পৃথক মামলার সাজা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে: হাইকোর্টের রায়
একাধিক মামলায় পৃথকভাবে দেওয়া কারাদণ্ডের সাজা আদালত স্পষ্ট নির্দেশ না দিলে ধারাবাহিকভাবে (consecutive) কার্যকর হবে; অর্থাৎ একটি সাজা শেষ হওয়ার পর অন্য সাজা শুরু হবে। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার সুবিধা কেবল সংশ্লিষ্ট মামলায় বিচারাধীন অবস্থায় কাটানো হাজতবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে; এক মামলার সাজাভোগের সময় অন্য মামলার সাজা থেকে কর্তন করা যাবে না।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলাটি দায়ের করেন মো. নাসির উদ্দিন, যিনি নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার অধীনে দায়ের হওয়া ছয়টি পৃথক মামলায় দণ্ডিত হন। তিনি দাবি করেন যে, বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ও কারাভোগের সময়কাল বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে মুক্তি দেওয়া উচিত ছিল এবং কারা কর্তৃপক্ষ আইনানুগভাবে ৩৫এ ধারার সুবিধা প্রদান করেনি। এ অভিযোগে তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট আবেদন করেন।
আবেদনকারীর পক্ষে বলা হয়, তিনি ইতোমধ্যে বিভিন্ন মামলায় প্রদত্ত সাজা ভোগ করেছেন এবং সেই সময়কাল হিসাব করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ ব্যাংকগুলোর আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী আদালত বিশেষ নির্দেশ না দিলে পৃথক মামলার সাজা একটির পর একটি কার্যকর হবে এবং এক মামলার সাজাভোগ অন্য মামলার সাজা থেকে সমন্বয় করা যাবে না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: ৩৫এ ধারা ও ৩৯৭ ধারা
হাইকোর্ট বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা কেবল সেই মামলায় বিচারপূর্ব হাজতবাসের সময়কে সাজা থেকে কর্তনের সুযোগ দেয়। অন্য কোনো মামলায় কাটানো কারাবাসের সময় এ ধারার অধীনে সমন্বয়যোগ্য নয়।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুসারে কোনো ব্যক্তি একাধিক মামলায় দণ্ডিত হলে পরবর্তী সাজা পূর্ববর্তী সাজা শেষ হওয়ার পর কার্যকর হবে, যদি না বিচারিক আদালত স্পষ্টভাবে সমসাময়িক (concurrent) সাজা ভোগের নির্দেশ দেন।
রায়ে আদালত Nazrul Islam vs. Government of Bangladesh (75 DLR 427) মামলার সিদ্ধান্ত উদ্ধৃত করে বলেন, একাধিক সাজা সাধারণত ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয় এবং সমসাময়িকভাবে কার্যকরের জন্য আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা আবশ্যক।
এছাড়া আদালত পুনর্ব্যক্ত করেন যে, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের রিট এখতিয়ারের মাধ্যমে সাধারণভাবে ফৌজদারি কার্যধারায় হস্তক্ষেপ করা যায় না, যদি না আইনের বৈধতা (vires) চ্যালেঞ্জ করা হয় অথবা এখতিয়ারগত ত্রুটি প্রমাণিত হয়।
রায়ের ফলাফল
সব দিক বিবেচনায় হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন এবং আবেদনকারীকে দুই মাসের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আইনজীবীকে প্রতিটি মামলায় বিচারকালীন হাজতবাসের পৃথক হিসাব তৈরি করে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করার সুযোগ দেওয়া হয়, যাতে ৩৫এ ধারার সুবিধা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যায়।
আইনি শিক্ষা
এই রায় থেকে প্রতীয়মান হয় যে, একাধিক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একসঙ্গে চলবে না। বিচারিক আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া সাজা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে। একই সঙ্গে, ৩৫এ ধারার সুবিধা কেবল সংশ্লিষ্ট মামলার বিচারকালীন হাজতবাসের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে।
মামলার তথ্য:
- মামলার নাম: মো. নাসির উদ্দিন বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য
- মামলা: রিট পিটিশন নং ২৩২৭/২০২২
- আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ
- বিচারপতি: বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী
- এখতিয়ার: সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিশেষ মূল এখতিয়ার
- শুনানি: ২৫ জুন, ৪ আগস্ট, ২০ আগস্ট ও ২১ আগস্ট ২০২৫
- রায়: ২৭ আগস্ট ২০২৫
- রায় প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আইনি সতর্কীকরণ: এই লেখাটি সাধারণ আইনগত তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। নির্দিষ্ট কোনো মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, তথ্য ও পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
সূত্র:
- The Code of Criminal Procedure, 1898 — Sections 35A, 397
- The Negotiable Instruments Act, 1881 — Section 138
- Constitution of Bangladesh — Article 102
- Observer, 25 September 2026
- JagoNews24, 25 September 2026
- Voice7 News, 25 September 2026
- Nazrul Islam vs. Government of Bangladesh, 75 DLR 427
FAQ
১. একাধিক মামলায় দণ্ডিত হলে সাজা কি একসঙ্গে চলবে?
না। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী, আদালত স্পষ্টভাবে সমসাময়িক (concurrent) সাজা ভোগের নির্দেশ না দিলে সাজা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে।
২. ৩৫এ ধারার সুবিধা কি এক মামলা থেকে অন্য মামলায় সমন্বয় করা যায়?
না। ৩৫এ ধারার সুবিধা কেবল সংশ্লিষ্ট মামলায় বিচারাধীন অবস্থায় কাটানো হাজতবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্য মামলার সাজা থেকে এই সময় কর্তন করা যায় না।
৩. সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে ফৌজদারি মামলায় হস্তক্ষেপ করা যায় কি?
সাধারণভাবে না। আইনের বৈধতা (vires) চ্যালেঞ্জ করা হলে অথবা এখতিয়ারগত ত্রুটি প্রমাণিত হলে রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করা যেতে পারে।
৪. এই রায়ের প্রভাব কী?
একাধিক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের সাজা ধারাবাহিকভাবে ভোগ করতে হবে এবং ৩৫এ ধারার সুবিধা পৃথকভাবে হিসাব করতে হবে।
৫. ৭৫ ডিএলআর ৪২৭ মামলার সিদ্ধান্ত কী?
এই মামলায় বলা হয়েছে, একাধিক সাজা সাধারণত ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হয় এবং সমসাময়িকভাবে কার্যকরের জন্য আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা আবশ্যক।
