মৃত্যু, পদত্যাগ বা অভিশংসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধান অনুযায়ী কীভাবে দায়িত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই শূন্য হলে সংবিধান এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে। রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ বা সংসদের মাধ্যমে অভিশংসনের ফলে পদ শূন্য হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্পিকার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে ডেপুটি স্পিকার সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হয়। এ ক্ষেত্রে স্পিকারের পদত্যাগ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার কোনো সাংবিধানিক ক্ষমতা বা বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ, পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার জন্য আলাদা কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না।
একই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে। এছাড়া রাষ্ট্রপতির মৃত্যু হলেও পদটি শূন্য হয়ে যায়। সংবিধান এই তিনটি পরিস্থিতিকেই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্পিকার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে ডেপুটি স্পিকার সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কোনো শূন্যতা সৃষ্টি না হওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সংবিধান নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না; সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো অব্যাহত থাকে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদ মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই একাধিকবার শূন্য হয়েছে। ১৯৭৫ সালে জাতির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এছাড়া বিচারপতি আবদুস সাত্তারের অপসারণ, এরশাদ সরকারের পতনের সময় নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি এ.কিউ.এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের ঘটনাও রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন বা ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা নয়।
সংবিধান রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখেই দায়িত্ব হস্তান্তর, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নিয়োগ এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুস্পষ্ট বিধান নির্ধারণ করেছে। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ঘটনা হলেও, সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করে না। রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই এসব বিধানের মূল উদ্দেশ্য।