অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের পাসপোর্টে অতিরিক্ত গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন অবৈধ: হাইকোর্ট

supreme court

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও তাদের স্ত্রীদের সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে নতুন করে গোয়েন্দা ভেরিফিকেশনের মুখোমুখি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে দায়ের করা এক রিট মামলার রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন আদালত।

বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ এ রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায় ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ তা পাওয়া যায়।

কী ঘটেছে?

আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করে ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু গোয়েন্দা ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ার অজুহাতে তাকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়নি। ফলে তিনি বিদেশ ভ্রমণে বাধাগ্রস্ত হন। এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের অনুমতিক্রমে হাইকোর্ট বিভাগের প্রোটোকল অফিসার মো. রোমান ভূঁইয়া প্রশাসনিক এই বাধা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। পরে হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং সেই রুলের নিষ্পত্তি করে এই রায় দেওয়া হয়।

আদালতের রায়

রায়ে আদালত আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীসহ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক ও তাদের স্ত্রীদের কোনো ধরনের অতিরিক্ত গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন ছাড়াই সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যু করে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, বিচারক পদে দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্র তাদের মর্যাদা ও পরিচয় যাচাই করেই কূটনৈতিক পাসপোর্ট দিয়ে থাকে। ফলে অবসরের পর সাধারণ পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য তাদের পুনরায় গোয়েন্দা ভেরিফিকেশনের সম্মুখীন করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন।

আইনি প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ইস্যু ও ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয় বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার অধীনে। ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও তাদের স্ত্রীগণ কূটনৈতিক পাসপোর্টের অধিকারী। বিচারকের পদ থেকে অবসর বা পদত্যাগের পর তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হয়। এর আগে এসব সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রয়োজন হতো না।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট একটি স্মারকের মাধ্যমে কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণকারী ব্যক্তিদের সাধারণ পাসপোর্ট পাওয়ার আগে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সন্তোষজনক প্রতিবেদন পাওয়ার শর্ত দেয়। মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের প্রেক্ষাপটে এই স্মারক জারি করা হয়েছিল। তবে এই শর্তের কারণে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরাও জটিলতায় পড়েন।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

কূটনৈতিক ও সাধারণ পাসপোর্টের পার্থক্য কী? কূটনৈতিক পাসপোর্ট বিশেষ সুবিধাভোগীদের দেওয়া হয়, যার মধ্যে বিচারক, কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা থাকেন। সাধারণ পাসপোর্ট সাধারণ নাগরিকদের জন্য। বিচারক পদ থেকে অবসরের পর তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্ট নিতে হয়।

গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন মানে কী? সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর আগে আবেদনকারীর সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন নেওয়াকে গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন বলা হয়। ২০২৪ সালের ২২ আগস্টের স্মারক অনুযায়ী, কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণকারীদের ক্ষেত্রে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সন্তোষজনক প্রতিবেদন প্রয়োজন ছিল।

এই রায়ের প্রভাব কী? এই রায় নির্দিষ্ট মামলার প্রেক্ষিতে দেওয়া। তবে এটি সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক ও তাদের স্ত্রীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রায় অনুযায়ী, তাদের আর অতিরিক্ত গোয়েন্দা ভেরিফিকেশনের মুখোমুখি হতে হবে না।

সংক্ষেপে

  • হাইকোর্ট ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ রায় দেন; পূর্ণাঙ্গ রায় ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত।
  • অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও তাদের স্ত্রীদের অতিরিক্ত গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন ছাড়াই সাধারণ পাসপোর্ট ইস্যুর নির্দেশ।
  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২২ আগস্ট ২০২৪-এর স্মারকের শর্ত অবৈধ ঘোষণা।
  • আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীসহ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

তথ্যসূত্র

মাধ্যম সূত্র:

  • যুগান্তর — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • কালবেলা — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • লইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • প্রথম আলো — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ইত্তেফাক — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ঢাকা ট্রিবিউন (বাংলা) — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • সমকাল — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রাথমিক সূত্র:

  • হাইকোর্ট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — রিট মামলা (মো. রোমান ভূঁইয়া বনাম বাংলাদেশ)
  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় — ২২ আগস্ট ২০২৪ তারিখের স্মারক

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়। এই রায় নির্দিষ্ট মামলার প্রেক্ষিতে দেওয়া; সকল ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়। কোনো ব্যক্তিগত আইনি সমস্যার জন্য যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করুন।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.