আদালতের সঙ্গে অসদাচরণ: কুষ্টিয়ায় আইনজীবীর সদস্যপদ ৯০ দিন বাতিল

কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতি আদালতের সঙ্গে অসদাচরণ এবং পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচারবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকের সদস্যপদ ৯০ দিনের জন্য বাতিল করেছে। সমিতির তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর গত ২৩ জুলাই ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) বিকেলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে অভিযুক্ত আইনজীবীর কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হলেও তার জবাব সন্তোষজনক নয় বলে সমিতি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।

কী ঘটেছে?

ঘটনার সূত্রপাত গত ৭ জুলাই ২০২৬। ওই দিন কুষ্টিয়ার যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয় আদালতে একটি মাদক মামলার কার্যক্রম চলাকালে আদালতের বিচারকের ওপর অসত্য তথ্য গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগের চেষ্টা এবং আদালতের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনজীবী সমিতি বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেয় এবং অভিযুক্ত আইনজীবীর কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চায়।

রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী কৌঁসুলি খোন্দকার নাজমুল হক জানান, ২০২০ সালের একটি মাদক মামলার আসামি দীর্ঘদিন আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আসামির আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করেন। এ সময় আদালতের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা ও অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটে বলে তিনি দাবি করেন।

আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত

সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, অভিযুক্ত আইনজীবীর ব্যাখ্যা যৌক্তিক ও সন্তোষজনক নয়। বরং তার বক্তব্যে পেশাগত শিষ্টাচারের পরিপন্থী মনোভাবের প্রতিফলন পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটির কাছে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান হওয়ায় সমিতির জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে ৯০ দিনের জন্য সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম শাতিল মাহমুদ বলেন, “বিচারিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আইনসম্মত প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই পথ অনুসরণ না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারককে নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচারবিধির লঙ্ঘন।” তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত আইনজীবীর বক্তব্যে আদালত ও বিচার বিভাগের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গুরুতর ব্যত্যয় দেখা গেছে।

সদস্যপদ বাতিলের নোটিশে যা বলা হয়েছে

সদস্যপদ বাতিলের নোটিশে উল্লেখ করা হয়, একজন আইনজীবীর দায়িত্ব আদালতের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল থাকা। সেখানে ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারককে নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য এবং বিচারক দম্পতিকে ঘিরে পারিবারিক ও ধর্মীয় বিষয় উল্লেখ করে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলে সমিতি মনে করে। নোটিশের অনুলিপি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

অভিযুক্তের বক্তব্য

অভিযুক্ত আইনজীবী সিরাজ প্রামাণিক নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, বিচারকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সমিতি তার ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং প্রয়োজনে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

অন্যান্য অভিযোগ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনজীবী সমিতির এক নেতা দাবি করেন, অভিযুক্ত আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত চত্বরে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়েতে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্ত বা বিচারিক নিষ্পত্তির তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

আইনি প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ৩২-৩৮ অনুচ্ছেদে শৃঙ্খলা কমিটির ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া বর্ণিত। কোনো আইনজীবী পেশাগত অসদাচরণ করলে বার কাউন্সিল শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ‘ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট অ্যান্ড এটিকেট’-এ আইনজীবীদের আচরণবিধি বর্ণিত। আদালতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এর অন্যতম।

আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা বা আদালতের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বার কাউন্সিল আইনজীবীর তালিকাভুক্তি স্থগিত বা বাতিল করতে পারে।

পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

পেশাগত অসদাচরণ কী? আইনজীবীদের জন্য নির্ধারিত আচরণবিধি লঙ্ঘন করাকে পেশাগত অসদাচরণ বলা হয়। এর মধ্যে আদালতের প্রতি অসদাচরণ, মক্কেলের স্বার্থবিরোধী কাজ, প্রতারণা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।

শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার প্রক্রিয়া কী? আইনজীবী সমিতি বা বার কাউন্সিল অভিযোগ পেলে তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জুরি বোর্ডের সুপারিশে সদস্যপদ বাতিল বা স্থগিত করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি বার কাউন্সিল বা আদালতে আপিল করতে পারেন।

বার কাউন্সিলের ভূমিকা কী? বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি, শৃঙ্খলা ও পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণ করে। আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত বার কাউন্সিলের কাছে পাঠানো হয়েছে; বার কাউন্সিল পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

পরবর্তী কী হবে? অভিযুক্ত আইনজীবী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোবে। মামলাটি তদন্ত পর্যায়ে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সংক্ষেপে

  • ৭ জুলাই ২০২৬: কুষ্টিয়ায় আদালতে অসদাচরণের অভিযোগ।
  • ২৩ জুলাই ২০২৬: আইনজীবী সিরাজ প্রামাণিকের সদস্যপদ ৯০ দিন বাতিল।
  • অভিযোগ: বিচারকের ওপর চাপ, অসৌজন্যমূলক আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর মন্তব্য।
  • অভিযুক্ত নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন; আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
  • নোটিশের অনুলিপি বার কাউন্সিল ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
  • আইনি ভিত্তি: বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২; ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট অ্যান্ড এটিকেট; আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩।
  • বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়াধীন।

তথ্যসূত্র

প্রাথমিক সূত্র:

  • কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতি — সদস্যপদ বাতিলের নোটিশ, ২৩ জুলাই ২০২৬
  • কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম শাতিল মাহমুদের বক্তব্য
  • রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী কৌঁসুলি খোন্দকার নাজমুল হকের বক্তব্য

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ — অনুচ্ছেদ ৩২-৩৮
  • ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট অ্যান্ড এটিকেট
  • আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩

মাধ্যম সূত্র:

  • প্রথম আলো — ২৪ জুলাই ২০২৬
  • সমকাল — ২৪ জুলাই ২০২৬
  • যুগান্তর — ২৪ জুলাই ২০২৬
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম — ২৩ জুলাই ২০২৬

আইনি সতর্কতা

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো আইনি পরামর্শ নয়। অভিযোগ তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে; কোনো আদালত চূড়ান্ত রায় দেননি। “অভিযোগ” শব্দটি এখানে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, প্রমাণিত অপরাধ নয়। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত আইনজীবী সমিতির সিদ্ধান্ত, অভিযুক্তের বক্তব্য ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে; কোনো পক্ষের বক্তব্য আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। কোনো ব্যক্তিগত আইনি সমস্যার জন্য যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করুন।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.