বিচারপতিদের জন্য ল’ ক্লার্কস নিয়োগের সুপারিশে কমিটি গঠনের নির্দেশ
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের জন্য আইনি গবেষণা সহায়ক বা ল’ ক্লার্কস-কাম-রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট নিয়োগের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিকে আগামী তিন মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১১ আগস্ট ২০২৬-এ একটি সম্পূরক আবেদনের শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন। আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির; তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ জীসান হায়দার।
মামলার পটভূমি
২০২৫ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন, আবদুল্লাহ সাদিক, মো. মিজানুল হক, আব্দুল ওয়াদুদ, রহিম উল্লাহ, আমিনুল ইসলাম শাকিল, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ, শিক্ষানবিশ আইনজীবী সাব্বির রহমান, মাহমুদুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষার্থী সাখাওয়াত জাকারিয়া, রাফিউল সাব্বির, শামিম সাহিদ এবং হাবিবুর রহমান আল হাসান — এই ১৩ জন একটি রিট দায়ের করেন।
রিটে ২০২১ সালের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (পারিতোষিক ও বিশেষাধিকার) আইন এবং ২০২৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (ছুটি, পেনশন ও বিশেষাধিকার) আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়। রিটকারীদের দাবি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। সংবিধানের ৯৪(৪) ও ১৪৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের আর্থিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সংবিধান-প্রদত্ত অধিকার। তবে আইন দুটিতে বেতন, পেনশন ও বিশেষাধিকার এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যা বাস্তবে বিচারকদের আর্থিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে।
প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ২৪ নভেম্বর ২০২৫-এ হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
সম্পূরক আবেদন
মূল রিটের ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট বিভাগের প্রত্যেক বিচারপতির জন্য অ্যাডহক বা চুক্তিভিত্তিক আইন সহকারী-কাম-গবেষণা সহযোগী (ল’ ক্লার্কস-কাম-রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট), গবেষণা কর্মকর্তা বা ইন্টার্ন নিয়োগের প্রক্রিয়া গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে গত ৯ আগস্ট ২০২৬-এ সম্পূরক আবেদনটি দায়ের করা হয়।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিপুল কর্মভার বহন ও মামলার উল্লেখযোগ্য জট মোকাবিলা সত্ত্বেও বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা কোনো নিবেদিত ল’ ক্লার্কস-কাম-রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, গবেষণা কর্মকর্তা বা গবেষণা ইন্টার্ন সহায়তা পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করা হয় আবেদনে।
আদালতের আদেশ
সম্পূরক আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন, আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের জন্য গবেষণা সহযোগী নিয়োগের সুপারিশ প্রণয়ন করবে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণীত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
আইনি প্রেক্ষাপট
সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বেতন, ছুটি, পেনশন ও বিশেষাধিকার সংক্রান্ত বিষয় পরিচালিত হয় ২০২১ ও ২০২৩ সালের দুইটি আইনের অধীনে। এই আইনগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা এখন হাইকোর্টে বিচারাধীন। রিটকারীদের দাবি, সংবিধানের ৯৪(৪) ও ১৪৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারকদের আর্থিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকা সত্ত্বেও এই আইনগুলোতে তা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিচারপতিদের জন্য গবেষণা সহযোগী বা ল’ ক্লার্কস নিয়োগের রীতি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান, জার্মানি, সিঙ্গাপুর ও পাকিস্তানসহ অনেক দেশে দীর্ঘদিনের। এসব দেশে রিসার্চ অ্যান্ড রেফারেন্স অফিসাররা বিচারকদের জন্য আইনি গবেষণা, নজির বিশ্লেষণ, তুলনামূলক আইন অধ্যয়ন, আন্তর্জাতিক রায় পর্যালোচনা, রায়ের খসড়া প্রস্তুতকরণ, আইনি স্মারক প্রস্তুতি ও মামলার সারসংক্ষেপ তৈরি করে থাকেন। বাংলাদেশে এখনো এই ব্যবস্থা চালু হয়নি।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
ল’ ক্লার্কস বা রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কী? এরা হলেন আইন স্নাতক বা আইনজীবী, যারা বিচারপতিদের জন্য আইনি গবেষণা, নজির খোঁজা, রায়ের খসড়া প্রস্তুত করা এবং মামলার সারসংক্ষেপ তৈরি করার কাজে সহায়তা করেন।
এই কমিটির কাজ কী? কমিটি সুপারিশ প্রণয়ন করবে যে হাইকোর্ট বিভাগের প্রত্যেক বিচারপতির জন্য কতজন ল’ ক্লার্কস বা গবেষণা সহযোগী নিয়োগ দেওয়া হবে, তাদের যোগ্যতা কী হবে, এবং কী প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হবে।
পরবর্তী কী হবে? কমিটি তিন মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট পরবর্তী আদেশ দেবেন। মূল রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি; মামলাটি রুল পর্যায়ে রয়েছে।
এই আদেশের তাৎপর্য কী? হাইকোর্ট বিভাগে বিপুল সংখ্যক মামলা বিচারাধীন। বিচারপতিরা প্রতিদিন অসংখ্য মামলা শোনেন এবং আদালতের সময়ের বাইরে গভীর রাত পর্যন্ত আইনি গবেষণা ও রায় লেখার কাজ করেন। গবেষণা সহযোগী নিয়োগ করা গেলে বিচারিক কার্যক্রমের গতিশীলতা ও গুণগত মানোন্নয়ন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংক্ষেপে
- হাইকোর্ট ১১ আগস্ট ২০২৬-এ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
- আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে কমিটি গঠিত হবে।
- কমিটি তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।
- মূল রিটে ২০২১ ও ২০২৩ সালের দুই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
- মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
তথ্যসূত্র
মাধ্যম সূত্র:
- প্রথম আলো — ১১ আগস্ট ২০২৬
- মুক্তকণ্ঠ — ১১ আগস্ট ২০২৬
- দৈনিক ইনকিলাব — ১৩ আগস্ট ২০২৬
- দেশকাল নিউজ — ১১ আগস্ট ২০২৬
- লইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — ৬ নভেম্বর ২০২৫
- ডেইলি নিউ নেশন — ২ আগস্ট ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (পারিতোষিক ও বিশেষাধিকার) আইন, ২০২১
- বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (ছুটি, পেনশন ও বিশেষাধিকার) আইন, ২০২৩
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৯৪(৪) ও ১৪৭(২)
- হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — সম্পূরক আবেদনের আদেশ
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
