অপ্রমাণিত তালাকের অজুহাতে দেনমোহর ও ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না: হাইকোর্ট
আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের দেনমোহর বা ভরণপোষণের ডিক্রি বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ মা-বাবার তালাকসংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি শিশুর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার।
রায়ের বিবরণ
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চ ২০২৬ সালের ২২ জুন এ রায় দেন । রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ১৬ জুলাই ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) প্রকাশিত হয় ।
মামলার পটভূমি
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রেজিস্ট্রিকৃত কাবিননামার মাধ্যমে শেখ নজরুল ইসলাম সাহেব ও হালিমা খাতুনের বিয়ে হয় । তাদের কন্যা সায়রা আক্তারের জন্ম ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর ।
স্ত্রী হালিমা খাতুন ফ্যামিলি কোর্টে দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলা দায়ের করেন । স্বামী দাবি করেন, তিনি ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন । তবে ফ্যামিলি কোর্টে তিনি আইন অনুযায়ী সেই তালাক প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন । ফলে ফ্যামিলি কোর্ট স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি প্রদান করেন ।
এরপর স্বামী ২০২২ সালে পৃথক একটি ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করে দাবি করেন যে তালাক কার্যকর হয়েছে । সেই মামলার অজুহাতে তিনি ভরণপোষণ ও দেনমোহরের ডিক্রির বাস্তবায়ন স্থগিতের আবেদন জানান। নিম্ন আদালত আবেদনটি খারিজ করলে তিনি ২০২৩ সালে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন । প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল দেন এবং চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন ।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
অপ্রমাণিত তালাকের কোনো আইনগত মূল্য নেই
আদালত বলেন, যে তালাক আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় বা কার্যকর নয়, সেই তালাকের কোনো আইনগত কার্যকারিতা নেই । এমন তালাক বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটায় না এবং দেনমোহর বা ভরণপোষণের ডিক্রি বাস্তবায়নের পথে কোনো আইনি বাধাও সৃষ্টি করতে পারে না ।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৭ অনুযায়ী, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীকে স্থানীয় চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে, আরবিট্রেশন কাউন্সিল গঠন করতে হবে এবং ৯০ দিনের ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত হতে হবে ।
নতুন মামলা দায়ের করলে পূর্বের ডিক্রি স্থগিত হয় না
হাইকোর্ট বলেন, শুধুমাত্র একটি নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে — এই কারণে পূর্বে প্রদত্ত চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না । কোনো সক্ষম আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত তা কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্ট সেই ডিক্রি বাস্তবায়নে বাধ্য ।
ফ্যামিলি কোর্টের একচ্ছত্র এখতিয়ার
রায়ে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর ধারা ৫ অনুযায়ী ফ্যামিলি কোর্টের এখতিয়ার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে । আদালত বলেন, বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার ফ্যামিলি কোর্টের । অন্যদিকে, এক্সিকিউশন কোর্টের দায়িত্ব কেবল বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করা। তালাক বৈধ কি না কিংবা বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই ।
নাবালক সন্তানের স্বতন্ত্র অধিকার
আদালত বলেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার । মা-বাবার মধ্যে তালাকসংক্রান্ত বিরোধ থাকলেও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না । কোনো পিতা তালাকসংক্রান্ত বিরোধের অজুহাতে সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না ।
ভবিষ্যতে নতুন তালাকের সুযোগ
রায়ে বলা হয়, পূর্বে দাবি করা তালাক আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হলেও স্বামী চাইলে আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ রয়েছে । তবে এর ফলে পূর্ববর্তী ডিক্রির ভিত্তিতে সৃষ্ট দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় থেকে তিনি মুক্তি পাবেন না ।
চূড়ান্ত আদেশ
হাইকোর্ট রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন । একই সঙ্গে স্বামীকে দেনমোহরের বকেয়া অর্থ এবং স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের সব বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয় ।
আইনজীবীদের বক্তব্য
মামলায় স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শাহিদুল ইসলাম । স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান । তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান জুই ।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, “এই রায় পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এর মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী বা নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ এড়ানোর সুযোগ নেই।”
পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. তালাক কার্যকর হওয়ার শর্ত কী? — মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ধারা ৭ অনুযায়ী স্থানীয় চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ, আরবিট্রেশন কাউন্সিল গঠন এবং ৯০ দিনের ইদ্দতকাল অতিক্রান্ত হতে হবে ।
২. ফ্যামিলি কোর্টের এখতিয়ার কী? — পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর ধারা ৫ অনুযায়ী বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ সংক্রান্ত সব মামলার একচ্ছত্র এখতিয়ার ।
৩. এক্সিকিউশন কোর্ট কী করতে পারে না? — তালাক বৈধ কি না বা বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান কি না, তা নতুন করে বিচার করতে পারে না ।
৪. নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কেন স্বতন্ত্র? — এটি মা-বাবার তালাক বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয় ।
৫. স্বামী আবার তালাক দিতে পারবেন কি? — হ্যাঁ, আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ রয়েছে ।
সংক্ষেপে
হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন, অপ্রমাণিত তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের দেনমোহর বা ভরণপোষণের ডিক্রি বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। ফ্যামিলি কোর্টের একচ্ছত্র এখতিয়ার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এক্সিকিউশন কোর্ট কেবল বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করবে, নতুন করে তালাকের বৈধতা বিচার করবে না। স্বামীকে বকেয়া দেনমোহর ও ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র
সংবাদ সূত্র:
- প্রথম আলো — ১৬ জুলাই ২০২৬
- যুগান্তর — ১৬ জুলাই ২০২৬
- ঢাকা ট্রিবিউন — ১৬ জুলাই ২০২৬
- নিউ এজ — ১৬ জুলাই ২০২৬
- সমকাল — ১৬ জুলাই ২০২৬
- চ্যানেল ২৪ — ১৬ জুলাই ২০২৬
- লয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ — ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রাথমিক আইনি সূত্র:
- পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ — ধারা ৫
- মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ — ধারা ৭
- সিভিল কার্যবিধি, ১৯০৮ — ধারা ১১৫
আইনি সতর্কতা
এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যগত উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আইনি পরামর্শ নয়। পারিবারিক আইন সংক্রান্ত বিষয়ে আইনি পরামর্শের জন্য যোগ্য আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
