বাস দুর্ঘটনায় আহত আইনজীবীকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের রুল, ডাবল ডেকার বাসের নিরাপত্তায় হাইকোর্টের নির্দেশনা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সেন্টমার্টিন পরিবহনের বাস দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরানকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ডাবল ডেকার বাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত এবং ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ২৬ জুলাই ২০২৬ (রোববার) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সানজিদ সিদ্দিকী।
কী ঘটেছে?
২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ইফাদ মোটরসের মালিকানাধীন সেন্টমার্টিন পরিবহনের বাসটি (নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো ব-১২-২৮৮১) রাত ২টা ৫ মিনিটের দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম মিয়া বাজার থানা এলাকায় দুর্ঘটনায় পড়ে। বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে রাস্তার পাশে পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়।
ওই দুর্ঘটনায় আইনজীবী বাহাউদ্দিন আল ইমরান শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পান। তার বাঁ পাশের পাঁজরের পাঁচটি হাড়ে ফ্র্যাকচার হয় এবং মানসিক ও শারীরিক নানা জটিলতা দেখা দেয়। দুর্ঘটনার পর তিনি ২৬ দিন পেশা থেকে বিরত ছিলেন এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চিকিৎসা খাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসার জন্য তার পরিবার ভারতের একটি হাসপাতালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে।
আইনি নোটিশ ও রিট
রিট দায়েরের আগে ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর ব্যারিস্টার একেএম এহসানুর রহমানের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি এবং সেন্টমার্টিন পরিবহনের মালিকের কাছে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে যোগাযোগ করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আহ্বান জানানো হয়, অন্যথায় হাইকোর্টে রিট দায়েরের সতর্কতা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ৩ মে আহত আইনজীবী নিজেই হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।
হাইকোর্টের নির্দেশনা
ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত
আদালত ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন এবং বিআরটিএর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে করা আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন।
ডাবল ডেকার বাসের নিরাপত্তা সংক্রান্ত
আদালত যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছেন:
- প্রতিটি সংশ্লিষ্ট বাসে ফিটনেস সনদের মেয়াদ স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করতে হবে এবং কিউআর (QR) কোড সংযুক্ত করতে হবে, যাতে যাত্রীরা সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারেন।
- যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।
- সেন্টমার্টিন পরিবহনটির চলাচলের সব রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিল করা হবে কিনা তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
- সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সমন্বয়ে কুইক রেসপন্স টিম গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
- প্রতিটি পরিবহনের ভেতরে-বাইরে ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
- সিঙ্গেল চেসিসে ডাবল ডেকার বাসে রূপান্তর করার বিষয়ে বিবাদীদের ব্যর্থতা সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়েছে।
এ মামলায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং সেন্টমার্টিন পরিবহনকে বিবাদী করা হয়েছে।
ডাবল ডেকার বাসের সংকট
শুনানিতে আবেদনকারীর আইনজীবীরা দাবি করেন, বাংলাদেশের মহাসড়কে চলাচলকারী অনেক ডাবল ডেকার স্লিপার বাস মূলত সিঙ্গেল চেসিসের যানবাহনকে যথাযথ অনুমোদন ছাড়া রূপান্তর করে তৈরি করা হয়েছে। এসব যানবাহনের অনেকগুলোর ক্ষেত্রে বিআরটিএ-এর প্রয়োজনীয় অনুমোদন, নিবন্ধন বা ফিটনেস সনদ নেই।
বিআরটিএর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসেরই অনুমোদন নেই, কারণ এ ধরনের মোটরযানের জন্য কোনো নীতিমালা বা গাইডলাইন নেই। বিআরটিএর ডেটাবেজে ৮২৯টি ডাবল-ডেকার নন-স্লিপার বাসের রেজিস্ট্রেশন রেকর্ড রয়েছে। কিছু মালিক সিঙ্গেল-ডেকার হিসেবে বাস রেজিস্ট্রেশন করে পরে অবৈধভাবে বডি পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসে রূপান্তর করেছেন।
বিআরটিএ জরিপে আরও জানা গেছে:
- সিঙ্গেল-ডেকার থেকে ডাবল-ডেকার স্লিপারে রূপান্তরিত ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করা হয়েছে।
- এই বাসগুলোর ফিটনেস সনদ নবায়ন করা হচ্ছে না।
- বিআরটিএ মোবাইল কোর্ট তিনটি স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে।
- সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর অধীনে বিআরটিএ বর্তমানে শুধু সিঙ্গেল-ডেকার বাসের অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশন দেয়।
- ডাবল ডেকার স্লিপার বাস নিরাপদে চলাচলে অন্তত ফোর স্টার থেকে ফাইভ স্টার মানের সড়ক প্রয়োজন।
