ইউপি চেয়ারম্যান পদে স্নাতক যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টের রুল

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক নির্ধারণের নির্দেশনা চেয়ে করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২৬ ধারা শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণে ব্যর্থ হওয়ায় তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না কেন, সে বিষয়েও জানতে চেয়েছেন আদালত।

গত ২২ জুলাই ২০২৬ (বুধবার) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। রুলের জবাব দিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রিটটি দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী কাজী ফেরদাউসুল হাসান ও মো. তানভীর আহমেদ খান।

কী ঘটেছে?

রিটকারীদের পক্ষ থেকে আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলা হয়, একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গ্রাম আদালত পরিচালনা এবং নির্ধারিত সীমার মধ্যে — ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত — মামলা নিষ্পত্তির দায়িত্বও রয়েছে।

অথচ অনুরূপ বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগকারী একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (বিজেএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সেই তুলনায় চেয়ারম্যান পদে কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারিত না থাকায় আইনি অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে বলে রিটে উল্লেখ করা হয়।

রিটকারী আইনজীবী কাজী ফেরদাউসুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “এখানে চেয়ারম্যানের কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না। অথচ সমপর্যায়ের বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগকারী ম্যাজিস্ট্রেটকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি ও বিজেএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।” এই অসামঞ্জস্যের ভিত্তিতেই ২০০৯ সালের ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২৬ ধারা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন。

ইউপি চেয়ারম্যানের ক্ষমতা

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, ইউপি চেয়ারম্যান গ্রাম আদালত পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন। গ্রাম আদালত ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তি করে। চেয়ারম্যান নির্ধারিত সীমার মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন, যার সর্বোচ্চ সীমা ৩ লাখ টাকা。

এছাড়া চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, সেবা প্রদান ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেন।

ম্যাজিস্ট্রেটের যোগ্যতা

বাংলাদেশে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার জন্য আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হয় এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগকারীরা যথাযথ আইনি জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করেন。

রিটকারীদের যুক্তি অনুযায়ী, ইউপি চেয়ারম্যান যখন অনুরূপ বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তখন তার জন্যও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা যুক্তিসঙ্গত।

আইনি প্রেক্ষাপট

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ — ধারা ২৬

এই ধারায় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা বর্ণিত। ২৬(১) অনুযায়ী:

  • প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে
  • তার বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে
  • চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের কোনো ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম থাকতে হবে

২৬(২)-এ অযোগ্যতার তালিকা রয়েছে — নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত হওয়া, দেউলিয়া ঘোষিত হওয়া, প্রজাতন্ত্রের বা পরিষদের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকা ইত্যাদি। তবে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত এই আইনে নেই।

সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ

  • ২৭ অনুচ্ছেদ: আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা
  • ৩১ অনুচ্ছেদ: আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার
  • ৩২ অনুচ্ছেদ: জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার

রিটকারীদের দাবি অনুযায়ী, ইউপি চেয়ারম্যান পদে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সংবিধানের সমতার নীতির পরিপন্থী, কারণ একই ধরনের বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতার মানদণ্ড প্রযোজ্য।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

রুল কী? হাইকোর্ট যখন কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চান, তখন তাকে রুল বলা হয়। এটি চূড়ান্ত রায় নয়। কর্তৃপক্ষ জবাব দিলে আদালত শুনানি করে সিদ্ধান্ত নেন।

গ্রাম আদালত কী? গ্রাম আদালত হলো ইউনিয়ন পর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির একটি স্থানীয় বিচারিক ব্যবস্থা, যা ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।

পরবর্তী কী হবে? বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে হবে। জবাব পাওয়ার পর আদালত শুনানি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।

সংক্ষেপে

  • ২২ জুলাই ২০২৬-এ হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
  • বেঞ্চ: বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার।
  • রিটকারী: আইনজীবী কাজী ফেরদাউসুল হাসান ও মো. তানভীর আহমেদ খান।
  • রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে: ইউপি চেয়ারম্যান পদে ন্যূনতম স্নাতক যোগ্যতা কেন বাধ্যতামূলক নয়।
  • ইউপি চেয়ারম্যান গ্রাম আদালত পরিচালনা করেন এবং ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন।
  • ম্যাজিস্ট্রেটকে স্নাতক ডিগ্রি ও বিজেএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
  • আইন ২০০৯-এর ২৬ ধারায় কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত নেই।
  • মামলাটি রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।

তথ্যসূত্র

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ — ধারা ২৬(১), ২৬(২)
  • বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৩২
  • হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — রুলের আদেশ, ২২ জুলাই ২০২৬

মাধ্যম সূত্র:

  • বাংলাদেশ প্রতিদিন — ২২ জুলাই ২০২৬
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ২২ জুলাই ২০২৬
  • দ্য ডেইলি স্টার — ২২ জুলাই ২০২৬
  • ঢাকা ট্রিবিউন (বাংলা) — ২২ জুলাই ২০২৬
  • সমকাল — ২২ জুলাই ২০২৬
  • প্রথম আলো — ২২ জুলাই ২০২৬

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়। মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি। “অভিযোগ” শব্দটি এখানে রিটকারীদের দাবি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, প্রমাণিত তথ্য নয়। কোনো ব্যক্তিগত আইনি সমস্যার জন্য যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করুন।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.