সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও আজীবন ভোগের অধিকার: নতুন আইন পাস
সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা ব্যক্তি জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করতে পারবেন — এমন বিধান যুক্ত করে ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (রোববার) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। এর আগে ৩ আগস্ট ২০২৬ (সোমবার) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটির খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
নতুন কী বিধান যুক্ত হচ্ছে?
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টে দুটি নতুন ধারা — ১২২এ (Section 122A) এবং ১২২বি (Section 122B) — সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়। এই বিধানের মাধ্যমে দাতা সম্পত্তি দান করলেও জীবিত থাকা পর্যন্ত ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার আইনি সুরক্ষা পাবে।
আইনমন্ত্রী সংসদে জানান, এই বিধান শুধু পিতা-মাতা, দাদা-দাদি বা নানা-নানির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতাকে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে দাতার ভোগের অধিকার বজায় থাকবে এবং পরবর্তীতে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, নতুন এই বিধান সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এর ফলে প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীনে হেবা কিংবা আইনস্বীকৃত অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না বা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করবে না।
কেন এই আইন আনা হচ্ছে?
আইনমন্ত্রীর উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, প্রচলিত আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি থাকলেও দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দানের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধান ছিল না। বিদ্যমান হেবা বা অন্যান্য উপায়ে সম্পত্তি দানের ফলে দাতা তাৎক্ষণিকভাবে তার স্বত্ব হারাতেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা বা বয়োবৃদ্ধরা সন্তান বা নিকটাত্মীয়দের জমি বা ঘরবাড়ির মালিকানা হস্তান্তর করার পর নিজেদের সম্পত্তিতে অধিকার হারিয়ে চরম আর্থিক ও সামাজিক অসহায়ত্বের মুখোমুখি হতেন। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই জটিলতার একটি স্থায়ী আইনি ভিত্তি ও সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়েছে।
সংসদে বিরোধিতা
বিলটি পাসের সময় বিরোধী দল কুরআন-সুন্নাহবিরোধী উল্লেখ করে তীব্র বিরোধিতা করে এবং কিছুক্ষণের জন্য সংসদ কক্ষ ত্যাগ করে। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “এই আইনটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আনা হয়েছে বলে মনে করি। আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু আমাদের আপত্তির জায়গা হচ্ছে — যারা আল্লাহর বিধান মেনে চলেন তারা কীভাবে এই আইনটি দেখবেন।”
বিল পাসের পর জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আইনটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানায়। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, নতুন বিধানগুলো হেবা, ওসিয়ত ও ফারায়েজের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা তা সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আইনি প্রেক্ষাপট
১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত মূল আইন। এতে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি — বিক্রয়, দান, বিনিময়, ইজারা ইত্যাদি — বর্ণিত। নতুন সংশোধনের মাধ্যমে এই আইনে ‘লাইফটাইম ইউসুফ্রাক্ট’ বা জীবনকালীন ভোগাধিকারের ধারণা যুক্ত হচ্ছে।
মুসলিম আইনে সম্পত্তি দানকে হেবা বলা হয়। হেবার ক্ষেত্রে দাতা সম্পত্তির মালিকানা সম্পূর্ণভাবে গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করেন। নতুন আইনে হেবার সঙ্গে একটি অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত হচ্ছে — দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করতে পারবেন।
আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশে ‘লাইফ এস্টেট’ বা ‘ইউসুফ্রাক্ট’ ধারণা প্রচলিত। বাংলাদেশে এই প্রথম এই ধারণাকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
ইউসুফ্রাক্ট বা জীবনকালীন ভোগাধিকার কী? ইউসুফ্রাক্ট হলো এমন একটি অধিকার, যেখানে সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার কাছে থাকলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার retain করেন।
হেবার সঙ্গে পার্থক্য কী? হেবায় দাতা সম্পত্তির মালিকানা সম্পূর্ণভাবে গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করেন এবং দাতার কোনো অধিকার থাকে না। নতুন আইনে দাতা মালিকানা হস্তান্তর করলেও ভোগাধিকার retain করতে পারেন।
এই আইন কাদের জন্য প্রযোজ্য? পিতা-মাতা-সন্তান, দাদা-দাদি-নাতি-নাতনি, নানা-নানি-নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে।
পরবর্তী কী হবে? বিলটি সংসদে পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হবে এবং গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কার্যকর হবে।
সংক্ষেপে
- ৩ আগস্ট ২০২৬-এ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন; ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সংসদে পাস।
- ১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টে ১২২এ ও ১২২বি ধারা সংযোজন।
- দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের আইনি অধিকার retain করতে পারবেন।
- সব ধর্মের মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
- বিরোধী দল ও ইসলামী দলগুলো শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আপত্তি জানিয়েছে।
- রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর আইনটি কার্যকর হবে।
তথ্যসূত্র
মাধ্যম সূত্র:
- প্রথম আলো — ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ইত্তেফাক — ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- আমার দেশ — ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- দৈনিক আজাদী — ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ২৭ আগস্ট ২০২৬
- বাসস — ২৭ আগস্ট ২০২৬
- ডেইলি অবজার্ভার — ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- সত্যনিউজ — ৩ আগস্ট ২০২৬
- এশিয়ান এজ — ৩ আগস্ট ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২
- দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬ — ১২২এ ও ১২২বি ধারা
- জাতীয় সংসদ — বিল পাসের নথি
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
