নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯২ জন, ৫৪ বছরে ফাঁসি কার্যকর হয়নি একজনেরও
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও নারী আসামির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার ৫৪ বছরে একটিও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৯২ জন নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৬ জনের মামলা হাইকোর্টে এবং ৬ জনের মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন। ডেথ রেফারেন্স, আপিল এবং মিটিগেটিং সারকামস্ট্যান্স বিবেচনার কারণে নারীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় না বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
কতজন নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত?
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে মোট ফাঁসির আসামি ২,৭০৭ জন। এর মধ্যে নারী ৯২ জন এবং পুরুষ ২,৬১৫ জন ৷ ঢাকা বিভাগে ১,৭০০, ময়মনসিংহে ৪০০, চট্টগ্রামে ২৫০, খুলনায় ২০০, সিলেটে ১৫০, রংপুরে ১৫০, রাজশাহীতে ১৩০ এবং বরিশালে ৪০ জন ফাঁসির আসামি রয়েছেন ৷
দেশের একমাত্র মহিলা কারাগার গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে ৫৪ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি রয়েছেন ৷ তবে সেখানে কোনো ফাঁসির মঞ্চ নেই ৷ ২০০৭ সালে কারাগারটি উদ্বোধনের সময় তৎকালীন আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জাকির হাসান বলেছিলেন, “অতীতে কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকর হয়নি বলে রাখা হয়নি ফাঁসির মঞ্চ।” ৷
কেন ফাঁসি কার্যকর হয় না?
ডেথ রেফারেন্স বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৭৪ অনুযায়ী, সেশন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে তা হাইকোর্ট বিভাগে অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হয় ৷ হাইকোর্টের অনুমোদন ছাড়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায় না ৷ ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে হাইকোর্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মামলার পারিপার্শ্বিক তথ্য পুনরায় পর্যালোচনা করেন ৷
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া
স্টার নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে গেল ৫৪ বছরে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ৪৪৫ জনের ৷ যার সবশেষ উদাহরণ ২০২৩ সালে ৷ তবে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো নারী অপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়নি ৷
আইনজীবীরা বলছেন, নিম্ন আদালত থেকে ফাঁসির দণ্ড হলেও উচ্চ আদালতে তা কমে যাচ্ছে ৷ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত জাহান স্টার নিউজকে বলেন, “কোনো মহিলা প্রেগনেন্ট না থাকে বা তার বাচ্চা ফিডিং কোনো বেবি না থাকে, তাহলে সেই ক্ষেত্রে তাকে ফাঁসি দিতে আসলে আইনে কোনো রকম বাধা নেই।” ৷
মিটিগেটিং ও এগ্রিভেটিং সারকামস্ট্যান্স
আদালত অপরাধের ধরন ছাড়াও মিটিগেটিং ও এগ্রিভেটিং সারকামস্ট্যান্স বা অপরাধ সংঘটনের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেন ৷ বিশেষ করে আসামির মাতৃত্ব, গর্ভাবস্থা কিংবা ছোট সন্তানের দায়িত্বের মতো বিষয়গুলোও বিচারিক সিদ্ধান্তে গুরুত্ব পায় ৷
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এস এম শাহজাহান স্টার নিউজকে বলেন, “পাঁচটা গ্রাউন্ড যদি থাকে এটাকে বলে হলো মিটিগেটিং সারকামস্ট্যান্স আর এগ্রিভেটিং সারকামস্ট্যান্স। তার একটা বাচ্চা এবং এই বাচ্চাটার বয়স হলো এক বছর। তো সে তো তিন বছর চার বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ খায়। ২০১৮-১৯ এর মামলা এখন হচ্ছে।” ৷
গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ধারা ৩৮২ অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো নারী গর্ভবতী হলে হাইকোর্ট বিভাগ ফাঁসির আদেশ স্থগিত করতে পারেন এবং প্রয়োজনে তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করতে পারেন ৷
অপরাধে নারীদের একক অংশগ্রহণ
আইনজীবীরা বলছেন, কোনো খুনের ঘটনা এককভাবে নারীরা করেন না, অন্যরা জড়িত থাকে ৷ নারীদের অংশগ্রহণ থাকে ৷ যেহেতু এককভাবে নারী খুনের সঙ্গে জড়িত থাকে না, সেহেতু আদালত নারীদের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রায় কার্যকরের আদেশ দেন না ৷
উল্লেখযোগ্য নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি
কারা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে রয়েছেন বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার আসামি আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি, কামরুন্নাহার মনি এবং উম্মে সুলতানা পপি ৷
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৭ জুন আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ঢাকার শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি সোহেল রানাকে মৃত্যুদণ্ড এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ৷ স্বপ্না খাতুনের মৃত্যুদণ্ড নিম্ন আদালতের রায়; ডেথ রেফারেন্স ও আপিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে ৷
হাইকোর্টের উদ্যোগ
২০২৬ সালের ৭ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য একটি ডেডিকেটেড হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন ৷ পরবর্তীতে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে বেঞ্চটি গঠিত হয়, যা ১৪ জুন ২০২৬ থেকে কার্যক্রম শুরু করে ৷
বেঞ্চটি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার ডেথ রেফারেন্স, ফৌজদারি আপিল, জেল আপিল এবং সংশ্লিষ্ট আবেদন ও রিভিশন আবেদন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির দায়িত্ব পেয়েছে ৷
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. কতজন নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি? — ৯২ জন; তাদের মধ্যে ৮৬ জনের মামলা হাইকোর্টে, ৬ জনের আপিল বিভাগে ৷
২. কেন ফাঁসি কার্যকর হয় না? — ডেথ রেফারেন্স, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, আপিল এবং মিটিগেটিং সারকামস্ট্যান্স বিবেচনার কারণে ৷
৩. গর্ভবতী নারী হলে কী হয়? — ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮২ ধারায় ফাঁসি স্থগিত ও যাবজ্জীবনে রূপান্তরের বিধান রয়েছে ৷
৪. ডেথ রেফারেন্স কী? — সেশন আদালতের মৃত্যুদণ্ড হাইকোর্টের অনুমোদনের জন্য পাঠানোর বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া ৷
৫. হাইকোর্ট কী উদ্যোগ নিয়েছে? — নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার জন্য ডেডিকেটেড বেঞ্চ গঠন ৷
সংক্ষেপে
বাংলাদেশে ৯২ জন নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন, তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছরে কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি। ডেথ রেফারেন্স, আপিল, মিটিগেটিং সারকামস্ট্যান্স এবং গর্ভবতী নারীর বিশেষ বিধানের কারণে নারীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় না। দেশের একমাত্র মহিলা কারাগার কাশিমপুরে ফাঁসির মঞ্চও নেই। হাইকোর্ট নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার জন্য ডেডিকেটেড বেঞ্চ গঠন করেছে।
তথ্যসূত্র
সংবাদ সূত্র:
- প্রতিদিনের বাংলাদেশ — ৯ জুন ২০২৬
- স্টার নিউজ — ৮ জুলাই ২০২৬
- আমার দেশ — ১০ জুন ২০২৬
- কালের কণ্ঠ — ১৮ নভেম্বর ২০২৫ (BBC বাংলা সূত্রে)
- দ্য ডেইলি স্টার — ১০ জুন ২০২৬; ২৭ জুন ২০২৬
- নিউ এজ — ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ — ধারা ৩৭৪, ৩৭৬, ৩৮১, ৩৮২
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০
- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আইনি পরামর্শ নয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন। আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
