চুক্তিপত্রে কোম্পানির পক্ষ, সম্পত্তির বিবরণ ও রেজিস্ট্রেশন: স্বাক্ষরের আগে যা যাচাই করবেন
কোনো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার আগে পক্ষগুলোর পরিচয় ও তাদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা যাচাই করা না হলে পরবর্তীতে বিরোধ দেখা দিলে চুক্তির দায় কোম্পানির ওপর বর্তাবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা চুক্তিপত্র যাচাইয়ের সময় দেখা যায়, চুক্তিতে দুটি কোম্পানির পরিচয়, সুনাম, কার্যক্রম, ঠিকানা ও ওয়েবসাইট উল্লেখ থাকলেও স্বাক্ষর করেছেন কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত নামে। আইনের চোখে কোম্পানি একটি স্বতন্ত্র আইনগত সত্তা হওয়ায় এ ধরনের অসঙ্গতি ভবিষ্যতে জটিলতার জন্ম দিতে পারে।
কোম্পানির পক্ষ ও স্বাক্ষরের বৈধতা
আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানির নামে সম্পত্তি কেনা, ভাড়া নেওয়া কিংবা মামলার পক্ষ হওয়া সম্ভব হলেও কোম্পানির পরিবর্তে কোনো পরিচালক ব্যক্তিগত নামে চুক্তি করলে সেই চুক্তির দায় আদৌ কোম্পানির ওপর বর্তাবে কি না, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির ওপর। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা হলে পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডাররা সঠিক বা প্রয়োজনীয় পক্ষ নন, যদি না তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে। [Source: Makbulur Rahman and others v. Halima Textile Mills Ltd., 14 BLD 429.] তবে পরিচালক যদি কোম্পানির নাম উল্লেখ না করে চুক্তি করেন, সেক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হতে পারেন। তাই চুক্তিতে কোম্পানি পক্ষ হলে তার সঠিক পরিচয়, অনুমোদিত প্রতিনিধির ক্ষমতা এবং যথাযথ স্বাক্ষর নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সম্পত্তির স্পষ্ট বিবরণের গুরুত্ব
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো চুক্তির বিষয়বস্তুর স্পষ্টতা। চুক্তিতে যদি শুধু লেখা থাকে যে অমুক নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, অথচ সেই তলায় একই রকম চারটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে, তাহলে ঠিক কোনটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ২১ ধারা অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত নন-টেস্টামেন্টারি দলিল নিবন্ধনের জন্য গ্রহণ করা হয় না, যদি না তাতে সম্পত্তির এমন বিবরণ থাকে যা দলিলটি শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট। [Source: Section 21, Registration Act, 1908.] তাই সম্পত্তির নম্বর, আয়তন, অবস্থান, সীমানা, ফ্লোর ও ইউনিট নম্বরসহ প্রয়োজনীয় বিবরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
মৌখিক শর্ত লিখিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা
তৃতীয়ত, পক্ষগুলোর মধ্যে মৌখিকভাবে সম্মত সব শর্ত লিখিতভাবে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। অনেকেই মৌখিক কথাবার্তার ওপর ভরসা করে চুক্তি করেন এবং পরে বিরোধে বলেন, “আমাদের মধ্যে তো এ কথাও ঠিক হয়েছিল!” কিন্তু চুক্তিতে বিষয়টি উল্লেখ না থাকলে প্রমাণের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। আদালত কারও মনের কথা জানেন না; আদালত চুক্তির ভাষা, উপস্থাপিত প্রমাণ ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করেন। তাই মূল্য, পরিশোধের সময়সীমা, দায়িত্ব, অধিকার, শর্ত ভঙ্গের পরিণতি ও ক্ষতিপূরণসহ সব শর্ত লিখিতভাবে রাখা প্রয়োজন।
এস্কেপ ক্লজ ও চুক্তি বাতিলের শর্ত
চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পথ বা এস্কেপ ক্লজ (Escape Clause)-এর দিকেও নজর দেওয়া উচিত। স্বাক্ষরের আগে দেখে নিতে হবে কোন পরিস্থিতিতে চুক্তি বাতিল করা যাবে, কত দিনের নোটিশ প্রয়োজন, কে কী অধিকার পাবেন এবং চুক্তি ভঙ্গ হলে কী প্রতিকার মিলবে। তবে সব ধরনের চুক্তিতে একইভাবে বাতিলের সুযোগ থাকে না। যেমন জমি বিক্রয়ের রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের ক্ষেত্রে সাধারণ চুক্তির মতো ইচ্ছামতো বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই। তাই চুক্তির প্রকৃতি বুঝে শর্ত নির্ধারণ করতে হবে।
স্ট্যাম্প শুল্ক, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন
সাদা কাগজে স্বাক্ষর করলেই বৈধ চুক্তি হয়ে যায়—এমন ধারণা ভুল। চুক্তির বৈধতা নির্ভর করে পক্ষদের সম্মতি, সক্ষমতা, বৈধ প্রতিদান, বৈধ উদ্দেশ্য এবং প্রযোজ্য আইনি শর্তের ওপর। ম্যানুয়াল অব ফরমস অ্যান্ড প্রসিডিউর এবং স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯ অনুযায়ী, কিছু দলিলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মূল্যমানের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদন, স্ট্যাম্প শুল্ক প্রদান বা অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা আইনে বাধ্যতামূলক থাকতে পারে। বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে ফাঁকা কাগজে স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে—এমনটি কখনোই করা উচিত নয়।
