বেদখল জমি ফিরে পেতে ৩ মাসের আইনি প্রতিকার – কী বলছে ভূমি অপরাধ আইন?
বৈধ দখলে থাকা জমি আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দখলচ্যুত করা হলে তা পুনরুদ্ধারের জন্য দ্রুত আইনি প্রতিকারের সুযোগ তৈরি হয়েছে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর মাধ্যমে। আইনটির ৮ ধারায় বলা হয়েছে, উপযুক্ত আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে তার দখলীয় ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হলে তিনি দখল পুনরুদ্ধারের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিক্ষেত্রের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৩ মাসে ঢাকা জেলায় এই আইনের আওতায় মোট ৮০৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে ৩৩২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
ধারা ৮-এর বিধান: দখল পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের ৮ ধারায় বেআইনিভাবে দখলচ্যুত ব্যক্তির জমির দখল পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, উপযুক্ত আদালত বা কর্তৃপক্ষের আদেশ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে তার দখলীয় ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হলে তিনি দখল পুনরুদ্ধারের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিক্ষেত্রের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন পাওয়ার পর এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট যদি সন্তুষ্ট হন যে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তার দখল থেকে উচ্ছেদ বা বেদখল করা হয়েছে, তাহলে তাকে পূর্বের দখলে পুনর্বহালের জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সরেজমিন তদন্ত করতে হবে। যথাযথভাবে নোটিশ দেওয়ার পরও কোনো পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত থাকলে সরেজমিন তদন্ত ও প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান শেষে লিখিত আদেশ দেওয়ার সুযোগও আইনে রাখা হয়েছে।
তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান
আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আবেদন পাওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দখল পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করার বিধান। কোনো কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ প্রক্রিয়ায় অসহযোগিতা বা অবহেলা করলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নিজে অথবা তার নিয়োজিত ব্যক্তির মাধ্যমে এই আইনের অধীনে আবেদন বা মামলা পরিচালনা করতে পারবেন। একই সঙ্গে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট জেলার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন বা অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করে দিতে পারেন।
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিধিমালা, ২০২৪ অনুযায়ী, প্রতিপক্ষকে নোটিশ জারির ১৫ দিনের মধ্যে জবাব দিতে হবে। জবাব না দিলে বা জবাব সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত ফৌজদারি আদালতে অভিযোগ প্রেরণ করবেন।
দেওয়ানি মামলা চললে কী হবে
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে দখল পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত একটি বিশেষ সীমাবদ্ধতাও রাখা হয়েছে। কোনো দেওয়ানি আদালতে একই বিষয়ে দখল পুনরুদ্ধারের মামলা বিচারাধীন থাকলে, একই বিষয়ে সাধারণভাবে এই ধারার অধীনে নতুন করে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
তবে সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি আদালত কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে অথবা আদালতের নিজস্ব বিবেচনায় বিচারাধীন মামলাটি এই আইনের অধীনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠাতে পারবেন।
আদেশ অমান্য করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড
আইনের ৮ ধারার অধীনে দেওয়া কোনো আদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য বা লঙ্ঘন করা কিংবা সেই আদেশ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
জেলা পর্যায়ে বিশেষ টিম
ভূমি মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার উপসচিব তুষার আহমেদ বলেন, “ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ প্রণয়নের পর ২০২৪ সালে এর বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। বিধিমালা যথাযথভাবে পরিপালনের মাধ্যমে আইনটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার সুফল পাচ্ছে জনগণ।” তিনি আরও বলেন, “প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে একটি আলাদা টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে জমা পড়া আবেদনগুলো আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।”
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লিটুস লরেন্স চিরান বলেন, “এই আইনের আওতায় ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা জেলায় ৮০৭টি মামলার মধ্যে ৪৭৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটদের এখতিয়ার নির্ধারণ করে দিয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “নিয়োজিত সব এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সর্বাত্মক আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেদখলকৃত ভূমি পুনরুদ্ধার করে জনগণের ভোগান্তি দূর করা হচ্ছে।”
দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার দাবি ভুক্তভোগীর
এই আইনের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়া ভুক্তভোগী জসিম উদ্দিন বলেন, “আদালতের আদেশ ছাড়াই আমাকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। আমি প্রতিকার চেয়ে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করি। পরে তিন মাসের মধ্যেই জমির দখল ফেরত পেয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “এটা নিয়ে দেওয়ানি আদালতে গেলে বছরের পর বছর সময় লাগত। এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিকার পেয়েছি।”
আইনি প্রেক্ষাপট
ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ৩৬ নং আইন) ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে প্রণীত হয়। এই আইনের ৭ ধারায় অবৈধ দখলের শাস্তি অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ৯ থেকে ১৪ ধারায় ভূমি প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যা দলিল তৈরি, সরকারি স্বার্থযুক্ত ভূমি দখল ইত্যাদি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এই আইনের অধীনে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৬(২)(খ) ধারায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
মামলার বর্তমান অবস্থা
ঢাকা জেলায় ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮০৭টি মামলার মধ্যে ৪৭৫টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ৩৩২টি বিচারাধীন রয়েছে। দায়েরকৃত মামলার সিংহভাগই অবৈধভাবে দখলচ্যুত ব্যক্তির দখল পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
বেদখল জমি উদ্ধারে আগ্রহী ব্যক্তিকে প্রথমে সংশ্লিষ্ট এলাকার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে জমির মালিকানা ও দখলের প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় দলিলপত্র সংযুক্ত করতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে কোনো দেওয়ানি আদালতে একই বিষয়ে মামলা বিচারাধীন থাকলে এই প্রক্রিয়ায় প্রতিকার পাওয়া যাবে না।
সংক্ষেপে
- আইনি ভিত্তি: ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ (ধারা ৮)।
- প্রতিকারের পথ: এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন।
- সময়সীমা: তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি।
- শাস্তি: আদেশ অমান্য করলে অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড।
- ঢাকা জেলার পরিসংখ্যান: ৮০৭টি মামলা, ৪৭৫টি নিষ্পত্তি, ৩৩২টি বিচারাধীন।
তথ্যসূত্র
- ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ৩৬ নং আইন)
- ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিধিমালা, ২০২৪ (এস.আর.ও. নং ৩৭১-আইন/২০২৪)
- ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্য
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। নির্দিষ্ট কোনো মামলার সিদ্ধান্ত বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
