তামিলনাড়ুতে গরু জবাই নিষেধাজ্ঞার আদেশে সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ
ভারতের তামিলনাড়ুতে গরু ও বাছুর জবাই নিষিদ্ধ করার মাদ্রাজ হাইকোর্টের ২৭ মে ২০২৬-এর আদেশে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। ১৩ জুলাই ২০২৬ সোমবার বিচারপতি বিক্রম নাথ ও সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ এই আদেশ দেন। এর ফলে আপাতত মাদ্রাজ হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে না।
সুপ্রিম কোর্ট কী আদেশ দিয়েছেন?
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৩ জুলাই ২০২৬ (সোমবার) মাদ্রাজ হাইকোর্টের ২৭ মে-র আদেশে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেন। বিচারপতি বিক্রম নাথ ও সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালত বলেন, হাইকোর্টের ওই আদেশে সংশোধন প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি তামিলনাড়ু রাজ্য সরকারের দায়ের করা বিশেষ লিভ পিটিশনে (এসএলপি) নোটিশ জারি করা হয়েছে।
হাইকোর্টের আদেশ কী ছিল?
মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারপতি জিআর স্বামীনাথন ও ভি লক্ষ্মীনারায়ণনের ডিভিশন বেঞ্চ ২৭ মে ২০২৬-এ ১৯৭৬ সালের একটি সরকারি আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে রাজ্যজুড়ে গরু ও বাছুর জবাই নিষিদ্ধ করার আদেশ দেন। ওই আদেশে বলা হয়, কোরবানি ঈদ বা অন্য যেকোনো দিনে তামিলনাড়ুতে কোনো গরু বা বাছুর জবাই করা যাবে না।
হাইকোর্ট তার রায়ে ভারতের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলেন, দুধ উৎপাদনকারী ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত গবাদিপশু সংরক্ষণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, গণপরিষদের বিতর্কেও গরুকে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
রাজ্য সরকারের যুক্তি
তামিলনাড়ু রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ লিভ পিটিশন দায়ের করে যুক্তি দেয় যে, হাইকোর্টের নির্দেশ বিদ্যমান আইনি কাঠামোর বাইরে চলে গেছে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী:
- তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮ অনুযায়ী ১০ বছরের বেশি বয়সী, কাজ বা প্রজননের জন্য অযোগ্য গরু নির্দিষ্ট সরকারি শংসাপত্র বা অনুমোদনের ভিত্তিতে জবাই করা যেতে পারে। এই আইনে গরু জবাইয়ের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কোনো বিধান নেই।
- অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের মধ্যে রয়েছে পশু নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন, ১৯৬০, পশু নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ (কসাইখানা) বিধিমালা, ২০০১, তামিলনাড়ু নগর স্থানীয় সংস্থা আইন, ১৯৯৮ এবং তামিলনাড়ু নগর স্থানীয় সংস্থা বিধিমালা, ২০২৩।
- মূল পিআইএল-এ শুধু নির্ধারিত কসাইখানায় পশু জবাই নিশ্চিত করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু হাইকোর্ট তার বাইরে গিয়ে রাজ্যজুড়ে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
মামলার পটভূমি
ইন্দু মাক্কাল কাচি-র যুব শাখার সম্পাদক কে. সুর্য প্রসাদ একটি জনস্বার্থ মামলা (পিআইএল) দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন, কোরবানি ঈদ উপলক্ষে কয়ম্বাটুরে অস্থায়ী শেড তৈরি করে গরু জবাই করা হচ্ছে। এই পিআইএল-এর ভিত্তিতেই মাদ্রাজ হাইকোর্ট ২৭ মে ২০২৬-এ রাজ্যজুড়ে গরু ও বাছুর জবাই নিষিদ্ধ করার আদেশ দেন।
আইনি প্রেক্ষাপট
তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮
এই আইন অনুযায়ী, ১০ বছরের বেশি বয়সী গরু — যা কাজ বা প্রজননের জন্য অযোগ্য — সক্ষম কর্তৃপক্ষের শংসাপত্র সাপেক্ষে জবাই করা যায়। আইনে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নেই।
ভারতের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ
এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র দুধ ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত গবাদিপশু জবাই নিষিদ্ধ করার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। মাদ্রাজ হাইকোর্ট এই অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
১৯৭৬ সালের সরকারি আদেশ
১৯৭৬ সালে তামিলনাড়ু সরকার দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের স্বার্থে একটি সরকারি আদেশ জারি করেছিল, যা কসাইখানায় গরু ও বাছুর জবাই নিষিদ্ধ করেছিল। মাদ্রাজ হাইকোর্ট এই আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।
সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপট
তামিলনাড়ুতে মুসলিম সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে ঈদুল আজহায় স্থানীয় আইন মেনে পশু কোরবানি দিয়ে আসছেন। একইভাবে রাজ্যের বিভিন্ন হিন্দু মন্দিরেও বার্ষিক উৎসব উপলক্ষে ধর্মীয় আচার অনুসারে পশু বলিদানের প্রথা রয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মতে, সব কোরবানি বা বলি কেবল লাইসেন্সপ্রাপ্ত কসাইখানায় সীমাবদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়, কারণ উৎসবের সময় জবাইখানাগুলোর সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. সুপ্রিম কোর্ট কী আদেশ দিয়েছেন? — হাইকোর্টের ২৭ মে-র আদেশে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ; চূড়ান্ত শুনানি বাকি।
২. হাইকোর্ট কী নির্দেশ দিয়েছিল? — ১৯৭৬ সালের সরকারি আদেশ বাস্তবায়ন করে রাজ্যজুড়ে গরু ও বাছুর জবাই নিষিদ্ধ।
৩. তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮ কী বলে? — ১০ বছরের বেশি বয়সী, কাজ বা প্রজননের অযোগ্য গরু শংসাপত্রসহ জবাইয়ের অনুমতি।
৪. কে আবেদন করেছিল? — তামিলনাড়ু রাজ্য সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়।
৫. ভবিষ্যতে কী হবে? — সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত শুনানি করে সিদ্ধান্ত দেবেন।
সংক্ষেপে
তামিলনাড়ুতে গরু ও বাছুর জবাই নিষিদ্ধ করার মাদ্রাজ হাইকোর্টের ২৭ মে ২০২৬-এর আদেশে ১৩ জুলাই ২০২৬ সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। বিচারপতি বিক্রম নাথ ও সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ এই আদেশ দেন। রাজ্য সরকার যুক্তি দিয়েছে, তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮ অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্তে গরু জবাইয়ের অনুমতি রয়েছে এবং হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আইনের বাইরে চলে গেছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
তথ্যসূত্র
সংবাদ সূত্র:
- এনডিটিভি — ১৩ জুলাই ২০২৬
- দ্য হিন্দু — ১৩ জুলাই ২০২৬
- নিউজ অন এয়ার — ১৩ জুলাই ২০২৬
- তেলেঙ্গানা টুডে — ১৩ জুলাই ২০২৬
- জুগান্তর — ১৩ জুলাই ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮
- ভারতের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ
- পশু নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন, ১৯৬০
- পশু নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ (কসাইখানা) বিধিমালা, ২০০১
- ১৯৭৬ সালের সরকারি আদেশ
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি ভারতের একটি আইনি বিষয় সম্পর্কিত প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশের আইনি পরামর্শ নয়। মামলাটি এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
