বিয়ের প্রলোভনে সম্পর্ক: শুধু পুরুষের শাস্তির বিধান কেন অবৈধ নয়, হাইকোর্টের রুল
বিয়ের প্রতিশ্রুতি বা প্রলোভন দেখিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০২৬-এর সংশোধিত বিধানের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট সম্পূরক রুল জারি করেছেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, সংশোধিত আইনের মাধ্যমে সংযোজিত ৯(খ) ধারা কেন সংবিধানবিরোধী, অকার্যকর ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না。
বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৪ আগস্ট ২০২৬ (মঙ্গলবার) সম্পূরক আবেদনের শুনানি শেষে এ রুল জারি করেন। রুলে আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বিবাদী করা হয়েছে।
৯(খ) ধারায় কী বলা হয়েছে?
সংশোধিত আইনের ৯(খ) ধারায় বলা হয়েছে, “দৈহিক বলপ্রয়োগ ছাড়া বিয়ের প্রলোভন দিয়ে ১৬ বছরের বেশি বয়সি কোনো নারীর সঙ্গে যৌনকর্ম করা এবং ওই সময় তার সঙ্গে আস্থাভাজন সম্পর্ক থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনধিক সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।”
রিটকারী কারা?
পুরুষ অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন’-এর সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম নাদিম ২০২৫ সালে জনস্বার্থে এই রিট আবেদন করেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মোহাদ্দেশ-উল-ইসলাম।
রিটকারীর মূল যুক্তি
রিট আবেদনে বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিমূলক ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ‘বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’-এর ভিত্তিতে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিধানটি অস্পষ্ট, বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানে নিশ্চিত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
রিটকারীর পক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, “প্রতিশ্রুতি দুজন ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। একজন নারীও যদি সম্পর্ক করে বলে যে বিয়ে করবেন না, তার বিরুদ্ধে কিছু করার নেই। যখন ঘটনা ঘটছে, তখন তা অপরাধ নয়, পরবর্তী সময়ে প্রতিশ্রুতি না রাখলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে বিধানটিতে।”
পূর্ববর্তী রুলের প্রেক্ষাপট
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। অধ্যাদেশের ৫ ধারায় ৯(খ) ধারা সন্নিবেশিত হয়। ওই ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২৫ সালে রিট দায়ের করা হলে ২০২৫ সালের ৪ মে হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
পরে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী আনা হয় এবং তাতেও ৯(খ) বিধানটি বহাল থাকে। এ অবস্থায় সংশোধিত আইনের ৫ ধারার মাধ্যমে সন্নিবেশিত ৯(খ) ধারার বৈধতা নিয়ে সম্পূরক আবেদন দায়ের করা হয়।
আইনি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেয়। ২৮ অনুচ্ছেদ ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-জাতিগত বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করে। রিটকারীদের যুক্তি অনুযায়ী, ৯(খ) ধারা শুধু পুরুষকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে সংবিধানের সমতার নীতির পরিপন্থী।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নারীর প্রতি প্রতারণার শামিল এবং এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত। আইনের উদ্দেশ্য নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিকভাবে “rape by deception” বা প্রতারণার মাধ্যমে ধর্ষণ একটি জটিল আইনি ধারণা। কিছু দেশে এটি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত, আবার কিছু দেশে নয়। বাংলাদেশে এই বিধানটি তুলনামূলকভাবে নতুন।
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
রুল কী? হাইকোর্ট যখন কোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চান, তখন তাকে রুল বলা হয়। এটি চূড়ান্ত রায় নয়। কর্তৃপক্ষ জবাব দিলে আদালত শুনানি করে সিদ্ধান্ত নেন。
সম্পূরক রুল কী? মূল রুলের পর নতুন তথ্য বা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আদালত যখন অতিরিক্ত রুল জারি করেন, তাকে সম্পূরক রুল বলা হয়। এই মামলায় ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনের প্রেক্ষিতে সম্পূরক রুল জারি করা হয়েছে。
সাংবিধানিক বৈধতা মানে কী? কোনো আইন বা আইনের কোনো বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, তা বিচারিকভাবে পর্যালোচনা করাকে সাংবিধানিক বৈধতা পর্যালোচনা বলা হয়。 সংবিধানবিরোধী প্রমাণিত হলে আদালত সেই বিধান বাতিল ঘোষণা করতে পারেন。
পরবর্তী কী হবে? বিবাদীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রুলের জবাব দিতে হবে। জবাব পাওয়ার পর আদালত শুনানি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।
সংক্ষেপে
- ৪ আগস্ট ২০২৬-এ হাইকোর্ট সম্পূরক রুল জারি করেন।
- বেঞ্চ: বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেন।
- রিটকারী: ‘এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন’-এর সাইফুল ইসলাম নাদিম।
- ৯(খ) ধারায় বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ককে অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছে; সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান।
- রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, শুধু পুরুষের শাস্তির বিধান কেন সংবিধানবিরোধী নয়।
- মামলাটি এখনো রুল পর্যায়ে; চূড়ান্ত রায় হয়নি।
তথ্যসূত্র
মাধ্যম সূত্র:
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (বাংলা) — ৫ আগস্ট ২০২৬
- প্রথম আলো — ৪ আগস্ট ২০২৬
- বাংলা ট্রিবিউন — ৪ আগস্ট ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার — ৪ আগস্ট ২০২৬
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড — ৪ আগস্ট ২০২৬
- যুগান্তর — ৫ আগস্ট ২০২৬
- কালবেলা — ৪ আগস্ট ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮, ৩১
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ — ৯(খ) ধারা
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬
- হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট — সম্পূরক রুলের আদেশ
আইনি সতর্কতা
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়।
