নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে নারী ডোম নিয়োগ চেয়ে হাইকোর্টে রিট
নারী মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য দেশের সব পোস্টমর্টেম সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে অন্তত একজন করে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট দায়ের করা হয়েছে। ১৯ জুলাই ২০২৬ রবিবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই বিষয়ে রুল জারি করেছেন।
হাইকোর্ট কী আদেশ দিয়েছেন?
নারী মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য দেশের পোস্টমর্টেম সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালগুলোতে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
রিটে কী বলা হয়েছে?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মনির উদ্দিন ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই (সোমবার) জনস্বার্থে এই রিটটি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় দায়ের করেন। রিটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে।
এর আগে তিনি ২০২৬ সালের ১৩ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে একটি আবেদন (রিপ্রেজেন্টেশন) দিয়েছিলেন। কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি ৩০ জুন রিটটি দায়ের করেন।
রিটের মূল যুক্তি
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নারীর মর্যাদা
রিটে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ রাষ্ট্র। ইসলাম ধর্মসহ দেশের প্রচলিত সব ধর্মেই নারীর মরদেহ সতর বা পর্দার অন্তরালে সম্মানজনকভাবে রাখার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। ময়নাতদন্ত একটি আইনি প্রক্রিয়া হলেও মৃত নারীর ক্ষেত্রে পর-পুরুষের স্পর্শ বা অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিবারের মানসিক স্বস্তি
রিটে উল্লেখ করা হয়, সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে কোনো নারীর মৃত্যু হলে তার পরিবার এমনিতেই শোকাহত থাকে। সে অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা যদি জানতে পারেন যে একজন পুরুষ ডোম পোস্টমর্টেম করবেন, তাহলে তাদের মানসিক কষ্ট আরও বাড়তে পারে। নারী ডোম নিয়োগ করা হলে এমন পরিস্থিতিতে পরিবার কিছুটা স্বস্তি অনুভব করবে।
লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীরা প্রায় সব পেশায় দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাই ময়নাতদন্তের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও নারী ডোম নিয়োগ সময়োপযোগী এবং বৈষম্য দূরীকরণে সহায়ক হবে।
মরদেহের মর্যাদা ও মানবাধিকার
রিটে মানবাধিকার ও মরদেহের মর্যাদা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। মৃত্যুর পরও একজন মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
পূর্ববর্তী ঘটনা
রিটে অতীতে দেশের কয়েকটি মর্গে নারী মরদেহের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে:
- ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য রাখা এক তরুণীর মরদেহের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগে আবু সাঈদ (১৯) নামে এক লাশবাহককে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয় এবং তিনি আদালতে অভিযোগ স্বীকার করেন।
- ২০২০ সালের নভেম্বর: শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে অনুরূপ অভিযোগে ডোমের সহযোগী মুন্না ভক্তকে (২০) গ্রেপ্তার করা হয়। সিআইডির তদন্তে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে অন্তত আটটি মরদেহের সঙ্গে যৌন প্রমাণ পাওয়া যায়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেথ ডগলাস নামে এক ব্যক্তির ১০০ মরদেহের সঙ্গে যৌনसंसर्गের ঘটনারও উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি প্রেক্ষাপট
সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ — ধর্মীয় স্বাধীনতা
এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় চেতনা ও বিবেকের স্বাধীনতা রয়েছে। নারীর মরদেহের মর্যাদা রক্ষা করা এই অধিকারের একটি অংশ।
সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদ — সম অধিকার
এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র নারী ও পুরুষের সম অধিকার নিশ্চিত করবে। ময়নাতদন্তের মতো পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ এই অধিকারেরই প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ
মৃত্যুর পরও একজন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষার অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (পিআইএল)
এই রিটটি একটি জনস্বার্থ মামলা, যেখানে একজন ব্যক্তি সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। আদালত রুল জারি করে সংশ্লিষ্টদের জবাব চেয়েছেন।
নারী ডোম নিয়োগের সম্ভাব্যতা
রিটে উল্লেখ করা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যে নারী ডোম নিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশে নারীদের সব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ছে — নার্স থেকে ডাক্তার পর্যন্ত। তাই সরকারি সার্কুলার জারি করা হলে অবশ্যই নারী ডোম পাওয়া যাবে।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. হাইকোর্ট কী আদেশ দিয়েছেন? — ১৯ জুলাই ২০২৬ রুল জারি; দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলেছেন।
২. রুল কী? — রুল হলো আদালতের একটি আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নির্দিষ্ট বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
৩. পিআইএল কী? — জনস্বার্থ মামলা; যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে গিয়ে সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে মামলা করা হয়।
৪. পূর্বে কী কী ঘটনা ঘটেছে? — ময়মনসিংহ (২০২৫) ও সোহরাওয়ার্দী (২০২০) মর্গে মৃত নারীর সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনা।
৫. পরবর্তী কী হবে? — দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব পাওয়ার পর আদালত পরবর্তী আদেশ দেবেন।
সংক্ষেপে
নারী মরদেহের ময়নাতদন্তে নারী ডোম নিয়োগের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট দায়ের করা হয়েছে। ১৯ জুলাই ২০২৬ বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের বেঞ্চ রুল জারি করেছেন এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলেছেন। রিটে ধর্মীয় অনুভূতি, পরিবারের মানসিক স্বস্তি, লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ ও মরদেহের মর্যাদার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। পূর্বে ময়মনসিংহ ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে মৃত নারীর সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনা ঘটেছে।
তথ্যসূত্র
সংবাদ সূত্র:
- প্রথম আলো — ১৩ জুলাই ২০২৬; ১৯ জুলাই ২০২৬
- লয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — ১৩ জুলাই ২০২৬
- যুগান্তর — ১৯ জুলাই ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ১৯ জুলাই ২০২৬
- ঢাকা ট্রিবিউন (বাংলা) — ১৩ জুলাই ২০২৬
- বাংলাদেশ প্রতিদিন — ১৯ জুলাই ২০২৬
- দৈনিক ইনকিলাব — ১৯ জুলাই ২০২৬
- চ্যানেল ২৪ — ২৩ অক্টোবর ২০২৫
- নিউ এজ — ১৭ অক্টোবর ২০২৫
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- সংবিধান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ — অনুচ্ছেদ ৪১, ২৮(১)
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ
- ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ — ধারা ১৭৪, ১৭৬
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আইনি পরামর্শ নয়। রিটটি এখনো বিচারাধীন এবং কোনো চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়নি। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
