ এবং ব্যারিস্টার মাগরুব কবির বক্তব্য রাখেন।
বিয়াক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান স্বাগত বক্তব্যে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিয়াকের পথচলা, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সালিশ ও মধ্যস্থতা ব্যবস্থার বিকাশে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমাজ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও অন্যান্য অংশীজনের ধারাবাহিক সহযোগিতার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “ন্যায়বিচার কেবল একটি আইনি নীতি নয়। এটি একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা।”
এর আগে “বিয়াক নিয়ে প্রতিফলন: ২০১১-২০২৬” শীর্ষক একটি বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বিয়াক ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে বক্তব্য দেন সাবেক বিচারপতি মো. আওলাদ আলী, আফতাব উল ইসলাম, ড. খালেদ হামিদ চৌধুরী এবং রিজওয়ান-উর-রহমান।
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে আরবিট্রেশন পরিচালিত হয় আরবিট্রেশন অ্যাক্ট, ২০০১-এর অধীনে। তবে এই আইনে সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সিভিল কার্যবিধির ৮৯এ ধারায় লিখিত বক্তব্য দাখিলের পর আদালতকে মধ্যস্থতার জন্য প্রেরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই মধ্যস্থতা রেফারেলের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে, যা আরও ৩০ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
মধ্যস্থতা আইন প্রণয়নের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিঙ্গাপুর কনভেনশন অন মেডিয়েশন বাস্তবায়নের পর ভারতসহ বিভিন্ন দেশ মধ্যস্থতা আইন প্রণয়ন করেছে। ভারত ২০২৩ সালে মধ্যস্থতা আইন প্রণয়ন করেছে, যা মধ্যস্থতাকে মূলধারায় আনতে এবং মধ্যস্থতাকারীদের নিবন্ধনের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেছে। বাংলাদেশে এখনো এই আইন নেই, যা মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বাধা সৃষ্টি করছে।
আন্তর্জাতিকভাবে বিয়াক আন্তর্জাতিক আরবিট্রেশন প্রতিষ্ঠান ICC, SIAC, LCIA-এর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে এবং APRAG-এর সদস্য।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
এডিআর কী? বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (Alternative Dispute Resolution) হলো আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি পদ্ধতি। এর মধ্যে রয়েছে আরবিট্রেশন (সালিশ), মধ্যস্থতা, সমঝোতা এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন।
আরবিট্রেশন ও মধ্যস্থতার পার্থক্য কী? আরবিট্রেশনে একজন নিরপেক্ষ সালিশকারী (আরবিট্রেটর) বিরোধের সিদ্ধান্ত দেন, যা পক্ষগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক। মধ্যস্থতায় একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে সহায়তা করেন, তবে সিদ্ধান্ত দেন না।
মধ্যস্থতা আইন কেন প্রয়োজন? মধ্যস্থতা আইন মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে, মধ্যস্থতাকারীদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করবে, মধ্যস্থতার মাধ্যমে হওয়া সমঝোতা চুক্তি প্রয়োগযোগ্য করবে এবং অনলাইন মধ্যস্থতাকে সহজলভ্য করবে।
পরবর্তী কী হবে? সামিট থেকে প্রাপ্ত সুপারিশ নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করা হবে। মধ্যস্থতা আইন প্রণয়ন এবং আরবিট্রেশন অ্যাক্ট সংশোধনের বিষয়ে সংসদে উত্থাপনের সুপারিশ করা হবে।
সংক্ষেপে
- ১ আগস্ট ২০২৬-এ বিয়াকের ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রথম বাংলাদেশ এডিআর সামিট অনুষ্ঠিত হয়।
- সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, বিচার বিভাগের গুণমানই প্রধান অর্থনৈতিক সূচক।
- সামিটের মূল লক্ষ্য: মধ্যস্থতা আইন প্রণয়ন এবং আরবিট্রেশন অ্যাক্ট, ২০০১ সংশোধনের সুপারিশ।
- মূল প্রবন্ধ: বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার, “Advancing Justice and Business Confidence through ADR”।
- সিভিল কার্যবিধির ৮৯এ ধারায় মধ্যস্থতা রেফারেলের বিধান রয়েছে; মধ্যস্থতা ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে।
- কমার্শিয়াল কোর্ট অ্যাক্ট, ২০২৬ ৯০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ করে।
- বিয়াক বাংলাদেশের একমাত্র নিবন্ধিত এডিআর প্রতিষ্ঠান; ICC, SIAC, LCIA-এর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে।
তথ্যসূত্র
মাধ্যম সূত্র:
- বাসস (BSS) — ৩০ জুলাই ২০২৬
- বাসস (BSS) — ১ আগস্ট ২০২৬
- বিয়াক অফিসিয়াল ওয়েবসাইট — ২ আগস্ট ২০২৬
- দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস — ২ আগস্ট ২০২৬
- সমকাল — ৩ আগস্ট ২০২৬
- চ্যানেল ২৪ — ১ আগস্ট ২০২৬
- দৈনিক নয়া দিগন্ত — ১ আগস্ট ২০২৬
- দৈনিক ইনকিলাব — ২ আগস্ট ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- আরবিট্রেশন অ্যাক্ট, ২০০১
- কমার্শিয়াল কোর্ট অ্যাক্ট, ২০২৬
- সিভিল কার্যবিধি — ধারা ৮৯এ
- মধ্যস্থতা আইন, ২০১০ (প্রস্তাবিত)
- সিঙ্গাপুর কনভেনশন অন মেডিয়েশন
- বিয়াক — ১ম বাংলাদেশ এডিআর সামিটের সুপারিশ
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