- উন্নত দেশগুলোর অনুশীলনের ভিত্তিতে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
আইনি প্রেক্ষাপট
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৫২ ধারা: কোনো মোটরযান থেকে উদ্ভূত দুর্ঘটনায় ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা মৃত্যুবরণ করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার উত্তরাধিকারী ধারা ৫৩-এর অধীন গঠিত আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসার খরচ পাওয়ার অধিকারী।
ক্ষতিপূরণের বর্তমান হার: সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর অধীনে গঠিত দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ ট্রাস্ট ফান্ড অনুযায়ী, নিহতদের পরিবারকে ৫ লাখ, গুরুতর আহতদের ৩ লাখ এবং সামান্য আহতদের ১ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। তবে এই তহবিল কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে ব্লাস্ট (BLAST) অভিযোগ করেছে — তহবিল সক্রিয় নয় এবং ক্ষতিপূরণ মূল্যায়ন বা প্রদানের কোনো মানদণ্ড বা প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়নি।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধান: এই আইনে মোটরযানের উচ্চতা, আসন বিন্যাস, হুইলবেস ইত্যাদি নির্ধারিত প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন থেকে বিচ্যুত কোনো পরিবর্তন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সিঙ্গেল চেসিসে ডাবল ডেকার বডি নির্মাণ এই বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২: এই বিধিমালার অধীনে বিআরটিএ শুধু সিঙ্গেল-ডেকার বাসের অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশন দেয়। ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের জন্য কোনো নীতিমালা বা গাইডলাইন না থাকায় বিআরটিএ এ ধরনের মোটরযানের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেয় না।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
ডাবল ডেকার স্লিপার বাস কেন বিপজ্জনক? ডাবল ডেকার স্লিপার বাস সাধারণত সিঙ্গেল চেসিসের ওপর অবৈধভাবে দোতলা কাঠামো নির্মাণ করে তৈরি করা হয়। এতে যানবাহনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, উচ্চতা বেড়ে যায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিআরটিএ এই ধরনের বাসের অনুমোদন দেয় না।
ক্ষতিপূরণ তহবিল কীভাবে কাজ করে? সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৫২ ধারা অনুযায়ী দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার ট্রাস্টি বোর্ড থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী। বর্তমানে নিহতদের পরিবার ৫ লাখ, গুরুতর আহত ৩ লাখ এবং সামান্য আহত ১ লাখ টাকা পেয়ে থাকেন। তবে এই তহবিল কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
ফিটনেস সনদ কী? ফিটনেস সনদ হলো বিআরটিএ কর্তৃক প্রদত্ত একটি সনদ, যা প্রমাণ করে মোটরযানটি সড়কে চলাচলের জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত। ফিটনেস সনদ ছাড়া কোনো যানবাহন সড়কে চালানো আইনত দণ্ডনীয়।
পরবর্তী কী হবে? বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে হবে। বিআরটিএ ট্রাস্টি বোর্ড ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের আবেদন নিষ্পত্তি করবে। মামলাটি রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।
সংক্ষেপে
- ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫: সেন্টমার্টিন পরিবহনের বাস কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে দুর্ঘটনায় পড়ে।
- ২৬ জুলাই ২০২৬: হাইকোর্ট ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের রুল জারি করেন।
- বেঞ্চ: বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার।
- রিটকারী: আহত আইনজীবী বাহাউদ্দিন আল ইমরান; রিট দায়ের ৩ মে ২০২৬।
- নির্দেশনা: ফিটনেস সনদ প্রদর্শন, কিউআর কোড, সিসিটিভি, কুইক রেসপন্স টিম, ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা।
- বিআরটিএ: ৮২৯টি ডাবল-ডেকার নন-স্লিপার বাসের রেজিস্ট্রেশন; কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন নেই; ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত।
- আহতের ক্ষতি: ২৬ দিন পেশা থেকে বিরত, ৪০ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি, ১০ লাখ টাকা চিকিৎসা ব্যয়।
- আইনি ভিত্তি: সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৫২ ধারা; সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২।
তথ্যসূত্র
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ — ধারা ৫২, ৫৩
- সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২
- বিআরটিএ — জরিপ প্রতিবেদন, ২০২৬
- হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — রুল ও নির্দেশনা, ২৬ জুলাই ২০২৬
মাধ্যম সূত্র:
- সমকাল — ২৬ জুলাই ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ২৬ জুলাই ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ৩ মে ২০২৬
- দেশ টিভি — ১৬ অক্টোবর ২০২৫
- নিউ এজ — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ডেইলি অবজার্ভার — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
