সম্পত্তি দান করলেও আজীবন ভোগের অধিকার: ট্রান্সফার অব প্রপার্টি সংশোধনী পাস
সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা ব্যক্তি জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করতে পারবেন — এমন বিধান যুক্ত করে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (রোববার) কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। এর আগে ২৭ আগস্ট ২০২৬-এ আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন।
আইনটি পাসের আগে ৩০ জুলাই ২০২৬-এ সচিবালয়ে আইনগত সহায়তা নিয়ে ব্র্যাক ও ব্লাস্টের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী এই উদ্যোগের কথা জানান। তিনি বলেন, “আমরা একটি আইন নিয়ে কাজ করছি। বাংলাদেশে অধিকাংশ দেওয়ানি মামলাই সম্পত্তির বণ্টন ও হিসাব-নিকাশসংক্রান্ত। তাই সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে কিছু পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেছি।”
নতুন কী বিধান যুক্ত হচ্ছে?
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টে নতুন ১২২ক (Section 122A) ও ১২২খ (Section 122B) ধারা সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়। এই বিধানের মাধ্যমে দাতা সম্পত্তি দান করলেও জীবিত থাকা পর্যন্ত ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার আইনি সুরক্ষা পাবে।
আইনমন্ত্রী সংসদে জানান, এই বিধান শুধু পিতা-মাতা, দাদা-দাদি বা নানা-নানির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতাকে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে দাতার ভোগের অধিকার বজায় থাকবে এবং পরবর্তীতে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, নতুন এই বিধান সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এর ফলে প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীনে হেবা কিংবা আইনস্বীকৃত অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না বা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করবে না।
নতুন ধারার মূল বিষয়বস্তু
| বিষয় | বিধান |
|---|---|
| প্রযোজ্য সম্পর্ক | পিতা-মাতা-সন্তান, দাদা-দাদি-নাতি-নাতনি, স্বামী-স্ত্রী |
| দাতার অধিকার | জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার |
| বিক্রয়ের শর্ত | বাবা-মা ও সন্তান উভয়ের সম্মতি প্রয়োজন |
| জরুরি অবস্থা | জেলা জজের অনুমতি সাপেক্ষে সম্পত্তি বিক্রয় |
| স্থাবর সম্পত্তি | নিবন্ধিত দলিল বাধ্যতামূলক |
বিরোধিতা ও আপত্তি
বিলটি পাসের সময় বিরোধী দল কুরআন-সুন্নাহবিরোধী উল্লেখ করে তীব্র বিরোধিতা করে এবং কিছুক্ষণের জন্য সংসদ কক্ষ ত্যাগ করে। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “এই আইনটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আনা হয়েছে বলে মনে করি। আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু আমাদের আপত্তির জায়গা হচ্ছে — যারা আল্লাহর বিধান মেনে চলেন তারা কীভাবে এই আইনটি দেখবেন।”
জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আইনটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা বলেছেন, নতুন সংশোধনীতে জীবনস্বত্ব রেখে হেবা করার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা মূলত অসিয়তের শামিল, যা শরীয়াহর দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
আইনমন্ত্রী এই বিরোধিতা প্রত্যাখ্যান করে ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ যশোরে বলেছেন, “হেবা আইনে স্পর্শ করার ক্ষমতা কারো নাই।” তিনি অভিযোগ করেন, “সংশোধনীর এই অংশটুকু না পড়েই কেউ কেউ বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “হেবা আইনসহ অন্য যেকোনো আইনের অধীনে দান, উইল বা অন্য কোনোভাবে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এই সংশোধনী কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।”
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে হেবা ও গিফট দুটি পৃথক ধারণা। হেবা হলো মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের একটি ধারণা, যেখানে ইজাব (প্রস্তাব), কবুল (গ্রহণ) ও কবজ (দখল) প্রয়োজন। অন্যদিকে গিফট হলো ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২-এর একটি বিধান, যা সম্পত্তি দানের একটি রাষ্ট্রীয় আইনি পদ্ধতি। নতুন সংশোধনী হেবার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়; বরং এটি গিফটের একটি নতুন রূপ সংযোজন করেছে।
মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭-এর ধারা ২ অনুযায়ী, মুসলিমদের ক্ষেত্রে উপহার বা দানের বিষয়ে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন প্রযোজ্য। নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ধারা ১৭(১)(এএ) অনুযায়ী মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীন হেবা ঘোষণাপত্রের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।
আইনমন্ত্রী বলেছেন, ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের আলোকে গিফটের বিধানকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই রায়ে গিফটের ক্ষেত্রে জীবনস্বত্ব সংরক্ষণের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
হেবা ও গিফটের পার্থক্য কী? হেবা মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের একটি ধারণা, যেখানে ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী সম্পত্তি দান করা হয়। গিফট হলো ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টের একটি বিধান, যা রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে সম্পত্তি দানের একটি পদ্ধতি। নতুন সংশোধনী গিফটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, হেবার ক্ষেত্রে নয়।
নতুন বিধান কাদের জন্য প্রযোজ্য? পিতা-মাতা-সন্তান, দাদা-দাদি-নাতি-নাতনি, নানা-নানি-নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে।
সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে কি? বাবা-মা ও সন্তান উভয়ের সম্মতি ছাড়া সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে না। তবে চিকিৎসা বা অন্য জরুরি প্রয়োজনে জেলা জজের কাছে আবেদন করে অনুমতি নেওয়া যাবে।
পরবর্তী কী হবে? বিলটি সংসদে পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হবে এবং গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কার্যকর হবে।
সংক্ষেপে
- ২৭ আগস্ট ২০২৬-এ বিল উত্থাপন; ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সংসদে পাস।
- ১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টে ১২২ক ও ১২২খ ধারা সংযোজন।
- দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের আইনি অধিকার সংরক্ষণ।
- সব ধর্মের মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
- বিরোধী দল ও ইসলামী দলগুলো শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আপত্তি জানিয়েছে।
- আইনমন্ত্রী বলেছেন, “হেবা আইনে স্পর্শ করার ক্ষমতা কারো নাই।”
- রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর আইনটি কার্যকর হবে।
তথ্যসূত্র
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ — নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা
- ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২
- মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭ — ধারা ২
- নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ — ধারা ১৭(১)(এএ)
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৪১
মাধ্যম সূত্র:
- প্রথম আলো — ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- বাসস (BSS) — ৩০ আগস্ট ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ৩০ জুলাই ২০২৬
- BBC বাংলা — ৪ আগস্ট ২০২৬
- NTV — ৩০ জুলাই ২০২৬ ও ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- সমকাল — ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- নিউ এজ — ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- বাংলাদেশ প্রতিদিন — ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- আমার দেশ — ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- মানবকণ্ঠ — ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
