একতরফা ডিক্রি বাতিল: ৩০ দিন ও ১০% জমা বাধ্যতামূলক

Author
পেশা: আইন পেশাজীবী
দক্ষতা: বাংলাদেশ আইন ও আইনি গবেষণা

ধরুন, আপনার নামে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলছে, অথচ আপনি তা জানেন না। পরে খবর এল, একতরফা ডিক্রি হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় অনেকেই ভাবেন, আগে আবেদনটা করে রাখি, টাকার হিসাব পরে দেখা যাবে। হাইকোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায় এই ভাবনার ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে। একতরফা ডিক্রি বাতিল করতে হলে দুটি সময়সীমা একসঙ্গে মানতে হয়। একটিতেও গড়িমসি হলে পরে সময় বাড়ানোর আবেদন কাজে আসবে, এমন ভরসা রাখা ঠিক নয়। আইনে সেই সুযোগ রাখা হয়নি।

মামলার পটভূমি

২০১৫ সালে উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড ঢাকার চতুর্থ অর্থঋণ আদালতে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ১৯ পয়সা আদায়ের মামলা করে। ব্যাংকের অভিযোগ, মো. মনির চৌধুরী একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হিসেবে জমি বন্ধক রেখে ১২ লাখ টাকা ঋণ নেন। ঋণ ফেরত না আসায় ব্যাংক বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করে, কিন্তু তাতে সফল হয়নি।

মনির চৌধুরী লিখিত জবাবে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, ১২ লাখ টাকার পুরোটা তিনি পাননি। ঘুষ দেওয়ার কারণে ছয় ভাগের চার ভাগ সমপরিমাণ অর্থ পেয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, প্রাপ্ত ঋণের অর্ধেক ইতিমধ্যে শোধ করেছেন। এগুলো তাঁর বক্তব্য, আদালতের প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়।

২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থঋণ আদালত একতরফা ডিক্রি দেন, আর ২৮ ফেব্রুয়ারি ডিক্রির কপি প্রস্তুত হয়। এরপর ৩০ মে মনির চৌধুরী অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(২) ধারায় ডিক্রি বাতিলের দরখাস্ত করেন। কিন্তু দরখাস্ত দাখিলের পরের ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দেননি। ফলে অর্থঋণ আদালত আবেদনটি গ্রহণ করেননি। তিনি জেলা জজ আদালতে আপিল করেন, সেখানেও আবেদন টেকেনি। শেষে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন মামলা নং ৪১৬১/২০১৬ দায়ের করেন।

২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ও বিচারপতি উর্মী রহমানের দ্বৈত বেঞ্চ রায় দেন। আদালত রুল খারিজ করেন এবং আগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন।

আইন কী বলছে

অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯ ধারায় একতরফা ডিক্রি ও তা বাতিলের নিয়ম বলা আছে। ১৯(২) উপধারা অনুযায়ী, বিবাদী ডিক্রির তারিখ বা ডিক্রির খবর জানার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বাতিলের দরখাস্ত করতে পারবেন।

১৯(৩) উপধারা বলছে, দরখাস্ত দাখিলের পরের ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ আদালতে জমা দিতে হবে। টাকা নগদে দেওয়া যায়, কিংবা ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার বা অন্য কোনো নগদায়নযোগ্য দলিল দিয়েও দেওয়া যায়।

১৯(৪) উপধারায় আছে, ১০ শতাংশ জমা হলে দরখাস্ত মঞ্জুর হবে, একতরফা ডিক্রি রদ হবে এবং মূল মামলা আগের নম্বর ও নথিতে ফিরে যাবে। অন্যদিকে ১৯(৫) উপধারা স্পষ্ট বলছে, ১০ শতাংশ জমা দিতে ব্যর্থ হলে দরখাস্ত সরাসরি খারিজ হবে।

দুটি উপধারা একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, আইন সময়সীমা ও অর্থ জমাকে একটি প্যাকেজের দুটি অংশ হিসেবে দেখেছে। একটি বাদ দিলে অন্যটির কার্যকারিতা থাকে না।

হাইকোর্ট কী বলেছেন

হাইকোর্টের মতে, অর্থঋণ আদালত আইন একটি বিশেষ আইন। এতে একতরফা ডিক্রি বাতিলের শর্ত ও পদ্ধতি আলাদাভাবে বলা আছে। তাই ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারার সময়সীমা পেরিয়ে গেলে আদালত পরে ১০ শতাংশ জমার নির্দেশ দিতে পারেন না, কারণ আইনে সেই ক্ষমতা নেই।

রায়ে Pubali Bank Ltd বনাম Bangladesh and others মামলার উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারা একে অপরের পরিপূরক, তাই দুটোকে একসঙ্গে পড়তে হবে। কোনো একটি শর্ত না মানলে আদালত আবেদনটি বিবেচনায় নিতে পারেন না।

Osman Gazi Chowdhury বনাম Artha Rin Adalat মামলার একটি পর্যবেক্ষণও রায়ে এসেছে। সেখানে ১০ শতাংশের পরিমাণ, আবেদনের সময়সীমা এবং নগদ, ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারে টাকা জমার সুযোগ, এই শর্তগুলোকে আবেদনকারীর জন্য পালনযোগ্য বলা হয়েছিল।

Prime Global Limited and others বনাম Sonali Bank Limited and others মামলায় আপিল বিভাগের বক্তব্যও হাইকোর্ট তুলে ধরেছেন। সেখানে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন এবং পরের ১৫ দিনের মধ্যে ১০ শতাংশ জমা, দুটোই মানতে হবে।

