সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতিকে ‘জুডিশিয়াল সার্ভেন্ট’ বলা আবেদনকারী গ্রেপ্তার
ভারতের সুপ্রিম কোর্টে শুনানিকালে বিচারপতিদের ‘জুডিশিয়াল সার্ভেন্ট’ বলে সম্বোধন, মামলার কাগজপত্র ছুড়ে ফেলা এবং প্রধান বিচারপতিকে অশালীন ভাষা ব্যবহারের ঘটনায় আবেদনকারী প্রভাল প্রতাপ সিং (২৪)-কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১৫ জুলাই ২০২৬ দিল্লি পুলিশ তাকে এবং আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে ১৪ দিনের জুডিশিয়াল কাস্টডিতে পাঠায়।
কী ঘটেছে?
গত ১০ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কোর্টরুম নং ১৩-তে এই ঘটনা ঘটে। বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথন ও বিচারপতি অলোক আরাধের বেঞ্চে প্রভাল প্রতাপ সিং পিটিশনার-ইন-পারসন হিসেবে নিজেই মামলা পরিচালনা করছিলেন।
তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন। মামলাটি BNSS-এর ১৭৩(৪) ধারার অধীনে করা একটি আবেদনকে প্রাইভেট কমপ্লেইন্ট মামলায় রূপান্তরের বিষয়ে ছিল।
শুনানির শুরুতেই প্রভাল প্রতাপ বেঞ্চকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “মি. জুডিশিয়াল সার্ভেন্ট, আমি আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছি এসিপি বিকাশ নাগরের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিন। কারণ আমি সার্বভৌম।” এ সময় বিচারপতি বিশ্বনাথন তার বক্তব্যের তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “আপনি কি আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন?”
এর কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আবেদনকারী এজলাসের ভেতরেই মামলার নথিপত্র ছুড়ে ফেলেন এবং প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে উদ্দেশ্য করে অশালীন মন্তব্য করেন। এতে আদালতকক্ষে সাময়িক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে তাকে আদালতকক্ষ থেকে সরিয়ে ডিএসপি অফিসে কিছুক্ষণ আটকে রাখেন।
বেঞ্চ কী বলেছে?
বেঞ্চ আদেশে উল্লেখ করে, “আবেদনকারী তার মামলা উপস্থাপনের পরিবর্তে অসংলগ্ন ও অশালীন মন্তব্য করেছেন। তবে আমরা তার অবস্থার কথা বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করছি না।”
পরে বিচারপতি বিশ্বনাথন মন্তব্য করেন, “তিনি খুবই বিশৃঙ্খল… এটি frustation। আমাদের শুধু তার প্রতি সহানুভূতি আছে।” আদালত এসএলপি খারিজ করে দেয় এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অবমাননার কার্যক্রম শুরু করে না।
গ্রেপ্তার ও এফআইআর
ঘটনার পর ১৫ জুলাই ২০২৬ দিল্লি পুলিশ প্রভাল প্রতাপ সিং (২৪) ও চন্দর ভান (২৩)-কে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১৩২ (সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা), ২২১ (সরকারি কর্মচারীকে বাধা) এবং ২২৪ (সরকারি কর্মচারীকে হুমকি) ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়।
পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, “আবেদনকারী ইচ্ছাকৃতভাবে অশালীন ও সংসদীয় ভাষার বাইরে গিয়ে কথা বলে, কাগজপত্র ছুড়ে ফেলে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বিচারিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটান। নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে গেলে তিনি তাদের ওপর বলপ্রয়োগ করেন।”
এসসিএওআরএ-র নিন্দা
সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেটস-অন-রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন (SCAORA) ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলে, “বিচারিক কার্যক্রমের মর্যাদা এবং বেঞ্চ, বার ও মামলাকারীদের পারস্পরিক সম্মান আইনের শাসনের ভিত্তি। বিচারিক প্রক্রিয়াকে অপব্যবহার করে প্রচার পাওয়া বা আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা গুরুতর অপরাধ।” সংগঠনটি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।
২০২৫ সালের ঘটনা
সুপ্রিম কোর্টে এ ধরনের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর আইনজীবী রাকেশ কিশোর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বি.আর. গাভাইয়ের বেঞ্চে শুনানিকালে জুতা ছুড়ে মারার চেষ্টা করেছিলেন। জুতা বিচারপতির গায়ে লাগেনি। পরে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন কিশোরকে বহিষ্কার করে এবং বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া তার লাইসেন্স স্থগিত করে। অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামণি ফৌজদারি অবমাননার জন্য সম্মতি দিলেও সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, এই ঘটনাকে তারা “স্বাভাবিক মৃত্যু” দিতে চায়, যাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও বিতর্ক তৈরি না হয়।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. আবেদনকারী কে? — প্রভাল প্রতাপ সিং (২৪), উত্তরপ্রদেশের ইটাওয়াহর বাসিন্দা।
২. কী ঘটেছে? — বিচারপতিদের ‘জুডিশিয়াল সার্ভেন্ট’ বলে সম্বোধন, কাগজ ছুড়ে ফেলা, সিজেআইকে অশালীন ভাষা।
৩. গ্রেপ্তার হয়েছে কি? — হ্যাঁ, ১৫ জুলাই ২০২৬; ১৪ দিনের জুডিশিয়াল কাস্টডি।
৪. এফআইআরের ধারা কী? — BNS ১৩২, ২২১, ২২৪।
৫. বেঞ্চ কী বলেছে? — “very disturbed”, “We only have sympathies for him”।
সংক্ষেপে
ভারতের সুপ্রিম কোর্টে শুনানিকালে বিচারপতিদের ‘জুডিশিয়াল সার্ভেন্ট’ বলে সম্বোধন, কাগজ ছুড়ে ফেলা এবং প্রধান বিচারপতিকে অশালীন ভাষা ব্যবহারের ঘটনায় প্রভাল প্রতাপ সিং (২৪)-কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বেঞ্চ তার বিরুদ্ধে কোনো অবমাননার কার্যক্রম শুরু না করলেও পরে পুলিশ তাকে ১৪ দিনের জুডিশিয়াল কাস্টডিতে পাঠায়। এসসিএওআরএ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবরও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।
তথ্যসূত্র
সংবাদ সূত্র:
- এনডিটিভি — ১০ জুলাই ২০২৬
- টাইমস অব ইন্ডিয়া — ১০ জুলাই ২০২৬
- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস — ১০ জুলাই ২০২৬
- দ্য হিন্দু — ১৫ জুলাই ২০২৬
- ইটিভি ভারত — ১১ জুলাই ২০২৬
- লাইভ ল — ১০ জুলাই ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) — ধারা ১৩২, ২২১, ২২৪
- ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS) — ধারা ১৭৩(৪)
- অবমাননা আদালত আইন, ১৯৭১ (ভারত)
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি ভারতের একটি আইনি বিষয় সম্পর্কিত প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশের আইনি পরামর্শ নয়। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
