বিচারকের স্বাক্ষর-সিল জাল করে ভুয়া বিয়ের হলফনামা, কোতোয়ালি থানায় মামলা

ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের এক বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে ভুয়া বিয়ের হলফনামা তৈরি এবং সেই জাল নথি ব্যবহার করে মামলা দায়েরের চেষ্টার অভিযোগে তিনজনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে একজন আইনজীবীও রয়েছেন।

কী ঘটেছে?

রোববার (১৯ জুলাই ২০২৬) ঢাকার সিএমএম আদালতের নেজারত বিভাগের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. খালিদ হোসেন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় এই মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে সুনির্দিষ্ট তিনজনকে আসামি করা হয়েছে — মো. নয়ন, মোসা. রিমা এবং আইনজীবী মো. তরিকুল ইসলাম (তরু) ফরাজী। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

আদালতে কী হয়েছে?

এজাহার অনুযায়ী, গত ১৮ জুলাই (শনিবার) ঢাকার ১১ নম্বর আদালতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলামের মৌখিক নির্দেশে মো. নয়ন ও ফাহিমা ইসলাম রিয়া নামে এক দম্পতির বিয়ের হলফনামা আদালতের সংরক্ষিত রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

যাচাইয়ের সময় দেখা যায়, হলফনামায় ব্যবহৃত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের ৩০ নম্বর স্মারকটি আদালতের মূল রেজিস্টার খাতায় প্রকৃতপক্ষে মো. জাফরুল ইসলাম নামের অন্য এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিরা ওই ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে একটি ভুয়া হলফনামা তৈরি করেন। পরে সেই জাল নথি ব্যবহার করে বরগুনার বামনা আমলি আদালতে একটি সিআর (নালিশি) মামলা করার চেষ্টা করা হয়।

বরগুনার আদালতের পদক্ষেপ

বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আরিফ হোসাইন নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জালিয়াতির বিষয়টি শনাক্ত করেন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৩ ধারায় অভিযোগটি খারিজ করে দেন।

আসামিপক্ষের বক্তব্য

এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে যে তারা সংঘবদ্ধভাবে আদালতের নাম, বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। জাল নথি তৈরি ও ব্যবহারের মাধ্যমে তারা প্রতারণা ও জালিয়াতির অপরাধ করেছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে আসামিপক্ষের বক্তব্য এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পাওয়া যায়নি। মামলাটি এখনও তদন্তাধীন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য

মামলার বাদী মো. খালিদ হোসেন বলেন, “আসামিরা ১১ নম্বর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারকের সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতি করে হলফনামা তৈরি করেছেন। আদালতে যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে দেখা যায়, সেটি অন্য নামে অন্তর্ভুক্ত করা। আদালতের নির্দেশে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে।”

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম রবিউল ইসলাম তথ্য নিশ্চিত করে জানান, মামলাটি নথিভুক্ত হয়েছে এবং উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আইনি প্রেক্ষাপট

“কোর্ট ম্যারেজ” কী এবং কেন এটি আইনি ভিত্তিহীন?

বাংলাদেশে “কোর্ট ম্যারেজ” নামে কোনো স্বতন্ত্র বিয়ের বিধান নেই। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর ৩ ধারা অনুযায়ী, মুসলিম আইনে সম্পাদিত প্রতিটি বিবাহ অবশ্যই সরকার-নিযুক্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে।

প্রচলিতভাবে যাকে “কোর্ট ম্যারেজ” বলা হয়, তা আসলে একটি হলফনামা — যা নোটারি পাবলিক বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সম্পাদিত হয়। এই হলফনামা বিয়ের আইনি প্রমাণ নয়; এটি কেবল পক্ষদের সম্মতির একটি ঘোষণা। বিয়ে নিবন্ধন বা কাবিননামাই হলো বিবাহের প্রধান আইনি দলিল।

মনে রাখা জরুরি: রেজিস্ট্রেশন না থাকলেও মুসলিম বিবাহ সম্পূর্ণ বাতিল হয় না (হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী), তবে আইনি জটিলতা তৈরি হয় এবং বিবাহের প্রমাণে অতিরিক্ত দায়িত্ব আসে।

জাল দলিল তৈরি ও ব্যবহারের শাস্তি

এই মামলায় দণ্ডবিধির ৪৬৫ (জালিয়াতি), ৪৬৬ (মূল্যবান দলিল জাল), ৪৬৮ (প্রতারণার উদ্দেশ্যে জাল), ৪৭১ (জাল দলিল আসল হিসেবে ব্যবহার) এবং ১০৯ (অপরাধে প্ররোচনা) ধারায় মামলা করা হয়েছে।

  • ৪৬৫ ধারা: জালিয়াতির শাস্তি — সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, বা জরিমানা, বা উভয়ই।
  • ৪৬৬ ধারা: মূল্যবান দলিল জালের শাস্তি — সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড।
  • ৪৬৮ ধারা: প্রতারণার উদ্দেশ্যে জাল দলিল তৈরির শাস্তি — সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড।
  • ৪৭১ ধারা: জাল দলিল আসল হিসেবে ব্যবহারের শাস্তি — সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড।

মামলার বর্তমান অবস্থা

মামলাটি 현재 তদন্তাধীন। কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করছেন। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

১. বিয়ে নিবন্ধন করুন: মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিবাহ নিবন্ধন করুন। শুধু হলফনামা বা “কোর্ট ম্যারেজ”-এর উপর নির্ভর করবেন না।

২. নোটারি হলফনামা বিয়ের প্রমাণ নয়: কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি বলে “কোর্ট ম্যারেজ” করে দেওয়া হবে, তবে তা প্রতারণা হতে পারে। বাংলাদেশে এই ধরনের কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই।

৩. সন্দেহ হলে যাচাই করুন: বিবাহের কাবিননামা বা নিবন্ধন সনদ যাচাই করুন। কাজীর লাইসেন্স নম্বর ও নিবন্ধন বইয়ে এন্ট্রি আছে কি না, তা দেখুন।

৪. প্রতারণার শিকার হলে: স্থানীয় থানায় বা সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগ করুন। জাল দলিল তৈরি ও ব্যবহার গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।

সংক্ষেপে

ঢাকার সিএমএম আদালতের এক বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে ভুয়া বিয়ের হলফনামা তৈরির অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন। এই ঘটনা “কোর্ট ম্যারেজ” নামে পরিচিত প্রতারণার একটি উদাহরণ, যা থেকে সাধারণ মানুষের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র

সংবাদ সূত্র:

  • প্রথম আলো — ২০ জুলাই ২০২৬
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ২০ জুলাই ২০২৬
  • আমার দেশ — ১৯ জুলাই ২০২৬
  • লয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — ২০ জুলাই ২০২৬
  • যুগান্তর — ২৮ জুলাই ২০২৬

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • কোতোয়ালি থানার এজাহার (মামলার নথি)
  • মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪
  • দণ্ডবিধি, ১৮৬০ — ধারা ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৮, ৪৭১, ১০৯

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। মামলাটি এখনও তদন্তাধীন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.