পদত্যাগের পর সাহাবুদ্দিনের বিচার সম্ভব কিনা: সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা
সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিচার প্রসঙ্গে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ কোনো বাধা সৃষ্টি করে না বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। গত ২৬ জুলাই ২০২৬ (শনিবার) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে কিংবা কার্যভারকালে যদি তিনি ফৌজদারি অপরাধ করে থাকেন দায়িত্ব পালন শেষে অবশ্যই আইন অনুযায়ী তার বিচার করা যাবে। এক্ষেত্রে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে কোনো বাধা নেই।”
কী ঘটেছে?
২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। সংবিধান অনুযায়ী তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল। তবে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই গুরুতর অসুস্থতার কারণে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে কী বলা আছে?
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দুই ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে:
৫১(১) — দায়িত্বের কাজের জন্য সুরক্ষা: “রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বা সেই বিবেচনায় কোনো কাজ করলে কিংবা না করলে সেজন্য তাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না।” এই সুরক্ষা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের অংশ হিসেবে করা কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য — ব্যক্তিগত কাজের ক্ষেত্রে নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সুরক্ষা পদত্যাগের পরও বহাল থাকে।
৫১(২) — কার্যভারকালে ফৌজদারি সুরক্ষা: “রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা চালু রাখা এবং তাকে গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্য পরোয়ানা জারিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।” এই সুরক্ষা শুধুমাত্র কার্যভারকালে প্রযোজ্য। পদত্যাগ বা অপসারণের পর এই সুরক্ষা আর থাকে না।
৫১(৩) — দেওয়ানি কার্যধারার সুরক্ষা: রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ক্ষমতায় সম্পাদিত কোনো কার্য সম্পর্কে তার বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যধারা তার কার্যভারকালে দায়ের করা যায় না, যদি না দুই মাস পূর্বে লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়।
৫১(১) ও ৫১(২)-এর তুলনা
| বিষয় | ৫১(১) | ৫১(২) |
|---|---|---|
| সুরক্ষার ধরন | দায়িত্বের কাজের জন্য | ফৌজদারি কার্যধারা ও গ্রেপ্তার থেকে |
| সময়সীমা | স্থায়ী (পদত্যাগের পরও) | শুধু কার্যভারকালে |
| ব্যক্তিগত কাজ | প্রযোজ্য নয় | প্রযোজ্য নয় |
বিশেষজ্ঞদের মত
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, ৫১(২) কোনো সামগ্রিক দায়মুক্তি দেয় না। দুর্নীতি, ফৌজদারি অপরাধ বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ এই দায়মুক্তির আওতায় পড়ে না। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ৫১(১)-এর সুরক্ষা পদত্যাগের পরও বহাল থাকে, তবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের অংশ নয় এমন কোনো কাজ, দুর্নীতি বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো ফৌজদারি অপরাধ এই দায়মুক্তির আওতায় পড়বে না।
বিরোধী দলগুলোর দাবি
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পরপরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিরোধী দলগুলো তার গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানায়। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইনকিলাব মঞ্চ এই দাবি জানায়। এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ২৬ জুলাই ২০২৬-এ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অফিসে দুইটি অভিযোগ দায়ের করা হয়, যেখানে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ও আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তের দাবি জানানো হয়।
সরকারের অবস্থান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আইন অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে যে সময় দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই সময়ের জন্য তিনি সাংবিধানিক সুবিধা পাওয়ার অধিকারী এবং সেই সময়ের বিষয়ে ফৌজদারি কার্যধারার কোনো আলোচনা হতে পারে না।” তিনি জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী ছয় মাসের নিরাপত্তা সহায়তা পাবেন, যেখানে এসএসএফ ও পিজিআর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
আইনি প্রেক্ষাপট
সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের বিধান রয়েছে। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বাক্ষরযুক্ত নোটিশের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যায়। তবে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুধুমাত্র কার্যভারকালে প্রযোজ্য।
আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ অনেক দেশে রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য অনুরূপ সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে। তবে এই সুরক্ষা সাধারণত কার্যভারকালে সীমাবদ্ধ থাকে এবং অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণের পর সুরক্ষা আর প্রযোজ্য হয় না। বাংলাদেশে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের উদাহরণ রয়েছে, যিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণের পর দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়েছিলেন।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
সাংবিধানিক সুরক্ষা কী? সাংবিধানিক সুরক্ষা মানে হলো, সংবিধান কর্তৃক রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রদত্ত বিশেষ আইনি সুরক্ষা, যা তাকে তার দায়িত্ব পালনকালে বা দায়িত্বের অংশ হিসেবে করা কাজের জন্য আইনি জবাবদিহি থেকে রক্ষা করে।
পদত্যাগের পর কী সুরক্ষা থাকে? পদত্যাগের পর ৫১(২)-এর সুরক্ষা আর প্রযোজ্য হয় না। তবে ৫১(১)-এর সুরক্ষা — অর্থাৎ দায়িত্বের অংশ হিসেবে করা কাজের জন্য সুরক্ষা — পদত্যাগের পরও বহাল থাকে। তবে ব্যক্তিগত কাজ, দুর্নীতি বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ এই সুরক্ষার আওতায় পড়ে না।
পরবর্তী কী হবে? আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সরকার বলছে, অভিযোগের বিষয়ে তারা কোনো পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। বিষয়টি আদালতের ব্যাখ্যা ও তদন্তের ওপর নির্ভর করবে।
সংক্ষেপে
- ২৬ জুলাই ২০২৬-এ আইনজীবী শিশির মনির ফেসবুক পোস্টে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দেন।
- ৫১(১) দায়িত্বের কাজের জন্য সুরক্ষা দেয়, যা পদত্যাগের পরও বহাল থাকে।
- ৫১(২) শুধুমাত্র কার্যভারকালে ফৌজদারি কার্যধারা ও গ্রেপ্তার থেকে সুরক্ষা দেয়।
- মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই ২০২৬-এ অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন।
- বিরোধী দলগুলো তার গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছে।
- সরকার বলছে, অভিযোগের বিষয়ে তারা কোনো পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না।
- আইসিটি-তে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৫১(১), ৫১(২), ৫১(৩), ৫২
- সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির — ফেসবুক পোস্ট, ২৬ জুলাই ২০২৬
মাধ্যম সূত্র:
- প্রথম আলো — ২৫ জুলাই ২০২৬
- ইত্তেফাক — ২৬ জুলাই ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ২৫ জুলাই ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ২৬ জুলাই ২০২৬
- যুগান্তর — ২৭ জুলাই ২০২৬
- সমকাল — ২৫ জুলাই ২০২৬
- ডেইলি অবজার্ভার — ২৮ জুলাই ২০২৬
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
