মিথ্যা মামলার শিকার হলে কী করবেন? আইনি প্রতিকার ও করণীয়

মিথ্যা মামলার শিকার হলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে মামলার ধরন, ধারা ও বর্তমান পর্যায় বুঝে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে এবং মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধেও শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের বিধান আছে।

মিথ্যা মামলা বলতে কী বোঝায়?

মিথ্যা মামলা বলতে এমন অভিযোগ বোঝায়, যেখানে অভিযোগকারী জানেন বা বিশ্বাস করেন যে অভিযোগের ভিত্তি নেই, তবুও ক্ষতি বা হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলা দায়ের করেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারায় “false and either frivolous or vexatious” (মিথ্যা এবং হয় অসম্ভব বা হয়রানিমূলক) অভিযোগের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে এটি মনে রাখা জরুরি — সব মামলা যে মিথ্যা, এমন নয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া মানেই মামলা মিথ্যা নয়। মিথ্যা প্রমাণের জন্য আদালতের সন্তুষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

FIR দায়েরের পর প্রথমে কী করবেন?

১. মামলার নথি সংগ্রহ করুন

অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রথম কাজ হলো আইনজীবীর মাধ্যমে মামলার এজাহার (FIR) বা আদালতে দায়ের করা অভিযোগের অনুলিপি সংগ্রহ করা। এরপর মামলার ধারাগুলো পর্যালোচনা করে বুঝতে হবে:

  • অভিযোগটি জামিনযোগ্য না জামিন অযোগ্য?
  • মামলাটি ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারযোগ্য না দায়রা আদালতের?
  • তদন্ত কোন পর্যায়ে আছে?

২. পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সতর্ক থাকুন

থানায় তলব করা হলে আইনজীবী ছাড়া কোনো বক্তব্য দেবেন না। মনে রাখবেন:

  • আপনার বক্তব্য লিখিত আকারে রেকর্ড করা হতে পারে
  • স্বীকারোক্তি বা আত্মপক্ষে ক্ষতিকর কোনো কিছু বলবেন না
  • জিজ্ঞাসাবাদের সময় কী বলা হয়েছে তা নোট করুন

৩. প্রমাণ সংরক্ষণ শুরু করুন

মিথ্যা মামলা প্রমাণের জন্য যেসব সাক্ষ্য কাজে লাগতে পারে:

  • ডিজিটাল প্রমাণ: কল রেকর্ড, WhatsApp/মেসেঞ্জার চ্যাট, ইমেইল, SMS
  • নথিপত্র: চুক্তি, রশিদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চিকিৎসা রিপোর্ট
  • সাক্ষী: যারা ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন বা আপনার নির্দোষিতা সম্পর্কে জানেন
  • সিসিটিভি ফুটেজ: থাকলে দ্রুত সংগ্রহ করুন, কারণ কিছু প্রতিষ্ঠান সীমিত সময় ফুটেজ সংরক্ষণ করে

⚠️ গুরুত্বপূর্ণ: ডিজিটাল প্রমাণের স্ক্রিনশট নিন, তবে মূল ডিভাইসটি সংরক্ষণ করুন। স্ক্রিনশট এককভাবে আদালতে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য মামলায় করণীয়

জামিনযোগ্য অপরাধ হলে

নিম্ন আদালতে (ম্যাজিস্ট্রেট আদালত) আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করা যায়। জামিনের শর্ত হিসেবে আদালত:

  • পাসপোর্ট জমা দিতে বলতে পারেন
  • থানা ছাড়তে নিষেধ করতে পারেন
  • তদন্তকারী কর্মকর্তার সামনে হাজিরার শর্ত দিতে পারেন

জামিন অযোগ্য অপরাধ হলে

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী দায়রা জজ আদালত এবং হাইকোর্ট বিভাগ — উভয়েরই আগাম জামিন (Anticipatory Bail) দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। আগাম জামিনের জন্য আবেদনে যেসব কারণ দেখানো হয়:

  • FIR বিদ্বেষপ্রসূত বা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে দায়ের করা হয়েছে
  • অভিযোগ অস্পষ্ট এবং অভিযুক্ত অপরাধের উপাদান নেই
  • আবেদনকারীর পূর্ব কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই
  • গ্রেপ্তার হলে তিনি অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবেন

আগাম জামিন সাধারণত কিছু শর্ত সাপেক্ষে দেওয়া হয় — তদন্তে সহযোগিতা করা, দেশ ছাড়ার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়া, সাক্ষ্য নষ্ট না করা ইত্যাদি।

রিমান্ড ও হাজিরা

রিমান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিকার

তদন্তকারী সংস্থা রিমান্ডের আবেদন করলে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে রিমান্ড বাতিলের আবেদন করা যায়। আদালত রিমান্ডের প্রয়োজনীয়তা ও সময়কাল নির্ধারণ করেন।

হাজিরা না দিলে কী হবে?

জামিনে থাকাকালীন নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজিরা না দিলে জামিন বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই প্রতিটি তারিখে হাজিরা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগকারী হাজিরা না দিলে কী হবে?

