গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬: সংসদে পাস, শাস্তি ও সীমাবদ্ধতা
গুমের অপরাধ দমনে নতুন আইনি কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ হিসেবে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (রোববার) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রণীত এই আইনে গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিভিন্ন শাস্তি ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনটি ২০২৬ সালের ১০৭ নম্বর আইন হিসেবে পাস হয়েছে।
এর আগে ৩ আগস্ট ২০২৬ (সোমবার) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৫তম বৈঠকে আইনটির খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়。
আইনের মূল বিধান
প্রস্তাবিত আইনে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
শাস্তির বিধান (সারণি)
| অপরাধ | শাস্তি |
|---|---|
| সাধারণ গুম | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড |
| গুমের ফলে মৃত্যু, মরদেহ উদ্ধার, বা ৫ বছর পরেও জীবিত-মৃত অবস্থায় খুঁজে না পাওয়া | মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানা |
আইনের উদ্দেশ্য হিসেবে মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গুম প্রতিরোধ, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান নিশ্চিত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত ও বিচার
আইনে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে উভয় প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে আইনটি তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছেই রেখেছে। কোনো স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা গঠনের বিধান এতে নেই। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই দিকটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে。
আইনে আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি করে গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক থাকলেও বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ, ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের বিধান এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে。
ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন
ভুক্তভোগীদের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপশি সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য পৃথক তহবিল গঠন, দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা এবং তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধানও রাখা হয়েছে。
গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের ভরণপোষণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যাবে। এছাড়া গুমের পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের উদ্দেশ্যে গুম সনদ প্রদান, একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও উদ্বেগ
জাতিসংঘের ‘সকল ব্যক্তির জোরপূর্বক গুম থেকে সুরক্ষা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ (ICPPED)-এর ২ অনুচ্ছেদে গুমের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নতুন আইনের সংজ্ঞা ICPPED-এর সঙ্গে আংশিক সঙ্গতিপূর্ণ। তবে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে’ অভিযোগ ওঠার পর ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হওয়ার আগ পর্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষার একটি বিধান রাখা হয়েছে, যা কনভেনশনের ১(২) ও ১৭(১) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে বলেছে, নতুন আইনগুলো ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থা বাতিল করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যার মধ্যে গুম প্রতিরোধ, তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন আইন কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব এবং তদন্তের ক্ষমতা দুর্বল করার অভিযোগ এনেছে এইচআরডব্লিউ।
এছাড়া অতীতে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর বিচার নিশ্চিত করার জন্য নতুন আইনে কোনো সুস্পষ্ট সেতু তৈরি করা হয়নি বলেও সমালোচনা রয়েছে।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
স্বতন্ত্র অপরাধ মানে কী? ‘স্বতন্ত্র অপরাধ’ মানে হলো, গুমকে আলাদা একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগে গুমের ঘটনাগুলো অপহরণ, আটক বা খুনের মতো অপরাধের আওতায় বিচার হতো। এখন গুমের নিজস্ব সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান রয়েছে।
জামিন-অযোগ্য মানে কী? জামিন-অযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি সাধারণত জামিন পান না। আদালত বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন গুরুতর অসুস্থতা) জামিন দিতে পারেন, তবে সাধারণত গুমের মতো গুরুতর অপরাধে জামিন দেওয়া হয় না।
আপস-অযোগ্য মানে কী? আপস-অযোগ্য অপরাধে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের মধ্যে আপস বা সমঝোতার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি করা যায় না। গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ আপসের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা যাবে না।
তদন্ত কে করবে? আইন অনুযায়ী, তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর। স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা গঠনের বিধান নেই। এটি আইনের একটি বড় সীমাবদ্ধতা বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করছে।
পরবর্তী কী হবে? বিলটি সংসদে পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হবে এবং গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কার্যকর হবে।
সংক্ষেপে
- ৩ আগস্ট ২০২৬-এ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন; ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সংসদে পাস।
- গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি।
- গুমের সাধারণ অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড; মৃত্যু বা ৫ বছর নিখোঁজ থাকলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানা।
- তদন্ত ও বিচার ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য।
- স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা নেই; তদন্ত পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর হাতে।
- রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গোপনীয়তার বিধান নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।
- ক্ষতিপূরণ তহবিল, পুনর্বাসন, গুম সনদ, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধান।
তথ্যসূত্র
মাধ্যম সূত্র:
- বাসস (BSS) — ৩ আগস্ট ২০২৬
- বাসস (BSS) — ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- যুগান্তর — ৪ আগস্ট ২০২৬
- প্রথম আলো — ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ৪ আগস্ট ২০২৬
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ৩ আগস্ট ২০২৬
- নিউ এজ — ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- বাংলাদেশ প্রতিদিন — ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ১০৭ নং আইন)
- গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ (২০২৬ সনের ০৬ নং অধ্যাদেশ)
- গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ (২০২৫ সনের ৭৩ নং অধ্যাদেশ)
- জাতিসংঘের ICPPED — অনুচ্ছেদ ২, ১৭, ২৪
- OMCT-এর বিশ্লেষণ — ‘Analysis of the Draft Prevention and Remedy of Enforced Disappearance Act, 2026’
- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ — বিবৃতি, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
