সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতির মন্তব্যে উত্তপ্ত এজলাস, বিচারপতিরা কক্ষ ত্যাগ
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের মন্তব্যের জেরে আপিল বিভাগের এজলাসে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ এজলাস ত্যাগ করেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (মঙ্গলবার) দুপুর ১২টা থেকে ১২টা ৩০ মিনিটের মধ্যে আপিল বিভাগের এজলাস-১ কক্ষে এই ঘটনা ঘটে। এরপর ওই দিন আদালত আর বসেনি।
কী ঘটেছে?
জানা যায়, ওই দিন আপিল বিভাগে তথ্য গোপনের অভিযোগে এক মামলায় একজন নারী আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা খরচা আরোপ করা হয়। একই মামলার রিট আবেদনকারীকেও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এই টাকা ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আপিল বিভাগের কার্যতালিকার ১৩ নম্বর আইটেম শেষ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রধান বিচারপতির কাছে জরিমানার বিষয়ে মন্তব্য করেন。
খোকন কী বলেছিলেন?
ব্যারিস্টার খোকন সাংবাদিকদের বলেন, তিনি প্রধান বিচারপতিকে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, “আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আসলে মামলা-টামলা খুব একটা হচ্ছে না আপিল বিভাগে। আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।” পাশাপাশি তিনি জুনিয়র আইনজীবীর ৫ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের আবেদন করেন এবং বলেন, “একজন জুনিয়র আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাঁকে মাফ করে দেন।”
খোকন পরে ব্যাখ্যা করেন, তার উদ্দেশ্য ছিল আপিল বিভাগে বেঞ্চের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মামলা শুনানিতে যে ধীরগতি তৈরি হয়েছে, সেটি তুলে ধরা। তিনি বলেন, আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ও তিনটি বেঞ্চে নিয়মিত মামলা শুনানি হতো। এখন একটি বেঞ্চে মামলা শুনানি হওয়ায় হাজার হাজার মামলা পড়ে আছে।
বিচারপতিরা কেন এজলাস ছাড়লেন?
খোকনের এই মন্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি পাল্টা প্রশ্ন করেন। এক পর্যায়ে উভয়ের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কথোপকথন শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচ বিচারপতি এজলাস ত্যাগ করেন।
আপিল বেঞ্চে ওই সময় উপস্থিত ছিলেন — প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি।
খোকনের এই বক্তব্য “পুরোপুরি আদালত অবমাননার শামিল” বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আদালত কোনো আনুষ্ঠানিক রুলিং দেননি।
অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতি বিচারিক শৃঙ্খলা ও সততা প্রাধান্য দেন। তিনি বলেন, খোকন হয়তো আবেগের বশে মন্তব্য করেছেন এবং এই বিষয়টি এখানেই শেষ হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, এই বিষয়টি পুনরায় উত্থাপন করলে বিচার বিভাগ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠবে。
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশ সরকারের প্রধান আইনি উপদেষ্টা এবং সুপ্রিম কোর্টে সরকারের পক্ষে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন আইনজীবীদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষার সংগঠন। এর সভাপতি আইনজীবীদের পক্ষে আদালতে বক্তব্য রাখার অধিকারী।
আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, আদালতের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এই ঘটনায় আদালত এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেয়নি বা রুলিং দেয়নি। “আদালত অবমাননা” শব্দটি এখানে সংশ্লিষ্টদের অভিমত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
এই ঘটনার তাৎপর্য কী? আপিল বিভাগ দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এখানে বিচারপতিদের এজলাস ত্যাগ করা বিরল ঘটনা। এটি আদালত ও আইনজীবীদের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইনজীবীদের আয় কমার বিষয়টি কী? খোকনের দাবি অনুযায়ী, আপিল বিভাগে আগে তিনটি বেঞ্চ থাকলেও এখন একটি বেঞ্চে মামলা শুনানি হয়, ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগছে এবং আইনজীবীদের আয় কমছে।
পরবর্তী কী হবে? ঘটনার পর আদালত বসেনি। পরবর্তী শুনানির তারিখ বা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংক্ষেপে
- ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ আপিল বিভাগের এজলাসে ঘটনাটি ঘটে।
- সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আইনজীবীদের আয় কমার বিষয়ে মন্তব্য করেন।
- প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচ বিচারপতি এজলাস ত্যাগ করেন।
- অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, বিষয়টি এখানেই শেষ হওয়া উচিত।
- আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী আদালতের শৃঙ্খলা ভঙ্গ শাস্তিযোগ্য।
তথ্যসূত্র
মাধ্যম সূত্র:
- প্রথম আলো — ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- যুগান্তর — ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ইত্তেফাক — ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- কালবেলা — ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- এনটিভি — ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ঢাকা ট্রিবিউন (বাংলা) — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৬৪ (অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা)
- আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