মিথ্যা মামলায় অভিযোগকারী প্রায়ই হাজিরা দিতে অনীহা দেখান। এক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৭ ধারা (সমন জারির মামলায় অভিযোগকারীর অনুপস্থিতি) এবং ২৪৯ ধারা (অভিযোগকারীর অনুপস্থিতিতে আসামি অব্যাহতি) প্রযোজ্য হতে পারে। তবে এটি নির্ভর করে মামলার প্রকৃতি ও আদালতের বিবেচনার উপর।

মিথ্যা মামলার শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ

ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা

ম্যাজিস্ট্রেট যদি আসামিকে খালাস দেওয়ার সময় সন্তুষ্ট হন যে অভিযোগটি মিথ্যা এবং হয় অসম্ভব বা হয়রানিমূলক ছিল, তাহলে তিনি অভিযোগকারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। ২০২৫ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে:

  • “may” শব্দের পরিবর্তে “shall” প্রতিস্থাপিত হয়েছে
  • ক্ষতিপূরণের সীমা ১,০০০ টাকা থেকে ৫০,০০০ টাকা (দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষেত্রে ২৫,০০০ টাকা) করা হয়েছে
  • ক্ষতিপূরণ না দিলে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে

⚠️ সীমাবদ্ধতা: ২৫০ ধারা শুধু ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারযোগ্য মামলায় প্রযোজ্য। দায়রা আদালতের মামলায় এই ধারা প্রযোজ্য নয়।

দণ্ডবিধির বিধানসমূহ

ধারাঅপরাধশাস্তি
১৯১মিথ্যা সাক্ষ্যের সংজ্ঞাশাস্তি নেই (সংজ্ঞা)
১৯৩মিথ্যা সাক্ষ্যদানসর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড + অর্থদণ্ড
২০৯আদালতে অসাধু মিথ্যা দাবিসর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড + অর্থদণ্ড
২১১ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগসর্বোচ্চ ২ বছর; গুরুতর ক্ষেত্রে ৭ বছর

২১১ ধারায় গুরুতর ক্ষেত্রে: যদি মিথ্যা অভিযোগ এমন অপরাধের হয় যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ৭ বছরের বেশি কারাদণ্ড — তাহলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ — ধারা ১৭

এই আইনের অধীনে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করলে অভিযোগকারী সর্বোচ্চ ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। ২০২৫ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ১৭(৩) উপ-ধারা যোগ করা হয়েছে, যা ট্রাইব্যুনালকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এবং প্রয়োজনে অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার ক্ষমতা দিয়েছে।

মিথ্যা FIR বাতিল (Quashment)

মিথ্যা বা হয়রানিমূলক FIR বাতিলের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করা যায়। এর ভিত্তি:

  • ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৫৬১A (অন্তর্নিহিত এখতিয়ার)
  • সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ

হাইকোর্ট বিভাগ FIR বাতিল করতে পারেন যদি:

  • FIR-এ কোনো অপরাধের উপাদান না থাকে
  • অভিযোগ সম্পূর্ণ অসম্ভব বা অবিশ্বাসযোগ্য
  • FIR স্পষ্টত বিদ্বেষপ্রসূত বা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে দায়ের করা হয়েছে

পাঠকের জন্য চেকলিস্ট

যা করবেন

☐ আইনজীবীর মাধ্যমে FIR/অভিযোগের অনুলিপি সংগ্রহ করুন
☐ মামলার ধারা ও আদালতের এখতিয়ার বুঝুন
☐ ডিজিটাল ও কাগজপত্র প্রমাণ সংরক্ষণ করুন
☐ প্রতিটি আদালতের তারিখে হাজিরা দিন
☐ অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীর পরামর্শ নিন

যা করবেন না

☒ পুলিশের কাছে আইনজীবী ছাড়া বক্তব্য দেবেন না
☒ সোশ্যাল মিডিয়ায় মামলা সম্পর্কে মন্তব্য করবেন না
☒ সাক্ষীদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন না
☒ আদালতের তারিখ এড়িয়ে যাবেন না
☒ আতঙ্কিত হয়ে বিদেশে পালানোর চেষ্টা করবেন না

সংক্ষেপে

মিথ্যা মামলার শিকার হলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে মামলার ধরন, ধারা ও পর্যায় বুঝে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারা, দণ্ডবিধির ১৯১/১৯৩/২০৯/২১১ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে প্রতিকারের বিধান রয়েছে। জামিন অযোগ্য মামলায় দায়রা জজ আদালত বা হাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন চাওয়া যায়। মিথ্যা FIR হলে হাইকোর্ট বিভাগে কোয়াশমেন্ট আবেদন করা যায়।

তথ্যসূত্র

প্রাথমিক আইনি সূত্র:

  • ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ — ধারা ২৪৭, ২৪৯, ২৫০, ৪৯৮, ৫৬১A
  • ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫
  • দণ্ডবিধি, ১৮৬০ — ধারা ১৯১, ১৯৩, ২০৯, ২১১
  • নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ — ধারা ১৭
  • নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫
  • সংবিধান, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ — অনুচ্ছেদ ১০২

মাধ্যমিক সূত্র:

  • লয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — “মিথ্যা মামলার প্রতিকার” (মার্চ ২০২৫)
  • লয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — “মিথ্যা মামলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ” (মার্চ ২০২৫)

আইনি সতর্কতা

এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আইনি পরামর্শ নয়। প্রতিটি মামলার তথ্য ও পরিস্থিতি ভিন্ন। আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অবশ্যই যোগ্য ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন। এই নিবন্ধের তথ্য আইনি পরামর্শ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

Apprentice Advocate
Dhaka Judge Court
About

Privacy Overview

This website uses cookies so that we can provide you with the best user experience possible. Cookie information is stored in your browser and performs functions such as recognising you when you return to our website and helping our team to understand which sections of the website you find most interesting and useful.