অবসরে গেলেন আপিল বিভাগের বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম সংবিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় অবসরে গেছেন। বিদায়ী সংবর্ধনায় তিনি বলেন, বিচার বিভাগ কেবল বিচারক বা আইনজীবীদের নয়, এটি সবার প্রতিষ্ঠান। তার এই অবসরের ফলে আপিল বিভাগে বিচারক সংকট আরও তীব্র হয়েছে, যেখানে ৩৮ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন।
কে এই বিচারপতি?
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ১৯৫৯ সালের ১৫ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৩ সালে জেলা ও দায়রা আদালতে এবং ১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভের পর দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন ।
বিদায়ী সংবর্ধনা
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) ছিল তার কর্মদিবসের শেষ দিন। এদিন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ১ নম্বর এজলাসে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হয় ।
অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বক্তব্য দেন । অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতি এবং আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন ।
বিচারপতির বক্তব্য
বিদায়ী সংবর্ধনার জবাবে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, “বিচার বিভাগ কেবল বিচারক ও আইনজীবীদের নয়, এটি সবার প্রতিষ্ঠান। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সবাই মিলে বিচার বিভাগের অংশ। সবাই যদি বিচার বিভাগকে নিজের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে এর মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিচার বিভাগের শক্তি কোনো একক বিচারক বা আইনজীবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সবার সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের কল্যাণে বার ও বেঞ্চ একযোগে কাজ করবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।”
বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, “আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণ্ন থাকবে।”
নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সততা। এরপর তার চরিত্র এবং তারপর তার অধ্যয়ন। আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। আইনজ্ঞ হতে গেলে শেখার কোনো শেষ নেই।”
তিনি তার বিদায়ী ভাষণে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত সংগ্রামীদের স্মরণ করে তাদের অবদান জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উল্লেখ করেন । তিনি তার মরহুম পিতা সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম এবং সদ্যপ্রয়াত মাতা একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজুকে স্মরণ করেন ।
আপিল বিভাগে বিচারক সংকট
বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের অবসরের ফলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ মাত্র ৪ জন বিচারপতি দিয়ে আপিল বিভাগ চলছে ।
আপিল বিভাগে বর্তমানে ৩৮ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ২১ হাজার । বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে অন্তত দুটি বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন। এর জন্য আরও অন্তত ৮ জন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন ।
আপিল বিভাগের বর্তমান বিচারপতিরা হলেন — প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এসএম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. বিচারপতির অবসরের আইনি ভিত্তি কী? — সংবিধানের ৯৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর ।
২. আপিল বিভাগে বিচারক সংকটের প্রভাব কী? — মামলাজট বাড়বে এবং বিচার প্রক্রিয়া ধীর হবে।
৩. নতুন বিচারক নিয়োগের পদ্ধতি কী? — সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ দেন ।
৪. বিচারপতির বিদায়ী বক্তব্যের মূল বার্তা কী? — বিচার বিভাগ সবার প্রতিষ্ঠান; নবীন আইনজীবীদের সততা, চরিত্র ও অধ্যবসায়ের গুরুত্ব।
সংক্ষেপে
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ৬৭ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় আপিল বিভাগ থেকে অবসরে গেছেন। তার বিদায়ী ভাষণে তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনগণের আস্থা এবং নবীন আইনজীবীদের সততার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার অবসরের ফলে আপিল বিভাগে বিচারক সংকট আরও তীব্র হয়েছে, যেখানে ৩৮ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন। দ্রুত বিচারক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়েছেন।
তথ্যসূত্র
সংবাদ সূত্র:
- বাসস — ১৪ জুলাই ২০২৬
- কালবেলা — ১৪ জুলাই ২০২৬
- বাংলাদেশ প্রতিদিন — ১৪ জুলাই ২০২৬
- বাংলা ট্রিবিউন — ১৪ জুলাই ২০২৬
- যুগান্তর — ১৫ জুলাই ২০২৬
- দৈনিক ইনকিলাব — ১৫ জুলাই ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- সংবিধান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ — অনুচ্ছেদ ৯৪, ৯৫, ৯৬(১)
- সুপ্রিম কোর্টের অফিসিয়াল রেকর্ড — supremecourt.gov.bd
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আইনি পরামর্শ নয়। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
