ইস্টার সানডে হামলা: সাবেক পুলিশপ্রধান ও প্রতিরক্ষা সচিবের মৃত্যুদণ্ড

২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে সংঘটিত ভয়াবহ বোমা হামলা প্রতিরোধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শ্রীলঙ্কার সাবেক পুলিশপ্রধান পুজিথ জয়সুন্দরা এবং সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব হেমাসিরি ফার্নান্দোকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। গত ৩১ জুলাই ২০২৬ (শুক্রবার) কলম্বো স্থায়ী হাইকোর্ট ট্রায়াল-অ্যাট-বারের তিন সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে তাদের ‘অপরাধমূলক অবহেলা’র দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এই রায় দেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি উভয়কে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫,০০০ রুপি জরিমানা করা হয়।

কারা দোষী সাব্যস্ত হলেন?

বিচারপতি প্রিয়ন্ত লিয়ানাগে, বিচারপতি ভিরাজ বীরাসুরিয়া এবং বিচারপতি তিলকরত্নে বন্দর সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের বেঞ্চ ২-১ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এই রায় দেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় দেন বিচারপতি লিয়ানাগে ও বন্দর। ভিন্নমত দেন বিচারপতি বীরাসুরিয়া, যিনি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে অভিযুক্তদের খালাসের রায় দেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এসআইএস) হামলার আগে আটটি গোয়েন্দা সতর্কবার্তা জারি করেছিল। ২০১৯ সালের ২০ এপ্রিল সন্ধ্যায় তৎকালীন এসআইএস পরিচালক নিলান্থ জয়বর্ধনে অভিযুক্তদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য পাঠিয়ে সতর্ক করেন যে, পরদিন ইস্টার সানডেতে কলম্বো ও এর উপশহরের ক্যাথলিক গির্জা এবং পর্যটন হোটেলগুলোতে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অভিযুক্তরা তাদের সরকারি দায়িত্বের পরিধির মধ্যে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেননি।

আদালত পুলিশ অর্ডিন্যান্সের ৫৬ ধারার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, এই ধারায় পুলিশপ্রধানের ওপর জননিরাপত্তা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পূর্ববর্তী গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া সত্ত্বেও কোনো কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলশ্রুতিতে ইস্টার সানডে হামলায় ২৬৮ জন নিহত এবং ৫৮৬ জন আহত হন।

মামলার পটভূমি

২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে প্রায় একই সময়ে শ্রীলঙ্কার তিনটি পর্যটন হোটেল এবং তিনটি গির্জায় সমন্বিত বোমা হামলা চালানো হয়। গির্জাগুলোর মধ্যে দুটি ছিল ক্যাথলিক এবং একটি প্রোটেস্ট্যান্ট। ওই হামলায় ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৪২ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন।

হামলার পর গঠিত সংসদীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে একাধিক সতর্কবার্তা পাওয়া সত্ত্বেও পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে একই অভিযোগে তিন বিচারপতির বেঞ্চ দুইজনকে খালাস দিয়েছিলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল সেই খালাসের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে ২০২৬ সালের মার্চে নতুন বিচার শুরু হয়। আগের একটি দেওয়ানি মামলায় উভয়কে ১২৫ মিলিয়ন রুপি (প্রায় ৫৩১,৮০০ ডলার) ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল।

আইনি প্রেক্ষাপট

শ্রীলঙ্কার দণ্ডবিধির অধীনে গুরুতর অবহেলার মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানো একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই মামলায় অভিযোগ আনা হয় খুন, খুনের চেষ্টা এবং অপরাধমূলক অবহেলার অভিযোগে। অপরাধমূলক অবহেলা মানে হলো, কোনো ব্যক্তির ওপর আইন বা দায়িত্ব দ্বারা অর্পিত কর্তব্য পালনে গুরুতর অবহেলা প্রদর্শন করা, যার ফলে অন্যের ক্ষতি বা মৃত্যু ঘটে।

পুলিশ অর্ডিন্যান্সের ৫৬ ধারায় পুলিশপ্রধানের ওপর জননিরাপত্তা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আদালত মনে করেছে, এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অপরাধমূলক অবহেলার শামিল।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অবস্থা

