জেলা আইনজীবী সমিতিতে অভিন্ন প্রবেশ ফি নির্ধারণে হাইকোর্টের রুল
দেশের জেলা আইনজীবী সমিতিগুলোতে নতুন সদস্যদের জন্য প্রবেশ ফি একটি যুক্তিসঙ্গত ও অভিন্ন হারে নির্ধারণের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৩ আগস্ট ২০২৬ (সোমবার) এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন。
আদালত আইন সচিব, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিব, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। রিট আবেদনের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী শিবলী নোমানী।
কে রিট দায়ের করেছিলেন?
কুড়িগ্রামের বাসিন্দা নবীন আইনজীবী মো. মাহফুজুর রহমান এই রিট আবেদন দায়ের করেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে অ্যাডভোকেটশিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যপদের জন্য আবেদন করলে তাকে জানানো হয়, নতুন সদস্যদের বয়স ৪০ বছরের নিচে হলে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৪০ বছরের বেশি হলে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রবেশ ফি দিতে হবে।
জেলা আইনজীবী সমিতি ১৬ এপ্রিল ২০২৬-এ একটি নোটিশ জারি করে এই ফি নির্ধারণ করে। নোটিশে আরও বলা হয়, অন্য চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ বা আর্থিক সুবিধা নিয়ে সদস্য হতে ইচ্ছুক ব্যক্তির জন্য ৪ লাখ টাকা এবং সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। নোটিশটি জারি করেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সরদার তাজুল ইসলাম।
রিটের দাবি
আবেদনে এসব ফি নির্ধারণকে বৈষম্যমূলক দাবি করে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়। একই সঙ্গে দেশের সব জেলা আইনজীবী সমিতিতে নতুন সদস্যদের জন্য একটি অভিন্ন ও যৌক্তিক প্রবেশ ফি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়।
রিট আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য হতে প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা এবং ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য হতে প্রায় ২৯ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। অথচ দেশের বিভিন্ন জেলা আইনজীবী সমিতিতে এর কয়েকগুণ বেশি প্রবেশ ফি আদায় করা হচ্ছে। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতিতে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
নবীন আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
সদ্য বার কাউন্সিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আইনজীবীরা কুড়িগ্রামের এই ফি নির্ধারণকে নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, দেশের অন্য কোনো জেলা আইনজীবী সমিতিতে এত উচ্চ অঙ্কের ভর্তি ফি নেই। তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনে সদস্যপদ গ্রহণের ফি সর্বোচ্চ মাত্র সাড়ে ২৯ হাজার টাকা। ফলে কুড়িগ্রামের নির্ধারিত ফি বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নতুনদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
নবাগত আইনজীবীদের অভিযোগ, এই ফি একধরনের স্বেচ্ছাচারিতা এবং পেশায় প্রবেশের পথে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ধার-দেনা কিংবা সম্পত্তি বন্ধক রেখে অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্সও কুড়িগ্রাম বারের এই উচ্চ ফি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর অধীনে বার কাউন্সিল আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করে। অর্ডারের ২২ অনুচ্ছেদে বার কাউন্সিলের ফি নির্ধারণের ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। তবে জেলা আইনজীবী সমিতিগুলোর সদস্যপদ ফি নির্ধারণে বর্তমানে কোনো কেন্দ্রীয় নীতিমালা নেই। সমিতিগুলো তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই ফি নির্ধারণ করে।
আন্তর্জাতিকভাবে ভারত, পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশে বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ ফি সাধারণত কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত হয় অথবা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো জেলা আইনজীবী সমিতিগুলোর ফি নির্ধারণের বিষয়টি বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় এলো।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
রুল কী? হাইকোর্ট যখন কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চান, তখন তাকে রুল বলা হয়। এটি চূড়ান্ত রায় নয়। কর্তৃপক্ষ জবাব দিলে আদালত শুনানি করে সিদ্ধান্ত নেন।
প্রবেশ ফি মানে কী? কোনো পেশাদার সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণের জন্য যে ফি দিতে হয়, তাকে প্রবেশ ফি বা ভর্তি ফি বলা হয়। জেলা আইনজীবী সমিতিতে নতুন সদস্যদের ক্ষেত্রে এই ফি প্রযোজ্য।
বার কাউন্সিলের ভূমিকা কী? বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী শীর্ষ সংস্থা। এটি আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি, শৃঙ্খলা ও পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণ করে। হাইকোর্ট রুলে বার কাউন্সিলকে অভিন্ন প্রবেশ ফি নির্ধারণের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছেন।
পরবর্তী কী হবে? বিবাদীদের দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে হবে। জবাব পাওয়ার পর আদালত শুনানি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।
সংক্ষেপে
- ৩ আগস্ট ২০২৬-এ হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
- বেঞ্চ: বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হক।
- রিটকারী: কুড়িগ্রামের নবীন আইনজীবী মো. মাহফুজুর রহমান।
- কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিতে প্রবেশ ফি ২.৫ থেকে ৫ লাখ টাকা।
- সুপ্রিম কোর্ট ও ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে ফি ২০-২৯ হাজার টাকা।
- মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।
তথ্যসূত্র
মাধ্যম সূত্র:
- বাংলা ট্রিবিউন — ৩ আগস্ট ২০২৬
- জাগোনিউজ২৪ — ৪ আগস্ট ২০২৬
- আগামীর সময় — ৩ আগস্ট ২০২৬
- ঢাকা মেইল — ৩ আগস্ট ২০২৬
- লইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — ১৮ এপ্রিল ২০২৬
- সমকাল — ১৯ এপ্রিল ২০২৬
- সময়ের আলো — ১৯ এপ্রিল ২০২৬
- আদালত বার্তা — ২৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ — অনুচ্ছেদ ২২
- হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — রুলের আদেশ
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