এছাড়া কিছু চুক্তি বা দলিল কার্যকর করতে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ১৭ ধারা অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তির দানপত্র, এবং যেসব নন-টেস্টামেন্টারি দলিল স্থাবর সম্পত্তিতে কোনো অধিকার সৃষ্টি, ঘোষণা, হস্তান্তর, সীমাবদ্ধ বা বিলুপ্ত করে, সেগুলো নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। [Source: Section 17, Registration Act, 1908.] বিশেষভাবে ১৭ক ধারা অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি লিখিত হতে হবে, পক্ষগুলোর দ্বারা সম্পাদিত হতে হবে এবং নিবন্ধিত হতে হবে। চুক্তি সম্পাদনের তারিখ থেকে ষাট দিনের মধ্যে নিবন্ধনের জন্য উপস্থাপন করতে হবে। [Source: Section 17A, Registration Act, 1908.] রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন এমন দলিল রেজিস্ট্রি না করে ফেলে রাখলে ভবিষ্যতে মালিকানা বা অধিকার প্রতিষ্ঠায় বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চুক্তির বৈধতা: আইনসম্মত উদ্দেশ্য ও বৈধ প্রতিদান
আরেকটি বিষয় হলো, সব চুক্তি আইনগতভাবে কার্যকর বা বলবৎযোগ্য নয়। চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো চুক্তির প্রতিদান বা উদ্দেশ্য আইনবিরুদ্ধ, প্রতারণামূলক, বা জননীতির পরিপন্থী হলে তা অবৈধ। [Source: Section 23, Contract Act, 1872.] সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পাদিত চুক্তি “জননীতির” পরিপন্থী এবং বাংলাদেশের আইনে সুরক্ষিত নয়। [Source: 10 SCOB 2018, paragraph 69.] তাই চুক্তির বিষয়বস্তুর বৈধতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
বৈধ প্রতিদান বা বিনিময়মূল্য সবসময় বাজারমূল্যের সমান হতে হবে—এমন বিধান আইনে নেই। চুক্তি আইন, ১৮৭২-এর ২৫ ধারার ব্যাখ্যা এবং দৃষ্টান্ত (f) অনুযায়ী, একটি ঘোড়ার মূল্য ১,০০০ টাকা হলেও তা ১০ টাকায় বিক্রি করা যায়, যদি পক্ষের সম্মতি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়। [Source: Section 25, Illustration (f), Contract Act, 1872.] তবে কম মূল্য দেখিয়ে স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি বা অন্য আইনি বাধ্যবাধকতা এড়ানোর চেষ্টা করা যাবে না।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার আগে কেবল শেষ পাতায় স্বাক্ষর করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কার সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে, কী নিয়ে চুক্তি হচ্ছে, কী কী শর্তে সম্মতি দেওয়া হচ্ছে, কীভাবে চুক্তি বাতিল হবে, স্ট্যাম্প ও রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন কি না এবং চুক্তির বিষয়বস্তু আইনসম্মত কি না—এসব যাচাই করেই স্বাক্ষর করা উচিত। কারণ চুক্তির সময় সামান্য অসতর্কতা পরবর্তীতে বড় আর্থিক ক্ষতি ও দীর্ঘ আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।
আইনজীবীরা পরামর্শ দেন, কোনো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে স্বাক্ষরের আগে অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে চুক্তিপত্রটি যাচাই করিয়ে নেওয়া উচিত। স্বাক্ষরের আগে যে সময় ও অর্থ ব্যয় করে সতর্ক হওয়া যায়, বিরোধের পর তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
আইনি সতর্কীকরণ: এই লেখাটি সাধারণ আইনগত তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। নির্দিষ্ট কোনো মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, তথ্য ও পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
সূত্র:
- The Contract Act, 1872 — Sections 2(h), 10, 23, 25
- The Registration Act, 1908 — Sections 17, 17A, 21
- The Transfer of Property Act, 1882 — Section 54
- Makbulur Rahman and others v. Halima Textile Mills Ltd., 14 BLD 429
- Bangladesh Bank v. S.R. Group Ltd., (2014) 66 DLR 324
- K N Enterprise v. Eastern Bank Limited, 63 DLR (2011) 370
- Engineer Mahmudul-ul Islam and others v. Government of Bangladesh, 2003 23 BLD 80
FAQ
১. কোম্পানির পক্ষে চুক্তি করলে কে স্বাক্ষর করবেন?
কোম্পানির অনুমোদিত প্রতিনিধি (যেমন পরিচালক বা ম্যানেজিং ডিরেক্টর) কোম্পানির নাম ও পদবি উল্লেখ করে স্বাক্ষর করবেন। ব্যক্তিগত নামে স্বাক্ষর করলে ব্যক্তিগত দায় তৈরি হতে পারে।
২. সম্পত্তির বিবরণ কতটা স্পষ্ট হতে হবে?
রেজিস্ট্রেশন আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী, সম্পত্তি শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট বিবরণ থাকতে হবে—যেমন নম্বর, আয়তন, অবস্থান, সীমানা, ফ্লোর ও ইউনিট নম্বর।
৩. জমি বিক্রয়ের চুক্তি কি রেজিস্ট্রেশন করতে হবে?
হ্যাঁ। রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ক ধারা অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তি লিখিত হতে হবে এবং সম্পাদনের ৬০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করতে হবে।
৪. কম মূল্যে সম্পত্তি বিক্রি করলে চুক্তি বৈধ হবে কি?
হ্যাঁ, যদি সম্মতি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয় এবং চুক্তিটি প্রকৃত ও আইনসম্মত হয়। তবে স্ট্যাম্প শুল্ক ও রেজিস্ট্রেশন ফি এড়ানো যাবে না।
৫. কোন চুক্তি আইনগতভাবে কার্যকর নয়?
চুক্তি আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী, আইনবিরুদ্ধ, প্রতারণামূলক বা জননীতির পরিপন্থী চুক্তি অবৈধ ও অকার্যকর।
