পিপলস লীগকে তিন মাসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের

বাংলাদেশ পিপলস লীগকে আগামী তিন মাসের মধ্যে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দিতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের পর দেওয়া এই নির্দেশের মাধ্যমে দলটির নিবন্ধনসংক্রান্ত বিরোধ নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গত ২২ জুলাই ২০২৬ (বুধবার) বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ সংক্রান্ত জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে এই রায় দেন। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন দলটির চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী গরীব নেওয়াজ মোহাম্মদ এবং আইনজীবী সৈয়দ মাহবুব হোসেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. সেলিম মিয়া।

কী ঘটেছে?

বাংলাদেশ পিপলস লীগ ১৯৭৬ সালে ড. আলীম আল রাজীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। ড. আলীম আল রাজী ছিলেন জাতীয় আওয়ামী পার্টি (ভাসানী)-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি ১৯৭৪ সালে দলটি ত্যাগ করে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ পিপলস লীগ গঠন করেন। ২০০৮ সালে নতুন বিধান প্রণয়নের পর দলটি নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে। ২০১২ সালে দলটি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলেও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সত্ত্বেও আবেদন অনুমোদন করা হয়নি বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

এরপর দলটির মহাসচিব সৈয়দ মাহবুব হোসেন ২০১৪ সালে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। ২০২৩ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্ট ইসিকে দলটির বিষয়ে পুনরায় তদন্তের (রি-ইনকোয়ারি) নির্দেশ দেন। পুনরায় তদন্ত শেষে ইসি ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি (কিছু সূত্রে ২ ফেব্রুয়ারি) নিবন্ধন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। এরপর ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুল জারি করেন। ওই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২২ জুলাই ২০২৬-এ হাইকোর্ট রায় দেন।

ইসির যুক্তি

নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের জুনে দাখিল করা হলফনামায় দাবি করে, বাংলাদেশ পিপলস লীগ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮-এর শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ইসির মাঠপর্যায়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দলটির দাখিলকৃত সাত জেলার মধ্যে মাত্র তিনটি জেলা দপ্তরের এবং ৩১টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ১৮টি উপজেলা দপ্তরের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা পাওয়া যায়, যা নিবন্ধনের শর্ত পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। সে জন্য নিবন্ধনের জন্য তাদের আবেদন কমিশন নামঞ্জুর করে।

দলটির দাবি

বাংলাদেশ পিপলস লীগের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা ২০ দলীয় জোটের শরিক থাকায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন এবং সেই কারণে নিবন্ধন দেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, এ সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।

দলটির মহাসচিব সৈয়দ মাহবুব হোসেন বলেন, “আমরা প্রথম যখন ২০১২ সালে আবেদন করি, তখন আমাদের ৮৩টি উপজেলা এবং ১৮টি জেলা কার্যালয় ছিল। নিয়ম অনুযায়ী ১০০ উপজেলা এবং ২১টি জেলা দরকার।”

দলটির চেয়ারম্যান গরীব নেওয়াজ মোহাম্মদ বলেন, “অপেক্ষাকৃত অনেক দল যাদের যথেষ্ট যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছিল। আমরা একটি রিট মোকদ্দমা করেছিলাম। সে আদেশে আমাদের রিট মঞ্জুর হয়।”

নিবন্ধনের আইনি শর্ত

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৯০খ এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী, একটি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধনের জন্য নিম্নলিখিত তিনটি শর্তের অন্তত একটি পূরণ করতে হয়:

শর্তবিবরণ
সংসদীয় প্রতিনিধিত্বস্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত কোনো সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে কমপক্ষে একটি আসনে জয়ী হওয়ার রেকর্ড
ভোটের হারশেষ সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে ৫ শতাংশ ভোট পাওয়া
সাংগঠনিক শক্তিসক্রিয় কেন্দ্রীয় কমিটি, অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জেলায় এবং ১০০টি উপজেলায় কার্যালয় এবং প্রতিটি কার্যালয়ে কমপক্ষে ২০০ জন ভোটারের সমর্থন

নিবন্ধনের তাৎপর্য

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে ৬০টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত রয়েছে। নিবন্ধন পেলে বাংলাদেশ পিপলস লীগ হবে দেশের ৬১তম নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। উল্লেখ্য, নিবন্ধন ছাড়া রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকায় তাদের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে।

আইনি প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ সংগঠনের স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে। রাজনৈতিক দল গঠন ও পরিচালনা এই অনুচ্ছেদের আওতায় সাংবিধানিক সুরক্ষা পায়। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করে। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট বিভাগের রিট এখতিয়ার নিশ্চিত করে। নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশের নির্বাচন পরিচালনা ও রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবিধানিক সংস্থা। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে ইসির গঠন ও ১১৯ অনুচ্ছেদে ইসির দায়িত্ব ও কার্যাবলি বর্ণিত।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

নিবন্ধন কী? নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি, যা রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আইনি অধিকার দেয়।

নিবন্ধন না পেলে কী হয়? নিবন্ধন ছাড়া রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যক্রম চালানো গেলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায় না।

পরবর্তী কী হবে? নির্বাচন কমিশনকে তিন মাসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেনি। ইসি নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে দলটি ৬১তম নিবন্ধিত দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

সংক্ষেপে

  • ২২ জুলাই ২০২৬: হাইকোর্ট পিপলস লীগকে তিন মাসের মধ্যে নিবন্ধন দিতে ইসিকে নির্দেশ দেন।
  • বেঞ্চ: বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেন।
  • রিটকারী: দলটির মহাসচিব সৈয়দ মাহবুব হোসেন (২০১৪ সালে রিট দায়ের)।
  • দলটি ১৯৭৬ সালে ড. আলীম আল রাজীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ইসি বলছে, দলটি সাত জেলার মধ্যে তিনটি এবং ৩১টি উপজেলার মধ্যে ১৮টি দপ্তরের অস্তিত্ব পেয়েছে।
  • দলটির দাবি, ২০ দলীয় জোটের শরিক থাকায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে।
  • বর্তমানে ইসিতে ৬০টি দল নিবন্ধিত; পিপলস লীগ হবে ৬১তম দল।
  • আইনি ভিত্তি: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২; রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮।

তথ্যসূত্র

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ — অনুচ্ছেদ ৯০ক, ৯০খ
  • রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮
  • বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৩১, ৩৮, ১০২, ১১৮, ১১৯
  • হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — রায়, ২২ জুলাই ২০২৬

মাধ্যম সূত্র:

  • সমকাল — ২২ জুলাই ২০২৬
  • প্রথম আলো — ২২ জুলাই ২০২৬
  • কালের কণ্ঠ — ২২ জুলাই ২০২৬
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ২২ জুলাই ২০২৬
  • যুগান্তর — ২২ জুলাই ২০২৬
  • ইত্তেফাক — ২২ জুলাই ২০২৬
  • মুক্তকণ্ঠ — ২২ জুলাই ২০২৬
  • বাংলা ট্রিবিউন — ২২ জুলাই ২০২৬

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়। নির্বাচন কমিশন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেনি; চূড়ান্ত নিবন্ধন এখনো হয়নি। “অভিযোগ” শব্দটি এখানে দলটির দাবি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, প্রমাণিত তথ্য নয়। কোনো ব্যক্তিগত আইনি সমস্যার জন্য যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করুন।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.