কুষ্টিয়া বারে ৯০ দিনের জন্য সিরাজ প্রামাণিকের সদস্যপদ বাতিল

আদালতের সঙ্গে অসদাচরণ ও পেশাগত নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত; অভিযুক্ত আইনজীবীর দাবি, তিনি আইনগতভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করবেন।

কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতি আদালতের সঙ্গে অসদাচরণ এবং পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচারবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকের সদস্যপদ ৯০ দিনের জন্য বাতিল করেছে। সমিতির তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার বিকেলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে অভিযুক্ত আইনজীবীর কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হলেও তার জবাব সন্তোষজনক নয় বলে সমিতি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৭ জুলাই। ওই দিন কুষ্টিয়ার যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয় আদালতে একটি মাদক মামলার কার্যক্রম চলাকালে আদালতের বিচারকের ওপর অসত্য তথ্য গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগের চেষ্টা এবং আদালতের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনজীবী সমিতি বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেয় এবং অভিযুক্ত আইনজীবীর কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চায়।

সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, অভিযুক্ত আইনজীবীর ব্যাখ্যা যৌক্তিক ও সন্তোষজনক নয়। বরং তার বক্তব্যে পেশাগত শিষ্টাচারের পরিপন্থী মনোভাবের প্রতিফলন পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটির কাছে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান হওয়ায় সমিতির জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে ৯০ দিনের জন্য সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম শাতিল মাহমুদ বলেন, বিচারিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আইনসম্মত প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই পথ অনুসরণ না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারককে নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচারবিধির লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত আইনজীবীর বক্তব্যে আদালত ও বিচার বিভাগের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গুরুতর ব্যত্যয় দেখা গেছে।

সদস্যপদ বাতিলের নোটিশে উল্লেখ করা হয়, একজন আইনজীবীর দায়িত্ব আদালতের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল থাকা। সেখানে ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারককে নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য এবং বিচারক দম্পতিকে ঘিরে পারিবারিক ও ধর্মীয় বিষয় উল্লেখ করে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলে সমিতি মনে করে। নোটিশের অনুলিপি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনজীবী সমিতির এক নেতা দাবি করেন, অভিযুক্ত আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত চত্বরে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়েতে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত বা বিচারিক নিষ্পত্তির তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

ঘটনার পটভূমিতে আদালতে উপস্থিত রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী কৌঁসুলি খোন্দকার নাজমুল হক জানান, ২০২০ সালের একটি মাদক মামলার আসামি দীর্ঘদিন আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আসামির আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করেন। এ সময় আদালতের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা ও অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটে বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত আইনজীবী সিরাজ প্রামাণিক নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, বিচারকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সমিতি তার ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং প্রয়োজনে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

এই সিদ্ধান্ত আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতা, আদালতের মর্যাদা এবং বিচার বিভাগের প্রতি দায়িত্ব পালনের প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি এখন আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরবর্তী পর্যায়ে এগোবে।