মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ২৪ একর বেদখল জমি উদ্ধারে হাইকোর্টের নির্দেশ
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বেদখল হওয়া ২৪ একর জমি উদ্ধার করে ৩০ দিনের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে একটি কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৩ আগস্ট ২০২৬ (সোমবার) জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারির পাশাপাশি এ নির্দেশ দেন। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. শফিকুল ইসলাম মিজান।
কে রিট দায়ের করেছে?
জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেছে ‘পপারস লিগ্যাল এইড ফাউন্ডেশন’। রিটকারী পক্ষের আইনজীবী মো. শফিকুল ইসলাম মিজান জানান, ৩ এপ্রিল ২০২৬-এ দৈনিক ইত্তেফাকে ‘হাসপাতালের ৩০ একর জমিই হাতছাড়া!’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফাউন্ডেশন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়।
জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতালের নামে ৩২ একর জমি বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে তাদের দখলে রয়েছে মাত্র ৮ একর। বাকি ২৪ একর জমি অবৈধ দখলদারদের দখলে চলে গেছে। সেখানে আবাসন, আধা কাঁচা-পাকা ঘর, দোকানপাট, কাঁচাবাজার, বরফকল, রিকশা ও অটোরিকশা গ্যারেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে এবং বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
আইনজীবী শফিকুল ইসলাম আরও জানান, এরপর দখলদারদের কাছ থেকে জমি উদ্ধার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করা হয়। কিন্তু দুই মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাদের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়।
জমির বর্তমান চিত্র
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বরাদ্দকৃত ৩২ একর জমির মধ্যে ৮ একর জমিতে সাততলা হাসপাতাল ভবন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার, মসজিদ, পানির পাম্প, নিমিউ অ্যান্ড টিসি, বিএমআরসি ভবন, টেমো ওয়ার্কশপ, পরিবার পরিকল্পনা পণ্যাগার, আইপিএইচ স্কুল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টার, জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল এবং কুষ্ঠ হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টার অবস্থিত। তবে এসব সরকারি স্থাপনার অনুকূলে জমি বরাদ্দের কোনো নথিপত্র হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
অবশিষ্ট খালি জমিতে বহিরাগতরা অবৈধভাবে কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, দোকানপাট, কাঁচাবাজার, বরফকল, রিকশা ও অটোরিকশা গ্যারেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। উল্লেখ্য, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দখলে মাত্র ৮ একর জমি থাকলেও পুরো ৩২ একর জমির খাজনা বা ভূমি কর পরিশোধ করতে হচ্ছে।
আদালতের আদেশ ও রুল
হাইকোর্ট মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার করে ৩০ দিনের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে একটি প্রতিবেদনও দাখিল করতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি হাসপাতালের নামে বরাদ্দকৃত সম্পত্তি যথাযথভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছেন। চার সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
রুলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ঢাকার জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মহাপরিচালক এবং বনানী থানার ওসিসহ আট বিবাদীকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে। রিটে দাবি করা হয়েছে, সরকারি জমি বেদখল থাকায় জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা সংবিধানে নিশ্চিত এসব অধিকারের পরিপন্থী।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি রক্ষা করা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জযোগ্য। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে জনস্বার্থে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন হাইকোর্টে রিট দায়ের করতে পারেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে প্রথম আলো’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হাসপাতালের ৩০ একর জমির মধ্যে ৮৫ শতাংশ বেদখল হয়ে গেছে এবং সেখানে বস্তি গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলছে।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
জনস্বার্থ মামলা কী? জনস্বার্থ মামলা বা পিআইএল হলো এমন একটি মামলা, যা কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন জনগণের স্বার্থে দায়ের করেন। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে এই মামলার ভিত্তি রয়েছে।
রুল মানে কী? হাইকোর্ট যখন কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চান, তখন তাকে রুল বলা হয়। এটি চূড়ান্ত রায় নয়। কর্তৃপক্ষ জবাব দিলে আদালত শুনানি করে সিদ্ধান্ত নেন।
কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন কী? আদালতের নির্দেশ পালন করা হয়েছে কিনা, তা জানাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়, তাকে কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন বলা হয়।
পরবর্তী কী হবে? বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে হবে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ৩০ দিনের মধ্যে জমি উদ্ধার করে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।
সংক্ষেপে
- ৩ আগস্ট ২০২৬-এ হাইকোর্ট রুল ও নির্দেশ দেন।
- বেঞ্চ: বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হক।
- রিটকারী: পপারস লিগ্যাল এইড ফাউন্ডেশন।
- ৩২ একর বরাদ্দের মধ্যে ৮ একর হাসপাতালের দখলে, ২৪ একর বেদখল।
- ৩০ দিনের মধ্যে জমি উদ্ধার করে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ।
- আট বিবাদীকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
- মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।
তথ্যসূত্র
মাধ্যম সূত্র:
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (বাংলা) — ৩ আগস্ট ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (ইংরেজি) — ৩ আগস্ট ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ৩ আগস্ট ২০২৬
- নিউ এজ — ৩ আগস্ট ২০২৬
- বাংলা ট্রিবিউন — ৩ আগস্ট ২০২৬
- বাংলানিউজ২৪ — ৩ আগস্ট ২০২৬
- যমুনা টিভি — ৩ আগস্ট ২০২৬
- দৈনিক ইত্তেফাক — ৩ এপ্রিল ২০২৬
- প্রথম আলো — ২৭ মে ২০১৭
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ১৮, ৩১, ৩২, ১০২
- হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — রুল ও নির্দেশের আদেশ
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
