এমএফএস সার্ভিস চার্জের বৈধতা প্রশ্নে হাইকোর্টের রুল, স্বতন্ত্র আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চাওয়া
বিকাশ, নগদ ও রকেটসহ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর আরোপ করা সার্ভিস চার্জ কেন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও আইনবিরোধী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তিসঙ্গত, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী সার্ভিস চার্জ নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র ‘মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস আইন’ প্রণয়নের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
গত ২৬ জুলাই ২০২৬ (রোববার) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। রুলে অর্থ সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং বিকাশ ও নগদের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে。
কী ঘটেছে?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. ওবায়দুল্লাহ আল মামুন সাকিব সচেতন গ্রাহক ও নাগরিক হিসেবে ১০ জুলাই ২০২৬-এ জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদনটি দায়ের করেন। আদালতে রিটের পক্ষে তিনি নিজেই শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ。
রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো স্বেচ্ছাচারী ও অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আদায় করছে। রিটে দাবি করা হয়, বর্তমান শতকরা ভিত্তিক ফি কাঠামো অসাংবিধানিক এবং এটি নির্দিষ্ট (ফিক্সড) লেনদেন চার্জ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা উচিত。
রুলে কী জানতে চাওয়া হয়েছে?
হাইকোর্টের রুলে দুটি প্রধান বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে:
- বিকাশ, নগদ ও রকেটের আরোপিত স্বেচ্ছাচারী ও অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ কেন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও ২০২২ সালের বাংলাদেশ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রবিধানমালার পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না।
- সার্ভিস চার্জ নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তিসঙ্গত, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে গ্রাহক সুরক্ষা ও কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা প্রবর্তনে একটি স্বতন্ত্র ‘মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস আইন’ প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না。
সার্ভিস চার্জের তুলনামূলক চিত্র
রিট আবেদনকারী আইনজীবী ওবায়দুল্লাহ আল মামুন সাকিব প্রথম আলোকে বলেন, “ব্যাংকের ক্ষেত্রে লেনদেনের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে (অঙ্কে) চার্জ নেওয়া হয়। অন্যদিকে বিকাশ, রকেট ও নগদ শতকরা হিসাবে এই চার্জ নিচ্ছে।”
চার্জের তুলনা
| লেনদেনের ধরন | ব্যাংক চার্জ | এমএফএস চার্জ |
|---|---|---|
| ১ লাখ টাকা লেনদেন | ১০–১৫ টাকা | ১,৪০০–১,৮০০ টাকা |
| ২৫,০০০ টাকা উত্তোলন (বাংলাদেশ) | — | ৩৭২.৫–৪৬২.৫ টাকা |
| ২৫,০০০ টাকা উত্তোলন (পাকিস্তান) | — | ৩৫৫.৭ টাকা |
| ২৫,০০০ টাকা উত্তোলন (মিয়ানমার) | — | ২৩১.৩ টাকা |
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, এমএফএস-এ গ্রাহকদের ব্যাংকের চেয়ে ৭ থেকে ১৫ গুণ বেশি সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। ২০২৪ সালে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে আনুমানিক সর্বোচ্চ ১০,১৯৭ কোটি টাকা সার্ভিস চার্জ হিসেবে আদায় করেছে।
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করে এবং ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এ ভোক্তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিধান রয়েছে।
বর্তমানে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয় ‘বাংলাদেশ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রবিধানমালা, ২০২২’-এর অধীনে। এই প্রবিধানমালার ১৬.১ ধারায় বলা হয়েছে, এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। তবে এই প্রবিধানমালায় সার্ভিস চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সীমা বা নীতিমালা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক, সেক্টরের প্রধান নিয়ন্ত্রক, এমএফএস অপারেটরদের নিজস্ব হার নির্ধারণের অনুমতি দেয়, শুধু জানানো প্রয়োজন — অনুমোদন নয়। এই শিথিল কাঠামোর কারণে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো স্বেচ্ছাচারীভাবে চার্জ আরোপ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
এমএফএস কী? মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হলো মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক সেবা প্রদানের একটি ব্যবস্থা, যার মধ্যে টাকা পাঠানো, গ্রহণ করা, বিল পরিশোধ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। বিকাশ, নগদ ও রকেট বাংলাদেশের প্রধান এমএফএস প্রতিষ্ঠান।
সার্ভিস চার্জ কেন বেশি? এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো শতকরা হারে চার্জ আরোপ করে, যেখানে ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে চার্জ নেয়। ফলে বড় লেনদেনে এমএফএস-এ অনেক বেশি চার্জ দিতে হয়।
স্বতন্ত্র আইন কেন প্রয়োজন? বিদ্যমান প্রবিধানমালা ভোক্তা সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। দরিদ্র ও ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তিসঙ্গত সার্ভিস চার্জ নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র আইন প্রয়োজন।
পরবর্তী কী হবে? বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে হবে। জবাব পাওয়ার পর আদালত শুনানি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।
সংক্ষেপে
- ২৬ জুলাই ২০২৬-এ হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
- বেঞ্চ: বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. রেজাউল করিম।
- রিটকারী: আইনজীবী ওবায়দুল্লাহ আল মামুন সাকিব (১০ জুলাই রিট দায়ের)।
- রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে: এমএফএস সার্ভিস চার্জ কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক নয়।
- স্বতন্ত্র ‘মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস আইন’ প্রণয়নের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
- ব্যাংকে ১ লাখ টাকায় খরচ ১০–১৫ টাকা, এমএফএস-এ ১,৪০০–১,৮০০ টাকা।
- টিআইবি: এমএফএস-এ ব্যাংকের চেয়ে ৭–১৫ গুণ বেশি চার্জ।
তথ্যসূত্র
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৩১, ৩২
- ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯
- বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২
- বাংলাদেশ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রবিধানমালা, ২০২২ — ধারা ১৬.১
- হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — রুলের আদেশ, ২৬ জুলাই ২০২৬
মাধ্যম সূত্র:
- প্রথম আলো — ২৬ জুলাই ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ২৬ জুলাই ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ২৬ জুলাই ২০২৬
- দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস — ২৬ জুলাই ২০২৬
- টিবিএস নিউজ — ২৬ জুলাই ২০২৬
- যুগান্তর — ২৭ জুলাই ২০২৬
- ইত্তেফাক — ২৬ জুলাই ২০২৬
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
