সংবিধান সংশোধন: ১৪২ অনুচ্ছেদ, মৌলিক কাঠামো ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধনকে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংসদকে সংশোধনের ক্ষমতা দিলেও, মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব ও সাম্প্রতিক বিচারিক রায়গুলো সেই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে।
১৪২ অনুচ্ছেদ কী বলে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী:
- সংসদের আইন দ্বারা সংবিধানের যেকোনো বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের মাধ্যমে সংশোধন করা যায়
- সংশোধনের বিলটি অবশ্যই একটি দীর্ঘ শিরোনাম (long title) সহ উত্থাপন করতে হবে, যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করবে যে এটি সংবিধানের কোনো বিধান সংশোধন করবে
- বিলটি সংসদ সদস্যদের মোট সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের কম নয় এমন ভোটে পাস হতে হবে
- রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য উপস্থাপনের সাত দিনের মধ্যে সম্মতি দিতে হবে, অন্যথায় তা সম্মতি দেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হবে
সংবিধানে গণভোটের বিধান ও এর বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে সংবিধানে সরাসরি গণভোটের কোনো বিধান নেই। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদের উপ-ধারা (১ক) থেকে (১ঘ) এবং (২) বিলুপ্ত করা হয়, যা পূর্বে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোটের বিধান রেখেছিল।
তবে ২০২৬ সালের ৯ জুলাই আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর অংশবিশেষ বাতিল করে গণভোট পদ্ধতি পুনর্বহাল করেছেন। আদালতের এই রায় অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গণভোট আবার বাধ্যতামূলক হতে পারে।
মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব কী?
মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব (Basic Structure Doctrine) হলো সংবিধানের একটি বিচারিক ব্যাখ্যা, যা অনুযায়ী সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সীমাহীন নয়। সংবিধানের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা সংসদ পরিবর্তন করতে পারে না।
এই তত্ত্ব বাংলাদেশে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালের ৮ম সংশোধনী মামলায় (আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ, ৪১ DLR (AD) ১৬৫)। আপিল বিভাগের ৩:১ সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে বলা হয়, সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বিলুপ্ত করার ক্ষমতা তার নেই।
মৌলিক কাঠামোর উপাদান হিসেবে চিহ্নিত বিষয়গুলো:
- জনগণের সার্বভৌমত্ব
- গণতন্ত্র
- সংবিধানের সুপ্রিম কোর্টের এককতা
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
- মৌলিক অধিকার
২০২৪ সালে আপিল বিভাগ বদিউল আলম মজুমদার বনাম বাংলাদেশ মামলায় সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদকে অবৈধ ঘোষণা করেন। ৭খ অনুচ্ছেদ সংবিধানের কিছু বিধানকে “অপরিবর্তনীয়” ঘোষণা করেছিল, যা মৌলিক কাঠামো তত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আদালত মত দেন।
সাম্প্রতিক বিচারিক রায়সমূহ
ত্রয়োদশ সংশোধনী রিভিউ (২০ নভেম্বর ২০২৫)
আপিল বিভাগ ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর ঐতিহাসিক রায়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল করেন, যা ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করেছিল। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছিল। ২০২৫ সালের রায়ে আপিল বিভাগ সেই রায়কে “দূষিত” (tainted) বলে অভিহিত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করেন।
পঞ্চদশ সংশোধনী রায় (৯ জুলাই ২০২৬)
আপিল বিভাগ ২০২৬ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন, যা পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি অংশ বাতিল করেছিল। এই রায়ের ফলে:
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনর্বহাল
- গণভোট পদ্ধতি পুনর্বহাল
- সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল
- সংবিধানের ৪৪(২) অনুচ্ছেদে স্থগিতাদেশ
আদালত তার রায়ে বলেন, “সংশোধনের ক্ষমতা (amending power) কখনোই সংবিধান ধ্বংসের ক্ষমতা (destroying power) হতে পারে না।”
সংসদীয় বিশেষ কমিটির কার্যক্রম
২০২৬ সালের ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে বিরোধী দলের সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ১৭ সদস্যে পুনর্গঠনের বিধান রাখা হয়।
কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন:
- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (সভাপতি)
- চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি
- আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান
- জয়নুল আবেদীন, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফরজানা শারমিন, মাহমুদুল হক রুবেল, শাকিলা ফরজানা
- গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও স্বতন্ত্র সদস্য
কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করে সংসদে চূড়ান্ত রিপোর্ট উপস্থাপন করা হবে। কমিটি ইতিমধ্যে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটকে মতবিনিময়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তবে সব দল অংশ নেয়নি।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
১১ দলীয় ঐক্যের প্রতিক্রিয়া
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের নেতারা বলেন, “গণভোটে জনগণের দেওয়া গণরায় পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়।”
তাদের দাবি:
- জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে
- গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করতে হবে
- ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮.৫৯% ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে — যা জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট
জোটের মতে, “জনগণের ম্যান্ডেটের বিকল্প কোনো সংসদীয় বিশেষ কমিটি হতে পারে না।” তারা সতর্ক করেছে, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার করা হলে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সরকারের অবস্থান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, “সংবিধান সংশোধন হবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে, যাতে তা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করে।” তিনি জানান, জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কমিটি জুলাই সনদ প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সাবেক বিচারক, আইনজীবী, সংবিধানবিশেষজ্ঞ, জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলবে।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. সংবিধান সংশোধন কীভাবে হয়? — সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধন করা যায়। তবে মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না।
২. মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব কী? — সংবিধানের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য (গণতন্ত্র, জনগণের সার্বভৌমত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা) সংসদ পরিবর্তন করতে পারে না।
৩. ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ কী? — ৭ক বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করে; ৭খ কিছু বিধান অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করে। ৭খ ২০২৪ সালে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে।
৪. সাম্প্রতিক রায়গুলোর প্রভাব কী? — ত্রয়োদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনী রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট পদ্ধতি পুনর্বহাল হয়েছে।
৫. সংসদীয় কমিটি কী করছে? — ডিসেম্বরের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের খসড়া প্রস্তুতের লক্ষ্যে কাজ করছে।
সংক্ষেপে
সংবিধান সংশোধনে ১৪২ অনুচ্ছেদের শর্ত, মৌলিক কাঠামো তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা এবং সাম্প্রতিক বিচারিক রায়গুলো (ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল, পঞ্চদশ সংশোধনী রায়, ৭খ বাতিল) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংসদীয় বিশেষ কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে খসড়া প্রস্তুতের লক্ষ্যে কাজ করছে, তবে ১১ দলীয় ঐক্য সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংসদীয় পথকে চ্যালেঞ্জ করছে। সাংবিধানিক সংস্কার কার্যকর ও টেকসই করতে হলে আইনি বিধান, আদালতের নজির এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য — এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে।
তথ্যসূত্র
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- সংবিধান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ — অনুচ্ছেদ ৭, ৭ক, ৭খ, ১৪২
- আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ — ৪১ DLR (AD) ১৬৫ (৮ম সংশোধনী মামলা, ১৯৮৯)
- খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বনাম বাংলাদেশ — ৬২ DLR (AD) 298 (৫ম সংশোধনী মামলা, ২০১০)
- বাংলাদেশ বনাম আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী — ৬৯ DLR (AD) 87 (১৬তম সংশোধনী মামলা, ২০১৭)
- বদিউল আলম মজুমদার বনাম বাংলাদেশ — ৭২ DLR (AD) (২০২৪)
- ত্রয়োদশ সংশোধনী রিভিউ মামলা — আপিল বিভাগ, ২০ নভেম্বর ২০২৫
- পঞ্চদশ সংশোধনী মামলা — আপিল বিভাগ, ৯ জুলাই ২০২৬
সংবাদ সূত্র:
- বাসস — ১৩ জুলাই ২০২৬ (বিশেষ কমিটি গঠন)
- প্রথম আলো — ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (কমিটির সময়সীমা)
- যুগান্তর — ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (১১ দলীয় ঐক্যের প্রতিক্রিয়া)
- নিউএজ — ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি)
- স্টার নিউজ — ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (কমিটির আলোচনা)
- ডেইলি স্টার — ১০ জুলাই ২০২৬ (পঞ্চদশ সংশোধনী রায়)
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আইনি পরামর্শ নয়। সাংবিধানিক বিষয়ে আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন। এই নিবন্ধে উল্লেখিত আইন ও ধারাগুলো সময়ের সাথে সংশোধিত হতে পারে; সর্বশেষ সংশোধনী যাচাই করে নিন।