আবেদনকারীপক্ষ Begum Sultana Mazid, Afsaruddin Ahmed ও Fazlul Huq মামলার নজির দেখিয়েছিল। হাইকোর্ট সেগুলো এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মানেননি, কারণ ওই সিদ্ধান্তগুলো দেওয়ানি কার্যবিধির অধীনে হয়েছিল, অর্থঋণ আদালত আইনের অধীনে নয়। তাই পরিস্থিতি আলাদা।

আদালত আরও বলেন, অর্থঋণ আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রি ছাড়া অন্য আদেশের বিরুদ্ধে এই আইনের ২০ ধারায় আপিল করা যায় না। তাই মনির চৌধুরীর জেলা জজ আদালতে করা আপিল আইনগত ভুল ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।

বাস্তবে এর মানে কী

রায়ের বার্তা স্পষ্ট। একতরফা ডিক্রি বাতিল চাইলে সময়ের হিসাব কড়াভাবে কষতে হবে। ডিক্রির খবর পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করুন, এবং আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে ১০ শতাংশ জমা দিন। ১৫ দিন পার হয়ে গেলে পরে শুনানি করে সময় পাওয়া যাবে, এমন আশা করা উচিত নয়।

অনেকেই ভাবেন, “আবেদন তো করেই দিলাম, টাকাটা পরে দিলেই চলবে।” আইন এই ভাবনাকে সমর্থন করে না। ১৯(৫) উপধারায় লেখা আছে, ১০ শতাংশ জমা না হলে দরখাস্ত সরাসরি খারিজ হবে। হাইকোর্ট এই বিধানটিকেই আরও স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছেন।

মনে রাখতে হবে, ১০ শতাংশ জমা দিলেই ঋণ মিটে যায় না। এটি শুধু আবেদনটি টিকিয়ে রাখার শর্ত। জমার পর মূল মামলা আগের জায়গা থেকে চলবে, আর তখন ঋণের পরিমাণ, সুদ ও জামানত, সবই নতুন করে বিচার হবে।

সাধারণ মানুষের জন্য করণীয়

ধরুন, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আপনার নামে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে, আর আপনি না জেনেই একতরফা ডিক্রি হয়ে গেছে। প্রথমে ডিক্রির তারিখ, এবং কবে তা জানলেন, সেটি লিখে রাখুন। এরপর ওই তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বাতিলের আবেদন করুন। আবেদনের সঙ্গে ১০ শতাংশ জমার টাকা আগে থেকে ঠিক করে রাখুন। জমার জন্য ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার বা আদালত যে দলিল গ্রহণ করবে, তা ব্যবহার করুন।

আবেদনের সঙ্গে ডিক্রির কপি, ডিক্রি সম্পর্কে জানার প্রমাণ (থাকলে) এবং ১০ শতাংশ জমার রসিদ জুড়ে দিন। সময় গোনার ব্যাপারে বাড়তি সতর্ক থাকুন, কারণ আইনে ছাড় পাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত।

কোথায় সীমা আছে

এই রায়ের মানে এই নয় যে একতরফা ডিক্রি কখনো বাতিল করা যায় না। সময়মতো আবেদন করে ১০ শতাংশ জমা দিলে ১৯(৪) উপধারা অনুযায়ী ডিক্রি বাতিল হবে এবং মামলা আবার চলবে। রায়টি শুধু দেখিয়েছে, সময়সীমা ও জমার শর্ত, দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই মামলায় প্রযোজ্য ছিল অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩। এর কিছু বিধান পরে সংশোধিত হতে পারে। কোনো বাস্তব ঘটনায় এগোনোর আগে আইনের সর্বশেষ সংস্করণ দেখে নেওয়া ভালো, এবং প্রয়োজন হলে একজন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখার আইনি তথ্য ও আদালতের রায় শুধু সাধারণ জ্ঞান ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। এটি পেশাদার আইনি পরামর্শ নয়।

প্রায়ই জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন

প্রশ্ন: ১০ শতাংশ জমা না দিলে কী হয়?
উত্তর: ২০০৩ সালের অর্থঋণ আদালত আইনের ১৯(৫) উপধারা অনুযায়ী দরখাস্ত সরাসরি খারিজ হয়ে যায়। পরে সময় বাড়িয়ে টাকা জমার সুযোগ আদালত সাধারণত দেন না।

প্রশ্ন: ৩০ দিনের সময়সীমা কোন তারিখ থেকে গোনা হবে?
উত্তর: আইনে ডিক্রির তারিখ এবং ডিক্রি সম্পর্কে জানার তারিখ, দুটিরই উল্লেখ আছে। কোনটি প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট মামলার ঘটনার ওপর। তাই দ্রুত আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

প্রশ্ন: ১০ শতাংশ কি শুধু নগদে দিতে হয়?
উত্তর: না। ১৯(৩) উপধারা অনুযায়ী নগদের পাশাপাশি ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার বা অন্য নগদায়নযোগ্য দলিল (Negotiable Instrument) দিয়েও জমা দেওয়া যায়।

প্রশ্ন: ১০ শতাংশ জমা দিলে কি মামলা মিটে যায়?
উত্তর: না। এতে শুধু একতরফা ডিক্রি বাতিল হয়। মূল মামলা আগের পর্যায় থেকে চলবে, আর ঋণের পরিমাণ, সুদ ও অন্য দাবি নতুন করে বিচার হবে।

প্রশ্ন: অর্থঋণ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিল করা যায়?
উত্তর: চূড়ান্ত ডিক্রি ছাড়া অন্য আদেশের বিরুদ্ধে এই আইনের ২০ ধারায় আপিলের সুযোগ নেই। তাই আবেদন খারিজ হলে সরাসরি আপিলের আগে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই ভালো।


আরো পড়ুন — সর্বশেষ আপডেট