রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কী হয়: সংবিধানের স্পষ্ট প্রক্রিয়া

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই শূন্য হলে সংবিধান এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে। রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ বা সংসদের মাধ্যমে অভিশংসনের ফলে পদ শূন্য হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্পিকার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে ডেপুটি স্পিকার সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

পদত্যাগ ও অভিশংসনের সাংবিধানিক ভিত্তি

সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হয়। এ ক্ষেত্রে স্পিকারের পদত্যাগ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার কোনো সাংবিধানিক ক্ষমতা বা বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ, পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার জন্য আলাদা কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না।

অভিশংসনের প্রক্রিয়া সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত। সংসদ সদস্যদের কমপক্ষে এক-চতুর্থাংশের স্বাক্ষরযুক্ত নোটিশের ভিত্তিতে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। নোটিশে অভিযোগের বিবরণ থাকতে হয়। অভিশংসন প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপিত হওয়ার পর স্পিকার সাত দিনের মধ্যে সেটি সংসদে পাঠান। অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের প্রস্তাব পাস হয়।

সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তির বিধান রয়েছে। ৫১(১) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালনকালে করা বা না করার জন্য কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন। ৫১(২) অনুযায়ী, কার্যভারকালে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা চালু রাখা যাবে না এবং তাকে গ্রেপ্তার বা আটক করার জন্য কোনো আদালত থেকে পরোয়ানা জারি করা যাবে না।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব

রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ক্ষেত্রমত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করিবেন।”

স্পিকার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে ডেপুটি স্পিকার সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে ডেপুটি স্পিকারের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই; সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকা নির্ধারিত। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কোনো শূন্যতা সৃষ্টি না হওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না; সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।”

রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এই সময়সীমা বাধ্যতামূলক, যাতে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো অব্যাহত থাকে।

ঐতিহাসিক উদাহরণ

সালঘটনাপরবর্তী প্রক্রিয়া
১৯৭৫রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহতসাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা
১৯৮১রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহতউপ-রাষ্ট্রপতি ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন
১৯৮২বিচারপতি আবদুস সাত্তারের অপসারণসামরিক নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ
১৯৯০এরশাদ সরকারের পতনঅন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা
২০০২এ.কিউ.এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগস্পিকার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন
২০২৬মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগস্পিকার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন; ২০ আগস্ট নির্বাচন

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদ মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই একাধিকবার শূন্য হয়েছে। ১৯৭৫ সালে জাতির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এছাড়া বিচারপতি আবদুস সাত্তারের অপসারণ, এরশাদ সরকারের পতনের সময় নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি এ.কিউ.এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের ঘটনাও রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

সর্বশেষ, ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যগত কারণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০ আগস্ট ২০২৬-এ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার গুরুত্ব

সংবিধান রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখেই দায়িত্ব হস্তান্তর, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নিয়োগ এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুস্পষ্ট বিধান নির্ধারণ করেছে। ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ঘটনা হলেও, সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করে না। রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই এসব বিধানের মূল উদ্দেশ্য।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি কী? সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

অভিশংসন কী? সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের প্রক্রিয়া। এটি সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত।

কত দিনে নির্বাচন? সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদ শূন্য হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।

২০২৬ সালে কী ঘটেছে? ২৪ জুলাই ২০২৬-এ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০ আগস্ট ২০২৬-এ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

সংক্ষেপে

  • রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার কারণ: মৃত্যু, পদত্যাগ বা অভিশংসন।
  • পদত্যাগ: সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ; স্পিকারের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র।
  • অভিশংসন: সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ; সংসদ সদস্যদের এক-চতুর্থাংশের নোটিশ।
  • দায়মুক্তি: সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ; কার্যভারকালে ফৌজদারি সুরক্ষা।
  • ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি: সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ; স্পিকার দায়িত্ব পালন করেন।
  • নতুন রাষ্ট্রপতি: সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত; ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন বাধ্যতামূলক।
  • ঐতিহাসিক উদাহরণ: ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৯০, ২০০২, ২০২৬।

তথ্যসূত্র

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ৪৮(১), ৫০(১), ৫০(৩), ৫০(৫), ৫১(১), ৫১(২), ৫২, ৫৩, ৫৪, ১২৩(২)

মাধ্যম সূত্র:

  • প্রথম আলো — ২৪ জুলাই ২০২৬
  • কালবেলা — ২৪ জুলাই ২০২৬
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ২৪ জুলাই ২০২৬
  • দ্য ডেইলি স্টার — ২৪ জুলাই ২০২৬
  • ডেইলি অবজার্ভার — ২৪ জুলাই ২০২৬
  • বাসস (BSS) — ২৪ জুলাই ২০২৬

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়। এটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা; কোনো আদালতের রায় নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ব্যক্তিগত আইনি সমস্যার জন্য যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করুন।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.