শ্রীলঙ্কায় ১৯৭৬ সালের জুন মাস থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর একটি অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ কার্যকর রয়েছে। এর ফলে successive রাষ্ট্রপতিরা সব মৃত্যুদণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করে আসছেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমারা দিসানায়েকে এই স্থগিতাদেশ বহুল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাই এই দুই সাবেক কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড কার্যত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সীমিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। শ্রীলঙ্কা মৃত্যুদণ্ড আইনগতভাবে বহাল রাখলেও কার্যত বিলুপ্তির পথে রয়েছে।

আপিলের সুযোগ

আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার রয়েছে জয়সুন্দরা ও ফার্নান্দোর। তাদের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। আইনজীবী চামিন্দা আথুকোরালে জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল দাখিল করবেন।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

অপরাধমূলক অবহেলা কী? অপরাধমূলক অবহেলা হলো কোনো ব্যক্তির ওপর আইন বা দায়িত্ব দ্বারা অর্পিত কর্তব্য পালনে গুরুতর অবহেলা প্রদর্শন করা, যার ফলে অন্যের ক্ষতি বা মৃত্যু ঘটে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কিনা? শ্রীলঙ্কায় ১৯৭৬ সাল থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। তাই এই মৃত্যুদণ্ড কার্যত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আপিলের সুযোগ কী? উভয় আসামির আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। আপিল প্রক্রিয়া চলমান থাকায় রায়টি এখনো চূড়ান্ত নয়।

অন্য আসামিদের অবস্থা কী? ২০২৬ সালের ২২ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কার আদালত হামলার সঙ্গে জড়িত ১৫ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত হিসেবে যাদের শনাক্ত করা হয়েছিল, তারা বর্তমানে জীবিত নেই। তবে শ্রীলঙ্কার ক্যাথলিক চার্চ দাবি করেছে যে এখন পর্যন্ত যাদের হামলার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তারা প্রকৃত পরিকল্পনাকারী নন এবং এর পেছনে বড় ষড়যন্ত্র রয়েছে।

সংক্ষেপে

  • ৩১ জুলাই ২০২৬-এ কলম্বো হাইকোর্ট ট্রায়াল-অ্যাট-বার সাবেক পুলিশপ্রধান পুজিথ জয়সুন্দরা ও সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব হেমাসিরি ফার্নান্দোকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
  • সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়: ২-১; ভিন্নমত দেন বিচারপতি বীরাসুরিয়া।
  • অভিযোগ: খুন, খুনের চেষ্টা, অপরাধমূলক অবহেলা।
  • হামলার আগে আটটি গোয়েন্দা সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল।
  • মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ১২ বছরের কারাদণ্ড ও ৫,০০০ রুপি জরিমানা।
  • শ্রীলঙ্কায় ১৯৭৬ সাল থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি।
  • উভয় আসামি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

তথ্যসূত্র

মাধ্যম সূত্র:

  • ABC News — ১ আগস্ট ২০২৬
  • Reuters — ৩১ জুলাই ২০২৬
  • Daily News (শ্রীলঙ্কা) — ১ আগস্ট ২০২৬
  • Daily Mirror (শ্রীলঙ্কা) — ৩১ জুলাই ২০২৬
  • Sri Lanka Mirror — ৩১ জুলাই ২০২৬
  • The Island — ১ আগস্ট ২০২৬
  • Daily Times — ৩১ জুলাই ২০২৬
  • The Independent — ৩১ জুলাই ২০২৬
  • ETV Bharat — ১ আগস্ট ২০২৬
  • India Today — ১ আগস্ট ২০২৬
  • Irish Times — ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রাথমিক সূত্র:

  • কলম্বো স্থায়ী হাইকোর্ট ট্রায়াল-অ্যাট-বার — রায়, ৩১ জুলাই ২০২৬
  • শ্রীলঙ্কার পুলিশ অর্ডিন্যান্স — ধারা ৫৬
  • শ্রীলঙ্কার দণ্ডবিধি — অপরাধমূলক অবহেলা সংক্রান্ত ধারা

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.